প্রায় চার বছর ওমানে কাটিয়ে দেশে ফিরেছেন কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার মানিকদী নতুন বাজার এলাকার বাসিন্দা শরীফুল ইসলাম (২৫)। দেশে ফেরার আনন্দের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল নতুন জীবনের প্রস্তুতি। ইতিমধ্যে মুঠোফোনে তাঁর বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে। দেশে ফিরে আনুষ্ঠানিকতা শেষে স্ত্রীকে ঘরে তোলার কথা ছিল তাঁর। এ জন্য বিমানবন্দর থেকে তাঁকে আনতে মাইক্রোবাস নিয়ে ঢাকায় গিয়েছিলেন স্বজনেরা। কিন্তু বাড়ি ফেরার পথে তাঁদের আনন্দ বিষাদে পরিণত হয়। সড়কে ডাকাতের কবলে পড়ে বিয়ের জন্য কেনা স্বর্ণালংকারসহ মূল্যবান জিনিসপত্র হারান তাঁরা।
রোববার দিবাগত রাত আনুমানিক ৪টা ২০ মিনিটে কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার দাড়িয়াকান্দি কাঁঠালতলা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ৬ থেকে ৭ জনের একটি দল মাইক্রোবাসটির পথরোধ করে। এ সময় পাঁচ বছরের এক শিশুর গলায় ছুরি ধরে ভয় দেখিয়ে বিয়ের জন্য কেনা স্বর্ণালংকার ও অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী থাকা লাগেজ নিয়ে যায় ডাকাতেরা।
ডাকাতির পর অভিযুক্ত ব্যক্তিরা একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় করে ছয়সূতি বাসস্ট্যান্ডের দিকে পালিয়ে যায় বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, শরীফুলকে বিমানবন্দর থেকে আনতে তাঁর বাবা আপুস মিয়া, বোন ও পাঁচ বছর বয়সী ভাগনে তাকরিম একটি মাইক্রোবাস নিয়ে ঢাকায় যান। তাঁদের সঙ্গে ছিলেন চালক সাইমন। তিনি শরীফুলের ফুফাতো ভাই এবং একই এলাকার বাসিন্দা।
রোববার দিবাগত রাত দেড়টার দিকে ঢাকার বিমানবন্দর থেকে মাইক্রোবাস নিয়ে ভৈরবের উদ্দেশে রওনা হন তাঁরা। ভোর ৪টার দিকে ভৈরবের নাভানা পাম্পে গ্যাস নেওয়ার পর কুলিয়ারচরের দিকে যাত্রা করেন। প্রায় ২০ মিনিট পর দাড়িয়াকান্দি কাঁঠালতলা এলাকায় পৌঁছালে ৬ থেকে ৭ জনের একটি দল তাঁদের গাড়ির পথরোধ করে।
মাইক্রোবাসচালক সাইমন বলেন, ডাকাত দলের সদস্যরা গাড়িতে থাকা শিশু তাকরিমের গলায় ছুরি ধরে ভয় দেখায়। এ সময় শরীফুল ইসলামের সঙ্গে ডাকাতদের কিছুটা ধস্তাধস্তি হয়। পরে গাড়ির পেছনে থাকা লাগেজ নিয়ে যায় তারা।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, ডাকাতেরা মাইক্রোবাসে থাকা বড় আকারের কয়েকটি মালামালের কার্টনও নেওয়ার চেষ্টা করে। তবে কার্টনগুলো ভারী হওয়ায় কিংবা সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তোলা সম্ভব না হওয়ায় সেগুলো রাস্তার পাশে ফেলে যায়। যে লাগেজটি নিয়ে যায়, তাতেই শরীফুলের বিয়ের জন্য কেনা স্বর্ণালংকারসহ মূল্যবান ও গুরুত্বপূর্ণ জিনিসপত্র ছিল।
ভুক্তভোগীদের দাবি, ডাকাতির সময় পুলিশ ছয়সূতি বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অবস্থান করছিল। ডাকাতেরা ওই দিক দিয়ে পালিয়ে গেলেও তাদের আটক করা সম্ভব হয়নি।
শরীফুল ইসলাম বলেন, ‘দেশের অবস্থা এতটা খারাপ হয়েছে, তা বুঝতে পারিনি। চার বছর পর দেশে ফিরলাম বিয়ে করার জন্য। বিয়ের অলংকার থেকে শুরু করে মূল্যবান সব জিনিসপত্র যে লাগেজে ছিল, সেটিই নিয়ে গেছে। এমনকি আমার পাঁচ বছরের ভাগনের গলায় ছুরি ধরেছে। বিয়েসহ সবকিছু ঠিকঠাক ছিল, এখন বাধ্য হয়ে বিয়ের অনুষ্ঠানের সময়টাও পরিবর্তন করতে হচ্ছে।’
এ বিষয়ে কুলিয়ারচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোজাম্মেল হক বলেন, এ ঘটনায় থানায় কোনো অভিযোগ আসেনি। অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে কুলিয়ারচরের বিভিন্ন সড়কে সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, গত দুই মাসে নোয়াগাঁও, আগরপুর, বাজরা ও আশপাশের এলাকায় একাধিক অপরাধের ঘটনা ঘটেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, গত ২৮ আগস্ট দিবাগত রাতে নোয়াগাঁও এলাকায় রিফ্লেকটিভ ভেস্ট পরা কয়েকজন ব্যক্তি একটি মাইক্রোবাস থামিয়ে যাত্রীদের মালামাল লুট করেন। এর আগের দিন, ২৭ আগস্ট, বাজরা বাসস্ট্যান্ডে মাইক্রোবাস আটকে একই ধরনের ডাকাতির ঘটনা ঘটে।
এ ছাড়া ১ অক্টোবর রাতে আগরপুর বাসস্ট্যান্ডসংলগ্ন এলাকায় সড়কে ব্যারিকেড দিয়ে এক মোটরসাইকেলচালককে জখম করে তাঁর মোটরসাইকেল ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। পরদিন, ২ অক্টোবর রাতে উত্তর লক্ষ্মীপুর–রাজগোপাট সড়কে এক যুবককে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে টাকা ও মালামাল লুটের অভিযোগও পাওয়া যায়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব ঘটনার বাইরেও গত দুই মাসে আরও একাধিক ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। নোয়াগাঁও, আগরপুর, বাজরা ও আশপাশের সড়কে রাতের বেলায় এ ধরনের ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এসব সড়কে নিরাপত্তা জোরদার এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
Disqus comments are not configured yet.