চায়না ম্যাজিক জাল জলজ জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করছে
‘জাল যার জলা তার, জাল যার হাওর তার, মাছ সবার’ : মৎস্যমন্ত্রী
‘জাল যার জলা তার, জাল যার হাওর তার, মাছ সবার। পানি আল্লাহর, মানুষ আল্লাহর—যেখানে মাছ থাকবে, সেখানে সবাই মাছ ধরতে পারবে।’—কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে জাতীয় মৎস্য সপ্তাহের কেন্দ্রীয় আয়োজনের প্রস্তুতি দেখতে এসে এমন মন্তব্য করেছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ এমপি।
তবে একই সঙ্গে জলজ জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ক্ষতিকর জাল ব্যবহার বন্ধ এবং ডিমওয়ালা মা মাছ সংরক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তিনি। মন্ত্রী বলেছেন, চায়না ম্যাজিক জাল জলজ জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এ ধরনের জাল ব্যবহারের বিরুদ্ধে স্থানীয় জনগণকে আরও সচেতন ও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
শনিবার (৮ আগস্ট) দুপুরে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার আচমিতা জর্জ ইনস্টিটিউট স্কুল মাঠে আগামী ১৬ আগস্ট অনুষ্ঠেয় জাতীয় মৎস্য সপ্তাহের কেন্দ্রীয় অনুষ্ঠানস্থল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী।
আগামী ১৬ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে কটিয়াদীতে জাতীয় মৎস্য সপ্তাহের কেন্দ্রীয় অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এ উপলক্ষে আচমিতা জর্জ ইনস্টিটিউট স্কুল মাঠে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। শনিবার দুপুরে অনুষ্ঠানস্থলে গিয়ে মঞ্চ, অতিথিদের বসার ব্যবস্থা, প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ, নিরাপত্তা এবং সার্বিক ব্যবস্থাপনার অগ্রগতি ঘুরে দেখেন মন্ত্রী। পরে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে প্রস্তুতির বিষয়ে খোঁজ নেন তিনি।
‘ম্যাজিক জাল একটি গজব জাল’
বিভিন্ন জলাশয়ে ব্যবহৃত চায়না ম্যাজিক জাল সম্পর্কে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, ‘ম্যাজিক জাল একটি গজব জাল। এই জাল জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করে দিচ্ছে।’
মন্ত্রী বলেন, এ ধরনের জালে ছোট-বড় বিভিন্ন প্রজাতির মাছের পাশাপাশি জলজ প্রাণী ও অন্যান্য জীব আটকা পড়ে। ফলে জলজ জীববৈচিত্র্যের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ে এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
তিনি জানান, সরকার ইতোমধ্যে এসব জালের আমদানি বন্ধ করেছে। তবে জনবল সংকটের কারণে প্রশাসনের পক্ষে নিয়মিত অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে এগুলো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হচ্ছে।
এ ক্ষেত্রে শুধু সরকারি অভিযানের ওপর নির্ভর না করে স্থানীয় মানুষকেও এগিয়ে আসার আহ্বান জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, জনগণকে সচেতন হতে হবে, যাতে কেউ এসব জাল দিয়ে মাছ ধরতে না পারে। প্রতিটি এলাকায় মানুষ এই জালের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালে সরকার তাদের পাশে থাকবে।
মাছের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিক
মাছের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়ার বিষয়টিও তুলে ধরেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী। তিনি বলেন, একটি গবেষণায় কিছু মাছের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এটি শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয়; এটি একটি বৈশ্বিক সমস্যা। এমনকি সমুদ্রের মাছের মধ্যেও মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যাচ্ছে।
তিনি বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে। জলাশয় ও নদ-নদীতে প্লাস্টিকসহ বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য ফেলার কারণে পরিবেশের ওপর চাপ বাড়ছে। এর প্রভাব জলজ প্রাণী ও মানুষের খাদ্যশৃঙ্খলেও পড়তে পারে।
তাই মাছের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি জলজ পরিবেশ রক্ষার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সারাদেশে মাছের অভয়াশ্রম তৈরির উদ্যোগ
মিঠাপানির মাছের উৎপাদন ও বংশবিস্তার বাড়াতে সারাদেশে মাছের অভয়াশ্রম তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান মন্ত্রী। বিশেষ করে ডিমওয়ালা মা মাছ সংরক্ষণ করা গেলে মাছের বংশবিস্তার বাড়ানো সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।
মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রয়োজন অনুযায়ী মাছের অভয়াশ্রম তৈরি করা হবে। এসব অভয়াশ্রমে ডিমওয়ালা মা মাছ সংরক্ষণ করা হবে এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে, যাতে মাছ নির্বিঘ্নে ডিম ছাড়তে ও বংশবিস্তার করতে পারে। নির্দিষ্ট সময় শেষে এসব অভয়াশ্রম উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে।
মন্ত্রীর ভাষ্য, প্রাকৃতিকভাবে মাছের প্রজনন বাড়াতে পারলে একদিকে মাছের উৎপাদন বাড়বে, অন্যদিকে জলাশয়ের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমবে।
মৎস্যচাষিদের উৎসাহিত করতে নানা উদ্যোগ
মৎস্যচাষিদের উৎসাহিত করতে সরকার বিভিন্ন প্রকল্প ও উদ্যোগ নিচ্ছে বলেও জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, মাছ শুধু মানুষের আমিষের চাহিদা পূরণ করছে না, দেশের অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। মৎস্য খাতের সঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত।
তাই মাছচাষিদের প্রশিক্ষণ, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং তাঁদের উৎসাহিত করার বিষয়টি সরকার গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে মাছের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি দেশীয় প্রজাতির মাছ সংরক্ষণেও গুরুত্ব দিতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
পুরস্কৃত হবেন সেরা পাঁচ হাজার মৎস্যচাষি ও খামারি
আগামী ১৬ আগস্ট জাতীয় মৎস্য সপ্তাহের কেন্দ্রীয় অনুষ্ঠানে সারাদেশের সেরা পাঁচ হাজার মৎস্যচাষি ও খামারিকে বিশেষভাবে পুরস্কৃত করা হবে বলে জানান মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী।
তিনি বলেন, মাছচাষে যাঁরা ভালো করছেন, তাঁদের স্বীকৃতি দিলে অন্যরাও উৎসাহিত হবেন। এর মাধ্যমে দেশের মৎস্য উৎপাদন আরও বাড়বে।
মন্ত্রী জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কটিয়াদীতে জাতীয় মৎস্য সপ্তাহের কেন্দ্রীয় অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে মৎস্যচাষি ও খামারিদের পুরস্কৃত করবেন।
কটিয়াদীতে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি
প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে কেন্দ্র করে কয়েক দিন ধরে কটিয়াদীতে ব্যাপক প্রস্তুতি চলছে। আচমিতা জর্জ ইনস্টিটিউট স্কুল মাঠে তৈরি করা হচ্ছে কেন্দ্রীয় অনুষ্ঠানস্থল। মঞ্চ নির্মাণ, অতিথিদের বসার ব্যবস্থা, প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ, নিরাপত্তা এবং সার্বিক ব্যবস্থাপনার কাজ এগিয়ে চলছে।
শনিবার দুপুরে অনুষ্ঠানস্থল পরিদর্শন করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রস্তুতির অগ্রগতি নিয়ে কথা বলেন মৎস্যমন্ত্রী। অনুষ্ঠানটি সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে সম্পন্ন করতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
পরিদর্শনকালে উপস্থিত ছিলেন বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মো. শরিফুল আলম এমপি, কিশোরগঞ্জ-১ (কিশোরগঞ্জ সদর-হোসেনপুর) আসনের সংসদ সদস্য মো. মাজহারুল ইসলাম, কিশোরগঞ্জ-২ (কটিয়াদী-পাকুন্দিয়া) আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন, জেলা পরিষদের প্রশাসক খালেদ সাইফুল্লাহ (ভিপি সোহেল), জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সোহানা নাসরিন, জেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি আশফাক আহমেদ জুন, কেন্দ্রীয় যুবদলের সাবেক সহসভাপতি মো. রুহুল আমিন আকিল, কটিয়াদী উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক মেয়র তোফাজ্জল হোসেন খান দিলীপ, কটিয়াদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামীমা আফরোজ মারলিজ, জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. শহিদুল ইসলাম, উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) লাবনী আক্তার তারানা, উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. কাউসারসহ জেলা প্রশাসন, মৎস্য অধিদপ্তর, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।














Warning: Array to string conversion in /home/dkishoreganj/public_html/wp-content/plugins/gs-facebook-comments/public/class-wpfc-public.php on line 311
Array