কুয়েতের চাকরির নামে প্রতারণা: জাল ভিসায় সর্বস্ব হারাল পাঁচ পরিবার
কুয়েতের চাকরির ভিসা পাওয়ার আশায় জমি বিক্রি করেছেন, ধারদেনা করেছেন, সাজিয়েছেন স্বপ্ন। কিন্তু সবকিছু শেষ হয়ে গেছে এক দালালের প্রতারণায়। জাল ভিসার ফাঁদে পড়ে কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলার লাইমপাশা গ্রামের পাঁচ দিনমজুর পরিবার হারিয়েছে মোট সাড়ে ৩২ লাখ টাকা। বর্তমানে পরিবারগুলো চরম মানবেতর জীবনযাপন করছে।
ভুক্তভোগীরা হলেন—শরীফ মিয়া, মোশাররফ হোসেন, বাবলু মিয়া, লুসা মিয়া ও সানাউল করিম। করিমগঞ্জ উপজেলার নিয়ামতপুর গ্রামের দালাল হেলাল উদ্দিন সাধি তাদের কুয়েতের একটি অয়েল কোম্পানিতে চাকরির প্রলোভন দেখান। তার কথায় বিশ্বাস করে একে একে তারা সাড়ে ৩২ লাখ টাকা তুলে দেন।
হেলাল উদ্দিন প্রথমে তাদের কিশোরগঞ্জ কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে তিন দিনের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন। পাশাপাশি জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিসে ফিঙ্গারপ্রিন্ট নেওয়া হয়। এতে ভুক্তভোগীরা নিশ্চিত হন, সবকিছু বৈধভাবেই হচ্ছে।
গত ৭ জুলাই কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়া এলাকার কানিকাটা এলাকায় হেলালের ভাড়া বাসায় তাকে নগদ টাকা পরিশোধ করা হয়। এরপর থেকেই শুরু হয় তাদের দুঃস্বপ্ন।
সময় গড়ানোর পর তারা জানতে পারেন, ভিসাগুলো সম্পূর্ণ জাল। কুয়েতে তাদের জন্য কোনো চাকরি নেই। টাকা ফেরত চাইলে হেলাল তা দিতে অস্বীকৃতি জানান। অভিযোগ রয়েছে, টাকা চাইতে গেলে উল্টো হামলার শিকার হন ভুক্তভোগীরা। এক ঘটনায় হেলালের ছেলে রিয়ান প্রভাব খাটিয়ে শরীফ মিয়াকে মারধর ও জোরপূর্বক টাকা ছিনিয়ে নেন। এমনকি ডিবি পুলিশের ভয় দেখানোর অভিযোগও উঠেছে।
ভিসার কপি যাচাই করে প্রতারণার বিষয়টি নিশ্চিত হলে পাঁচ পরিবার চরম হতাশায় ভেঙে পড়ে। বিদেশে যাওয়ার আশায় জমি, গরু-ছাগল বিক্রি ও ধারদেনা করে তারা এখন পুরোপুরি নিঃস্ব।
ভুক্তভোগী শরীফ মিয়া বলেন,
“জীবনের সব সঞ্চয় দিয়ে ভিসা নিয়েছিলাম। এখন ঘরে খাবার নেই। পরিবার না খেয়ে দিন কাটাচ্ছে। টাকা না পেলে বাঁচার আর কোনো পথ নেই।”
অপর ভুক্তভোগী মোশাররফ হোসেন বলেন,
“হেলালকে বিশ্বাস করাই ছিল আমাদের সবচেয়ে বড় ভুল। আমরা গরিব বলে এখন কেউ আমাদের কথা শুনছে না।”
বাবলু মিয়া বলেন,
“সরকারি প্রশিক্ষণ ও ফিঙ্গার নেওয়ায় বুঝতেই পারিনি প্রতারণা হচ্ছে। এখন সব শেষ।”
লাইমপাশা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য সাইদুর রহমান বলেন,
“এই পাঁচ পরিবার পুরোপুরি নিঃস্ব হয়ে গেছে। তাদের সামনে আর দাঁড়ানোর কোনো পথ নেই।”
এদিকে অভিযুক্ত হেলাল উদ্দিন সাধি পলাতক রয়েছেন। তার ছেলে রিয়ানের মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ করা হলে তিনি ‘রং নম্বর’ বলে ফোন কেটে দেন।
কিশোরগঞ্জ কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের অধ্যক্ষ জাভেদ রহিম বলেন,
“পাসপোর্ট থাকলেই প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ভিসা যাচাই আমাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না। কেউ এই সুযোগ নিয়ে প্রতারণা করলে তা আমাদের জানার উপায় নেই।”
জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিসের কর্মকর্তা আলী আকবর বলেন,
“ভিসা যাচাই করা আমাদের কাজ নয়। আমরা শুধু ফিঙ্গারপ্রিন্ট গ্রহণ করি। প্রতারণার শিকার হলে অভিবাসন আইনে মামলা করাই করণীয়।”







