ভারতের রাজধানী দিল্লিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে বড় ধরনের বিক্ষোভের প্রস্তুতি নিচ্ছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। বিক্ষোভ ঘিরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ও কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর ২০ হাজারের বেশি সদস্য মোতায়েনের পরিকল্পনা করেছে কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়া সংবেদনশীল এলাকাগুলোতে শব্দ ধারণের সুবিধাসহ ৩০০টির বেশি সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে।
শনিবার দিল্লির জন্তর মন্তরে এ বিক্ষোভ হওয়ার কথা রয়েছে। তবে কর্মসূচির অনুমতি দেয়নি পুলিশ। বিক্ষোভ ঘিরে নিরাপত্তা জোরদার করার পাশাপাশি যান চলাচল ও যোগাযোগব্যবস্থায়ও বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
গত ২০ জুলাই প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে বিক্ষোভ ও পুলিশের পদক্ষেপ ঘিরে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলার ঘটনা এখনো দুই পক্ষের স্মৃতিতে রয়েছে। ওই ঘটনার পর শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেছিলেন। এবারের বিক্ষোভ ঘিরেও পরিস্থিতি ভিন্ন রূপ নিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
শনিবার সকাল ৪টা থেকে দুপুর ২টার মধ্যে নয়াদিল্লি ও হজরত নিজামুদ্দিন স্টেশনে পৌঁছানোর কথা ছিল—এমন অন্যান্য রাজ্যের ২৫০টির বেশি ট্রেন এবং স্থানীয় ট্রেন বাতিল করা হয়েছে। রাজীব চক, নয়াদিল্লি, সেন্ট্রাল সেক্রেটারিয়েট, প্যাটেল চক ও কাশ্মীরি গেটসহ দিল্লি মেট্রোর ৪৫টি স্টেশনের প্রবেশ ও বের হওয়ার ফটক বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া জনপথ মোড়ের চার কিলোমিটার ব্যাসার্ধের এলাকায় শুক্রবার রাত ১০টা থেকে ২৪ ঘণ্টার জন্য ইন্টারনেট সেবা বন্ধ রাখা হয়েছে।
সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপক বলেন, বিধিনিষেধ সত্ত্বেও দলের স্বেচ্ছাসেবক ও সমর্থকেরা জন্তর মন্তরে বিক্ষোভের পরিকল্পনা থেকে সরে আসবেন না। বিক্ষোভে জনদুর্ভোগের আশঙ্কা দেখিয়ে একদিকে কর্মসূচিতে বাধা দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে মেট্রো ও রেল চলাচল বন্ধ এবং সড়কে বিধিনিষেধ আরোপ করা হচ্ছে—এতে জনদুর্ভোগ আরও বাড়বে কি না, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।
দিল্লি পুলিশের নিরাপত্তা পরিকল্পনার দুটি প্রধান লক্ষ্য—আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং বিক্ষোভ মোকাবিলায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে সমালোচনা এড়ানো।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিক্ষোভকারীদের নয়াদিল্লি জেলার ভেতরে প্রবেশ ঠেকানো এবং নিষিদ্ধ এলাকা থেকে দ্রুত সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। জন্তর মন্তর, জনপথ, নির্বাচন কমিশনের কার্যালয় ও দিল্লি পুলিশ সদর দপ্তরসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাকে ঘিরে প্রায় দেড় কিলোমিটার ব্যাসার্ধের এলাকাকে অত্যন্ত সংবেদনশীল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ এলাকায় ৬ হাজার ৫০০-এর বেশি পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হবে বলে জানিয়েছেন এক কর্মকর্তা।
নিরাপত্তা নজরদারি বাড়াতে নয়াদিল্লি জেলার বিভিন্ন সংবেদনশীল স্থানে শব্দ ধারণের সুবিধাসহ ৩০০টির বেশি সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে।
বিক্ষোভস্থলে যাওয়ার সড়কে অন্তত সাত স্তরের ব্যারিকেড বসানো হয়েছে। শেষ দিকের কয়েকটি ব্যারিকেড পরস্পরের সঙ্গে ঝালাই করে যুক্ত করা হয়েছে, যাতে সেগুলো ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করা কঠিন হয়।
সংবেদনশীল এলাকাগুলোতে মাইক বসিয়ে আগে থেকে রেকর্ড করা ঘোষণার মাধ্যমে জানানো হচ্ছে, প্রস্তাবিত বিক্ষোভের অনুমতি দেওয়া হয়নি। লোকজনকে সেখানে জমায়েত না হওয়া, স্লোগান না দেওয়া, সরকারি সম্পত্তির ক্ষতি না করা এবং পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলা না চালানোর আহ্বান জানানো হচ্ছে।
কমিউনিটি সেন্টার, মসজিদ ও আবাসিক কল্যাণ সমিতিগুলোকেও বিক্ষোভের অনুমতি না থাকার বিষয়টি প্রচার করতে বলা হয়েছে। কর্মসূচিতে যোগ দিতে নয়াদিল্লিতে আসা ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার ও আইনি ব্যবস্থার মুখে পড়তে হতে পারে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।
এ ছাড়া নয়াদিল্লি ও মধ্য দিল্লির বিভিন্ন আবাসিক হোটেল ও লজে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। হোটেল ব্যবস্থাপকদের অতিথিদের বিক্ষোভে অংশ নিতে নিরুৎসাহিত করতে বলা হয়েছে। যাঁরা বিক্ষোভে যোগ দিতে পারেন, তাঁদের কাছে বাসা বা আবাসন ভাড়া না দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে এয়ারবিএনবি হোস্ট ও সম্পত্তির মালিকদের। কোনো অতিথি বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন বলে সন্দেহ হলে পুলিশকে জানাতেও বলা হয়েছে।
সাম্প্রতিক বিক্ষোভে পুলিশের আচরণ ও অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ ওঠায় এবার পুরো কর্মসূচি কীভাবে মোকাবিলা করা হচ্ছে, তার নথি সংরক্ষণে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে দিল্লি পুলিশ।
মাসের শুরুর দিকে হওয়া বিক্ষোভের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি ভিডিওতে পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে অসদাচরণ, মারধর ও এক নারী বিক্ষোভকারীর সঙ্গে শ্লীলতাহানির অভিযোগ ওঠে। এসব অভিযোগ পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
এবার ঘটনাপ্রবাহ বিভিন্ন দিক থেকে ধারণ করতে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার ও তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ দায়িত্বে থাকা সদস্যদের শরীরে পরিধানযোগ্য ক্যামেরা দেওয়া হয়েছে। বিক্ষোভ ও পুলিশের পদক্ষেপ সরাসরি ধারণ করতে শত শত আলোকচিত্রী ও ভিডিওচিত্র ধারণকারীও নিয়োগ করা হয়েছে।
কর্মকর্তাদের আশা, এসব ভিডিওর মাধ্যমে ঘটনার ধারাবাহিকতা নির্ধারণ, বিভ্রান্তিকর দাবির জবাবে যাচাইযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন এবং কোনো ঘটনা ঘটলে তদন্তে সহায়তা করা সম্ভব হবে।
এদিকে দিল্লি পুলিশ একটি খোলা চিঠিও প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে, পুলিশ সদস্যরাও মানুষ, তাঁদেরও পরিবার বাড়িতে অপেক্ষা করে। পোশাক পরার কারণে কারও মানবিকতা হারিয়ে যায় না উল্লেখ করে চিঠিতে সব পক্ষকে মানবিকতা ও সংযম বজায় রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে।
