ফেসবুকে সরকারবিরোধী পোস্টসহ নানা অভিযোগে অভিযুক্ত প্রশিক্ষক অন্তর
কিশোরগঞ্জ কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (টিটিসি)-এর ইলেকট্রিক্যাল ট্রেডের খণ্ডকালীন প্রশিক্ষক শাহরিয়ার রশিদ অন্তরের বিরুদ্ধে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ ফেসবুক পোস্ট, সার্টিফিকেট বাণিজ্য, প্রশিক্ষণার্থীদের ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠানে নিয়ে গিয়ে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা, দায়িত্বহীনতা, কাঁচামাল সংক্রান্ত অনিয়ম, প্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও সিনিয়র কর্মকর্তাদের প্রতি অসৌজন্যমূলক আচরণসহ একাধিক অভিযোগ উঠেছে।
এ সম্পর্কিত অভিযোগের বিষয়ে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ তাকে পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে লিখিত জবাব দিতে বললেও তিনি জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) করিমগঞ্জ উপজেলা যুগ্ম সমন্বয়কারী পরিচয়ে উল্টো টিটিসির ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোহাম্মদ জাভেদ রহিমের প্রতি অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন বলে জানা গেছে।
প্রতিষ্ঠান সূত্র জানায়, গত ১৫ অক্টোবর প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের পরিদর্শনকালে অন্তর বিনা অনুমতিতে কর্মস্থল ত্যাগ করেন। এছাড়া ২০২৪–২৫ অর্থবছরে ইলেকট্রিক্যাল ট্রেডের প্রশিক্ষণার্থীদের জন্য কাঁচামাল ক্রয় ও সরবরাহসংক্রান্ত ব্যয়ে অফিসিয়াল ইমেইলে মিথ্যা তথ্য প্রচারের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের ও কর্মকর্তাদের ভাবমূর্তি নষ্ট করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ফলাফলের নথিতে দেখা যায়, এপ্রিল–জুন ২০২৫ সেশনে অন্তরের ট্রেডে ২৯ জনের মধ্যে কম্পিটেন্ট হয়েছে মাত্র ৯ জন—যা প্রতিষ্ঠানের গড় মানের তুলনায় অনেক কম। টিটিসির একজন সিনিয়র প্রশিক্ষক মন্তব্য করেন, এমন কম্পিটেন্সি রেট শুধু প্রশিক্ষণার্থীদের নয়, প্রশিক্ষকের দক্ষতা ও মনোযোগকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে।
শাহরিয়ার রশিদ অন্তর ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে প্রেরিত একটি ইমেইলে ইলেকট্রিক্যাল ট্রেডের ইনস্ট্রাক্টর ও ট্রেড ইনচার্জ মিজানুর রহমানকে যোগ্যতাহীন, মানহীন, অদক্ষ বলাসহ গালিগালাজ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে সরকারি প্রতিষ্ঠানের ভেতরে এমন ভাষা ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মন্তব্য করেছেন।
সাম্প্রতিক প্রশিক্ষণ শেষ করা রবিউল আউয়াল বলেন, “আমি এখানে প্রশিক্ষণে আসলে অন্তর স্যার ১০ হাজার টাকা দাবি করে বলেন—কিছুই করতে হবে না, তিনি সার্টিফিকেটের ব্যবস্থা করে দেবেন। এছাড়া তাঁর ব্যক্তিগত একটি প্রশিক্ষণ সেন্টারে ভর্তি হতে জোর করেন। পরে আমি রাজি হইনি।”
কাটাবড়িয়া এলাকার হোটেল ব্যবসায়ী আ. রাশিদ বলেন, “অন্তর টিটিসিতে চাকরির সুবাদে পাসপোর্ট দালালি, সার্টিফিকেট বাণিজ্য, নিজের ট্রেনিং সেন্টারে প্রশিক্ষণার্থীদের নিয়ে যাওয়ার মতো কাজ করছে। এতে টিটিসির মতো সরকারি প্রতিষ্ঠানের বড় ক্ষতি হচ্ছে।”
অন্য এক স্থানীয় জানান, “অন্তর এনসিপির নেতা। অধ্যক্ষ, পরিচালক তার কাছে কিছুই না। সে প্রকাশ্যে বর্তমান সরকারকে নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করে। প্রিন্সিপালকে নিয়েও বাইরে সমালোচনা করে। বলে—প্রিন্সিপালকে না সরালে তার শান্তি নেই।”
মহিনন্দন ইউনিয়নের সৌদি–ফেরত প্রবাসী মো. কামরুজ্জামান সজিব মিয়া বলেন, “আমি টিটিসিতে ট্রেনিং করতে গেলে অন্তরের সঙ্গে পরিচয় হয়। সে আমাকে ভালো ভিসা বলে অফার করে এবং ভিসা বাবদ ৭ লাখ টাকা চায়। টিটিসির চাকরি করার কারণে তাকে বিশ্বাস করে টাকা দিলেও তার কথা–কাজের কোনো মিল পাইনি। তিন মাস পর দেশে ফিরে আসতে হয়েছে। এখন ১০ লাখ টাকা ঋণ মাথায় নিয়ে ঘুরছি।”
অন্তরের এলাকার বাসিন্দা রেজাউল কবির রেজা বলেন, “অন্তরের বাবা করিমগঞ্জের পরিচিত কমিউনিস্ট পার্টির নেতা ছিলেন এবং যুদ্ধপরাধ মামলার সাক্ষী ছিলেন। হতে পারে, অন্তরও তার বাবার মতো প্রতিবাদী হওয়ার চেষ্টা করছে। না হলে সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করে আবার সরকারের সমালোচনা—এটা কেমন বিষয়!”
অভিযোগের বিষয়ে শাহরিয়ার রশিদ অন্তর বলেন, “আমি কোনো সরকারি চাকরি করি না যে, সরকারি চাকরি বিধির পরিপন্থী কোনো কাজ করেছি। আমি যে আইডি দিয়ে সমালোচনা করেছি—সেটা আমার রাইটস আছে। বর্তমানে সেই ফেসবুক আইডি ডিজেবল করা আছে। সার্টিফিকেট বাণিজ্যের কথা সঠিক নয়। কাউকে বিদেশ পাঠিয়েছি—তার প্রমাণ থাকলে নিউজ করুন।”
এ বিষয়ে কিশোরগঞ্জ কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (টিটিসি)-এর অধ্যক্ষ মো. জাভেদ রহিম বলেন, “তার বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি অভিযোগ পেয়েছি। অভিযোগের সত্যতা মিললে তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিলে তিনি ঠিকভাবে জবাব দিতে পারেননি। পরে আমি বিএমইটির পরিচালক বরাবর চিঠি পাঠিয়েছি। প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখা হচ্ছে।”













