সংস্কারের নামে লক্ষ্যভ্রষ্ট অন্তর্বর্তী সরকার, আট অধ্যাদেশ নিয়ে টিআইবির প্রশ্ন
সংস্কারের অংশ হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রণীত আটটি অধ্যাদেশ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)।
সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন,
‘সংস্কারের নামে যতটুকু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা প্রায় সব ক্ষেত্রেই বাস্তবায়নে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার কার্যত আমলাতন্ত্রের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। কেন এই আত্মসমর্পণ হলো, দুর্বলতাটা কোথায়—সেটাই মূল প্রশ্ন। তবে সরকারের অভ্যন্তরে কীভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, সে বিষয়ে সরাসরি অভিজ্ঞতা না থাকায় নির্দিষ্ট উত্তর আমার কাছে নেই।’
সোমবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবির কার্যালয়ে আয়োজিত ‘অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশ প্রণয়নে সংস্কার বিমুখতা’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, সরকারি হিসাব নিরীক্ষা অধ্যাদেশ, রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ, সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশ এবং জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ নিয়ে টিআইবির পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়।
টিআইবির সার্বিক পর্যবেক্ষণে বলা হয়,
‘সংস্কারের জন্য খাত বা প্রতিষ্ঠান নির্ধারণে কোনো সুস্পষ্ট কৌশল অনুসরণ করা হয়েছে—এমন বিবেচনার সুযোগ নেই। ১১টি কমিশন ও কমিটির বাইরে শিক্ষা, কৃষি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যবসার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাত বাদ পড়েছে, যার কোনো ব্যাখ্যা নেই। গণভোটের সিদ্ধান্ত ছাড়া সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের কোনো কর্মকৌশল প্রণীত হয়নি।’
এতে আরও বলা হয়,
‘শুরু থেকেই সংস্কারবিরোধী মহলকে চিহ্নিত করে প্রতিহত করার প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করা হয়নি। বরং এই অপশক্তির কাছে আত্মসমর্পণের ফলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ বাতিল হয়েছে এবং সংস্কারবিরোধী সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।’
পর্যবেক্ষণে আরও উল্লেখ করা হয়, অধিকাংশ ক্ষেত্রে অংশীজনদের সম্পৃক্ত না করেই অধ্যাদেশ প্রণয়ন করা হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে খসড়া অধ্যাদেশ স্বল্প সময়ের জন্য ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে দায়সারা দায় এড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে।
আমলাতন্ত্রের কাছে সরকারের নতি স্বীকারের উদাহরণ তুলে ধরে বলা হয়,
‘দুদক, পুলিশ কমিশন, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, সাইবার সুরক্ষা ও উপাত্ত সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশগুলোতে জাতীয় স্বার্থের তুলনায় আমলাতান্ত্রিক ও ক্ষমতাসীনদের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব বজায় রাখার সুযোগ রাখা হয়েছে।’
পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ প্রসঙ্গে টিআইবি বলেছে,
‘যেভাবে অধ্যাদেশটি প্রণীত হয়েছে, তাতে স্বাধীন পুলিশ কমিশনের স্বপ্ন ধুলিস্যাৎ হয়েছে। এটি বাস্তবে পুলিশের ক্ষমতার অপব্যবহার রোধের বদলে তা সুরক্ষিত করার প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।’
মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ নিয়েও সমালোচনা করে বলা হয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অংশীজনদের মতামত উপেক্ষা করে এতে আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে।
দুদক সংস্কার প্রসঙ্গে টিআইবির অভিযোগ,
‘অন্য অংশীজনদের সম্পৃক্ত না করে দুদক ও আমলাতন্ত্রের একচ্ছত্র কর্তৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ বাদ দেওয়া হয়েছে, যা দুদকের স্বাধীনতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতের পরিপন্থী।’
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন,
‘উপদেষ্টা পরিষদ বা মন্ত্রিপরিষদ থাকলেও বাস্তবে অপারেশনাল সিদ্ধান্ত সেখানে হয় না। কোন সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে, কোন ধারা থাকবে বা বাদ যাবে—এসব নির্ধারণ করে রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরের কিছু প্রভাবশালী মহল।’
তিনি আরও বলেন,
‘রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত শক্তিগুলোই সংস্কারকে বাধাগ্রস্ত করছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনের একটি অংশ পর্দার আড়াল থেকে উপদেষ্টাদের চেয়েও বেশি প্রভাব বিস্তার করছে।’
সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির উপদেষ্টা নির্বাহী ব্যবস্থাপনা অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের, পরিচালক মুহাম্মদ বদিউজ্জামানসহ অন্যান্যরা উপস্থিত ছিলেন।










