ব্যবসায়ীদের শাটডাউনে অচল শহর
কিশোরগঞ্জ শহরের ফুটপাত কে দখল করবে—হকার নাকি চাঁদাবাজ সিন্ডিকেট—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতে সাধারণ মানুষ বিক্ষুব্ধ, ব্যবসায়ীরা রাস্তায়, আর প্রশাসনের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে।
শহরের প্রধান সড়কগুলো গত কয়েক বছর ধরে একটি অবৈধ দখল মহোৎসবে পরিণত হয়েছে। ফুটপাত দখল, অস্থায়ী দোকান, যত্রতত্র স্টল আর প্রতিদিনের চাঁদাবাজির কারণে শহরের জনজীবন কার্যত পঙ্গু। অ্যাম্বুলেন্স পর্যন্ত আটকে যায় হকারদের স্থাপনায়; তবুও কোনো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
ফুটপাত দখলে ‘অদৃশ্য ক্ষমতা’ তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ ব্যবসায়ীদের। দীর্ঘদিনের ভোগান্তিতে অতিষ্ঠ ব্যবসায়ীরা বলছেন, ফুটপাত দখলদাররা শুধু জায়গা দখল করছে না; তারা ব্যবসা, চলাচল, নিরাপত্তা—সবকিছুতে ভয়াবহ বিশৃঙ্খলা তৈরি করেছে।
ব্যবসায়ী সমিতি জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের কাছে স্মারকলিপি দিয়ে জানিয়েছে, ফুটপাত এখন জনতার নয়; হকার ও চাঁদাবাজ সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে। মার্কেট এলাকায় ক্রেতারা হাঁটতে পারে না, যানজট নিত্যদিনের। ঝগড়াঝাঁটি, ধাক্কাধাক্কি, শব্দদূষণ—এসব এখন শহরের স্বাভাবিক চিত্র হয়ে গেছে। ব্যবসায়ীদের ভাষায়, এটি আর ফুটপাত দখল নয়—এটি প্রশাসনের নাকের ডগায় প্রকাশ্য সন্ত্রাস।
গতকাল রাতে ফুটপাত হকারদের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের তীব্র বাকবিতণ্ডা ও সংঘর্ষের পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। উত্তেজিত ব্যবসায়ীরা ঘোষণা দেন—কিশোরগঞ্জ মার্কেট আজ থেকে শাটডাউন। শহরে বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। স্লোগান ওঠে—‘কিশোরগঞ্জে সন্ত্রাসীদের ঠাঁই নেই’, ‘হকার সন্ত্রাস বন্ধ করো’, ‘চাঁদাবাজ সিন্ডিকেট ভেঙে দাও’। পরে ব্যবসায়ী নেতারা জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে স্মারকলিপি জমা দেন।
হকারদের মুখে আরও ভয়ঙ্কর অভিযোগ উঠে এসেছে। তাদের দাবি, ফুটপাতে ব্যবসা করতে হলে প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা চাঁদা দিতে হয়। ৫ আগস্টের আগে এই টাকা দিতে হতো সুমন মাহমুদকে; এখন এই টাকার বড় অংশ যায় কিশোরগঞ্জ জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক জাকারিয়া ঝুমনের কাছে।
পূর্বেও ফুটপাতের হকারদের কাছ থেকে প্রতিনিয়ত চাঁদাবাজি করে বেড়ানোর অভিযোগে জাকারিয়া ও তার ভাই–ভাতিজাদের বিরুদ্ধে হারুয়া এলাকার লোকজন একাধিক মামলা করেছে। গ্রেফতারের দাবিতে মিছিল, মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচিও পালন করেছে। কিন্তু দলের নেতৃবৃন্দ কোনো সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়নি; বরং উল্টো জাকারিয়া গংদের রক্ষার জন্য থানায় তদবির করেছে বলেও অভিযোগ হারুয়া এলাকাবাসীর।
