শিক্ষা ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ক্ষোভ, উত্তাল ইউরোপ
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে শিক্ষাব্যবস্থার সংকট, আবাসনসংকট ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছেন তরুণ-তরুণীরা। স্পেন, ফ্রান্স, পর্তুগাল, ইতালি ও আলবেনিয়াসহ কয়েকটি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে বিক্ষোভ। কোথাও শিক্ষকদের সংকট ও শিক্ষার মান নিয়ে ক্ষোভ, আবার কোথাও বাড়িভাড়া ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি আন্দোলনের প্রধান কারণ হয়ে উঠেছে।
ফ্রান্সে দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, শিক্ষকের ঘাটতি, জরাজীর্ণ শ্রেণিকক্ষ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ার প্রতিবাদে বিক্ষোভ করছেন উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। কয়েকটি বিক্ষোভে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। শিক্ষকস্বল্পতার কারণে অনেক শিক্ষার্থী কয়েক মাস ধরে নিয়মিত পাঠদান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন সাধারণ মানুষও। বিশেষ করে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে। হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর জ্বালানি সরবরাহে সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। এ পরিস্থিতির সঙ্গে মার্কিন বোমাবর্ষণের প্রভাবের কথাও উল্লেখ করা হচ্ছে।
ফ্রান্সের অন্যতম বৃহৎ শ্রমিক সংগঠন জেনারেল কনফেডারেশন অব লেবার (সিজিটি) বিক্ষোভকারীদের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। সংগঠনটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমানো, পেনশন বৃদ্ধি ও শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর দাবি তুলেছে।
শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন, শিক্ষকদের সংকট নিরসন এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর দাবিতে ইউরোপজুড়ে তরুণদের এই প্রতিবাদ নতুন করে জন-অসন্তোষের চিত্র তুলে ধরেছে।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের শেষ পর্যায়ে রয়েছেন। দেশটির প্রতিবেশী স্পেনে গত সেপ্টেম্বরে বাড়িভাড়া ও আবাসনের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে রাস্তায় নামেন বিক্ষোভকারীরা। একটি বিনিয়োগ তহবিল ৮৭ বছর বয়সী এক নারীর বাড়িভাড়া ২৩০ শতাংশ বাড়িয়ে দেওয়ার পর তাঁকে বাড়ি ছাড়তে হয়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ শুরু হয়। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার দুই সপ্তাহ পর মারা যান মারিক্যারমেন আবাসকাল।
বিক্ষোভকারীরা বাড়িভাড়া কমানো, উচ্ছেদ বন্ধ করা এবং বিনিয়োগ তহবিলগুলোর আবাসন কেনার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের দাবি জানিয়েছেন।
শনিবার পর্তুগালেও একই ধরনের দাবিতে বিক্ষোভ হয়েছে। রাজধানী লিসবনের কেন্দ্রে শত শত মানুষ জড়ো হন। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দেশটিতে আবাসনের দাম ১২৪ শতাংশ বেড়েছে। এই বৃদ্ধির হার ইউরোপীয় ইউনিয়নের গড় বৃদ্ধির প্রায় দ্বিগুণ।
ইতালির মিলান শহরেও বিক্ষোভকারীরা পরিবারের সীমিত আয় ও বাড়তি ব্যয়ের বিষয়টি তুলে ধরেন। শনিবার সেখানে একটি মিছিল শান্তিপূর্ণভাবে শুরু হলেও শেষ দিকে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। মুখোশধারী কয়েকজন বিক্ষোভকারী দাঙ্গা পুলিশের দিকে পাথর ও বিভিন্ন বস্তু ছুড়ে মারেন। তাঁরা রাস্তার বিভিন্ন জিনিস দিয়ে তৈরি ব্যারিকেডেও আগুন ধরিয়ে দেন।
