ভূমিকম্পের মধ্যেই টর্চের আলোয় অস্ত্রোপচার, জন্ম নিল ‘গেম্পিতা’
ইন্দোনেশিয়ার পূর্বাঞ্চলে শক্তিশালী ভূমিকম্পের সময় যখন হাসপাতাল কাঁপছিল, বিদ্যুৎ চলে গিয়েছিল—ঠিক তখনই অস্ত্রোপচার চলছিল ৩৯ বছর বয়সী এক অন্তঃসত্ত্বা নারীর। ভয়াবহ সেই পরিস্থিতির মধ্যেও হাল ছাড়েননি চিকিৎসকেরা। টর্চের আলোয় জরুরি অস্ত্রোপচার চালিয়ে শেষ পর্যন্ত এক কন্যাশিশুর জন্ম দেন মারিয়া ফ্লোরিডা নোগো কেলেন। ভূমিকম্পের স্মৃতি ধরে শিশুটির নাম রাখা হয়েছে ‘গেম্পিতা’—ইন্দোনেশীয় ‘গেম্পা’ শব্দ থেকে নেওয়া নামটির অর্থ ভূমিকম্প।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য ইনডিপেনডেন্ট-এর বরাতে জানা গেছে, মারিয়া ফ্লোরিডা নোগো কেলেন ইন্দোনেশিয়ার পূর্ব নুসা তেংগারা প্রদেশের নাগেওকো এলাকায় বসবাস করেন। ১৫ আগস্ট স্থানীয় সময় ভোরে ৭.৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানার সময় তিনি প্রায় সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন।
জটিল গর্ভাবস্থার কারণে দ্রুত সন্তান প্রসব করানো জরুরি হয়ে পড়েছিল। চিকিৎসকেরা জানান, প্রসব বিলম্বিত হলে মারিয়ার খিঁচুনি দেখা দিতে পারে এবং এতে তাঁর প্রাণহানির ঝুঁকি ছিল। ফলে ভূমিকম্পের মধ্যেই অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
কিন্তু অস্ত্রোপচার শুরুর পর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। ভূমিকম্পের কম্পনে হাসপাতাল ভবন কেঁপে ওঠে এবং বিদ্যুৎ চলে যায়। ফলে হাসপাতালের স্বাভাবিক চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হয়। শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকেরা টর্চের আলো ব্যবহার করেই অস্ত্রোপচার চালিয়ে যান।
স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ইয়োনা সারা পারদেদে বলেন, পরিস্থিতি অত্যন্ত কঠিন ছিল। শিশুটি আকারে ছোট হওয়ায় অস্ত্রোপচারে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন ছিল। এমনকি হাসপাতালের ভেন্টিলেটরও কাজ করছিল না। তবু চিকিৎসকদের সামনে অস্ত্রোপচার চালিয়ে যাওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প ছিল না।
ভূমিকম্পের পরবর্তী কম্পনের মধ্যেই জন্ম নেয় শিশুটি। জন্মের সময় তার ওজন ছিল মাত্র ১ দশমিক ৩ কেজি। বর্তমানে তাকে একটি ইনকিউবেটরে রাখা হয়েছে। হাসপাতালের বাইরে তাঁবুর পাশে ঘাসের ওপর ওই ইনকিউবেটর স্থাপন করা হয়েছে। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, নবজাতকটির অবস্থা স্থিতিশীল।
সন্তান জন্মের পর মারিয়ার তীব্র রক্তক্ষরণ হয়। তবে শেষ পর্যন্ত তিনি বেঁচে যান। সুস্থ হওয়ার পর চিকিৎসকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি বলেন, হাসপাতালের একটি অংশ ধসে পড়লেও চিকিৎসকেরা তাঁকে একা ফেলে যাননি।
এদিকে শক্তিশালী ভূমিকম্পে পূর্ব নুসা তেংগারা প্রদেশের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বহু বাড়িঘর, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও অন্যান্য স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হাসপাতালগুলোর অনেক চিকিৎসককে হাসপাতালের বাইরে অস্থায়ী তাঁবুতে আহতদের চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।
ভূমিকম্পের পর হাজারো মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ঘরবাড়ি ছেড়ে অস্থায়ী শিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন। সেখানে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। পরবর্তী কম্পনের আশঙ্কায় অনেকেই বাড়িতে ফিরতেও ভয় পাচ্ছেন। ভূমিকম্পের পর শত শত আফটারশক রেকর্ড করা হয়েছে।
ইন্দোনেশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় ‘রিং অব ফায়ার’-এ অবস্থিত হওয়ায় দেশটি বিশ্বের অন্যতম ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল। ১৫ আগস্টের ৭.৭ মাত্রার ভূমিকম্পে প্রাণহানি ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পরও উদ্ধার তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়াদের উদ্ধারে কাজ করছেন উদ্ধারকারীরা। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ত্রাণ ও চিকিৎসাসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
ভয়াবহ দুর্যোগের মধ্যে বিদ্যুৎহীন হাসপাতালে টর্চের আলোয় চিকিৎসকদের সেই লড়াই এবং মাত্র ১ দশমিক ৩ কেজি ওজনের নবজাতক ‘গেম্পিতা’র নিরাপদ জন্ম এখন বিপর্যস্ত মানুষের জন্য আশার এক প্রতীক হয়ে উঠেছে।














Warning: Array to string conversion in /home/dkishoreganj/public_html/wp-content/plugins/gs-facebook-comments/public/class-wpfc-public.php on line 311
Array