এ বিষয়ে কিশোরগঞ্জ জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক জাকারিয়া ঝুমন বলেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে তার নামে এসব রটানো হচ্ছে। তার দাবি, তার সঙ্গে শতাধিক হকার রয়েছে, তিনি কোনো চাঁদাবাজি করেননি, কাউকে করতে দেনওনি। তার ভাষ্য—যারা তার নামে অভিযোগ দিয়েছে তারা প্রকৃত হকার নয়; হকারদের কাছ থেকে চাঁদা দাবি করেন আখড়া বাজারের পাপন, সুজন, ওয়ালিদ গংরা।
হকাররা বলেন, “আমরা টাকা দিই বলে ফুটপাতে ব্যবসা করি। নিজেদের ক্ষমতায় কেউ এখানে বসতে পারে না। প্রতিটি দোকানের জন্য জামানত দিতে হয়েছে ৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকা। প্রতিদিন টাকা না দিলে নেতাদের লোকজন এসে মারধর করে। এখন আমরা বিপদে—নেতারা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।”
সরকার পরিবর্তনের পর চাঁদা কম দিতে চাইলে জাকারিয়া ঝুমন ও তার লোকজন মারধর ও কুপিয়ে জখম করেছে বলেও অভিযোগ হকারদের। মামলা হলেও পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তার করেনি। চাঁদা না দিলে সঙ্গে সঙ্গে ‘গুন্ডাপাণ্ডা’ বাহিনী এসে স্টল উল্টে দেয়, মালপত্র ভাঙচুর করে, দোকান বন্ধ রাখার হুমকি দেয়। এই চক্র ফুটপাত ব্যবসায়ী ও দোকানদার উভয়ের কাছ থেকেই টাকা তোলে।
এক হকার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আজ আমরা উচ্ছেদের মুখে পড়ে গেছি; কিন্তু যারা আমাদের কাছ থেকে প্রতিদিন টাকা নিয়েছে, তারা এখন আমাদের নামও নিচ্ছে না।”
হকারদের দাবি, শুধু ফুটপাত নয়—গুরুদয়াল সরকারি কলেজ মাঠেও প্রতিদিন ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা ওঠে জাকারিয়া ঝুমনের লোকজনের মাধ্যমে। তার নাম কেউ মুখে আনলেই মারধরের ভয় দেখানো হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক হকার বলেন, “আগে ক্ষমতাসীনরা যেভাবে রাজনৈতিক ছায়ায় চাঁদাবাজি করত, এখনো একই পদ্ধতিতে চলছে। দল পাল্টায়, নেতৃত্ব পাল্টায়—কিন্তু চাঁদাবাজি থামে না।”
ব্যবসায়ীদের দাবি—ফুটপাত দখলকারীদের অবিলম্বে উচ্ছেদ, চাঁদাবাজি সিন্ডিকেট ধ্বংস, স্থায়ী নজরদারি টিম গঠন, ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা।
শহরের সাধারণ মানুষ মনে করছেন, প্রশাসন দেরি করলে কিশোরগঞ্জের পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নেবে। স্মারকলিপিতে জমা দেওয়া অভিযোগগুলো অত্যন্ত গুরুতর। ফুটপাত দখল, চাঁদাবাজি, হামলা, রাজনৈতিক প্রভাব—সবকিছুই বহুদিন ধরে চলে আসছে; কিন্তু এখনো দৃশ্যমান কোনো কঠোর অভিযান হয়নি।
এক ব্যবসায়ী ক্ষোভ জানিয়ে বলেন, “অবৈধ দখল ও চাঁদাবাজি বন্ধ করতে প্রশাসনের এক দিনের অভিযানই যথেষ্ট। কিন্তু প্রশ্ন হলো—তারা কি সত্যিই চাইছে?”
কিশোরগঞ্জ শহর এখন দুই শক্তির দ্বন্দ্বে জর্জরিত—হকার দখলদার ও চাঁদাবাজ সিন্ডিকেট বনাম সাধারণ ব্যবসায়ী জনতা।
কিশোরগঞ্জ জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব শহীদুল্লাহ কায়সার শহীদ বলেন, দলের নাম ভাঙিয়ে যদি কেউ কোনো ধরনের চাঁদাবাজিতে লিপ্ত থাকে, তা প্রমাণিত হলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনো ধরনের সন্ত্রাস বা চাঁদাবাজির দায় সংগঠন নেবে না।
প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ ছাড়া এই উত্তপ্ত পরিস্থিতি আরও বিস্ফোরক হয়ে উঠতে পারে, এবং কিশোরগঞ্জ একটি স্থায়ী সংকটে জড়িয়ে পড়তে পারে—যেখান থেকে ফিরে আসা কঠিন হবে।