এদিকে আলবেনিয়ায় প্রধানমন্ত্রী এডি রামার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ ষষ্ঠ দিনে গড়িয়েছে। দুর্নীতি, কর্মসংস্থানের অভাব ও শিক্ষার নিম্নমান নিয়ে অসন্তোষ থেকে এ আন্দোলন চলছে বলে জানিয়েছেন বিক্ষোভকারীরা। গ্রীষ্মকাল থেকেই চলা এই আন্দোলনের সূত্রপাত ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের সমর্থিত একটি বিলাসবহুল উপকূলীয় আবাসন প্রকল্পকে কেন্দ্র করে।
ফ্রান্সে নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরুর এক সপ্তাহ পর, সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে শিক্ষাসংক্রান্ত বিক্ষোভ শুরু হয়। এরপর আন্দোলন আরও তীব্র হয় এবং শনিবার তা চরম আকার ধারণ করে। ইতালি, পর্তুগাল ও বেলজিয়ামেও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে শনিবার বিক্ষোভ হয়েছে।
অন্যদিকে আলবেনিয়ায় গ্রীষ্মকাল থেকেই সরকারবিরোধী বিক্ষোভ চলছে। আবাসন প্রকল্প, দুর্নীতি, কর্মসংস্থান ও শিক্ষার মান নিয়ে ক্ষোভ দেশটির আন্দোলনকে আরও বিস্তৃত করেছে।
ফ্রান্সে শিক্ষকদের ঘাটতি পূরণে সরকার আরও তিন হাজার অস্থায়ী শিক্ষক নিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। পাশাপাশি স্কুলের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের যুক্ত করার কথাও জানানো হয়েছে। আগামী বছরের বাজেটে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিবন্ধন ফি বাড়ানোর পরিকল্পনাও বাতিল করেছে সরকার।
এ ছাড়া সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি জ্বালানির মূল্য নিয়ে বিক্ষোভের পর নির্দিষ্ট কিছু শিল্পের জন্য জ্বালানি ভর্তুকি বাড়ানোর ঘোষণা দেয় এলিসি প্রাসাদ।
স্পেনে সমাজতান্ত্রিক প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ ভাড়াটিয়াদের সুরক্ষায় একটি জরুরি আবাসন আইন পাসের উদ্যোগ নেন। তবে দেশটির কংগ্রেসে ডানপন্থী ও কট্টর ডানপন্থী দলগুলোর বিরোধিতায় আইনটি পাস হয়নি। এরপর সানচেজ ২৯ নভেম্বর আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দেন। নতুন সংস্কার বাস্তবায়নে বৃহত্তর প্রগতিশীল সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ দেশজুড়ে বিভিন্ন স্থানে ভবন ঘিরে বিক্ষোভের জন্য ‘চরম বামপন্থী’ বিক্ষোভকারীদের দায়ী করেছেন। একই সঙ্গে লুটপাট ও ভাঙচুরে জড়িত ব্যক্তিদেরও সমালোচনা করেছেন। দেশটিতে ২০২৭ সালের এপ্রিলে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। ফলে বিক্ষোভের চাপ সরকারের নীতিনির্ধারণে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা আগামী দিনগুলোতে স্পষ্ট হতে পারে।
স্পেনে সরকার আবাসনসংক্রান্ত কিছু অধ্যাদেশ সংসদের স্থায়ী পরিষদের মাধ্যমে পাস করাতে পারলে বিক্ষোভের তীব্রতা কমতে পারে। সংসদের অধিবেশন না চলার সময় এই পরিষদ নির্দিষ্ট কিছু দায়িত্ব পালন করে। দেশটির সমাজতন্ত্রী দল ও রক্ষণশীল পিপলস পার্টি—উভয় দলই আগামী নির্বাচনে জয়ী হলে আরও বাড়ি নির্মাণ এবং আবাসনসংকট সমাধানে গুরুত্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
তবে ইউরোপজুড়ে এই বিক্ষোভের অবসান অনেকটাই নির্ভর করছে সরকারগুলোর পদক্ষেপ, আবাসন ও জীবনযাত্রার ব্যয়সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান এবং বিক্ষোভকারীদের দাবির কতটা পূরণ হচ্ছে তার ওপর।










Disqus comments are not configured yet.