অর্থসংকটে গাজায় খাদ্য সহায়তা কমাল ডব্লিউএফপি
শীতের আগমুহূর্তে অর্থসংকটের কারণে ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় খাদ্য সহায়তা কমিয়ে দিয়েছে জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি)। সংস্থাটির এ সিদ্ধান্তে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ জরুরি খাদ্য সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। একই সঙ্গে সহায়তা পাওয়া পরিবারগুলোর জন্য খাদ্যসামগ্রীর বরাদ্দ অর্ধেকে নামিয়ে আনা হয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত, বেকারত্ব ও নাজুক জীবনযাত্রার মধ্যে নতুন এই সংকট গাজার অসহায় মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়াতে পারে।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) ডব্লিউএফপি জানায়, অর্থের অভাবে গাজায় তাদের সহায়তার আওতা কমাতে হয়েছে। গত মাসে প্রায় ১৬ লাখ মানুষকে খাদ্য ও নগদ সহায়তা দেওয়া হলেও চলতি মাসে তা কমিয়ে ১১ লাখে আনা হয়েছে।
২০২৫ সালের অক্টোবরে ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকে গাজায় প্রতি মাসে বিপুলসংখ্যক মানুষের কাছে খাদ্য প্যাকেট, গমের আটা, রুটি, রান্না করা খাবার, পুষ্টিসহায়তা, স্কুলের নাশতা ও নগদ অর্থ পৌঁছে দিচ্ছিল সংস্থাটি। গত তিন বছরে গাজার বহু পরিবারের জন্য এই সহায়তা বেঁচে থাকার অন্যতম অবলম্বন হয়ে উঠেছে।
অর্থসংকটের প্রভাব সরাসরি পড়েছে খাদ্য সহায়তা পাওয়া পরিবারগুলোর ওপর। আগে একটি পরিবারকে দুটি খাদ্য প্যাকেট দেওয়া হলেও এখন দেওয়া হবে একটি। একই সঙ্গে গমের আটার পরিমাণও কমানো হয়েছে। ফলে সীমিত খাদ্য দিয়ে পরিবারের সদস্যদের চাহিদা মেটানো আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
নগদ সহায়তার ক্ষেত্রেও কাটছাঁট করা হয়েছে। গাজার ৭৫ হাজার পরিবারের জন্য আর্থিক সহায়তার পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছে ডব্লিউএফপি। এ ছাড়া প্রতিদিন রান্না করা খাবার বিতরণের সংখ্যাও আড়াই লাখ থেকে কমিয়ে দেড় লাখে নামানো হচ্ছে।
দুর্গম এলাকায় এবং ইসরায়েলি সামরিক নিয়ন্ত্রণের ‘হলুদ রেখা’র কাছাকাছি বসবাসকারী পরিবারগুলোকে প্রতিদিনের পরিবর্তে এক দিন পরপর রান্না করা খাবার দেওয়া হবে। এতে নিয়মিত খাবারের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোর খাদ্যসংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে কিছু কার্যক্রম চালু রাখছে সংস্থাটি। গাজার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ রুটির চাহিদা পূরণকারী বেকারিগুলোতে সহায়তা অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি তিন লাখ নারী ও শিশুকে পুষ্টিসহায়তা এবং দুই লাখ শিক্ষার্থীকে স্বাস্থ্যকর স্কুলের নাশতা দেওয়ার কার্যক্রমও চালু থাকবে।
গাজায় খাদ্য সহায়তা কমানোর সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এসেছে, যখন উপত্যকাটির ৮০ শতাংশের বেশি মানুষ বেকার। বাজারে খাদ্যসামগ্রী পাওয়া গেলেও আয় না থাকায় বহু পরিবারের পক্ষে তাজা শাকসবজি ও আমিষসমৃদ্ধ খাবার কেনা সম্ভব হচ্ছে না।
ডব্লিউএফপির হিসাব অনুযায়ী, গাজার প্রায় ১৪ লাখ মানুষ—অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার ৬৭ শতাংশ—সংকটপূর্ণ বা আরও গুরুতর পর্যায়ের খাদ্য অনিরাপত্তার মধ্যে রয়েছেন। ২০২৫ সালের শেষ দিকে এ হার ছিল ৭৭ শতাংশ। অর্থাৎ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও তা এখনো নাজুক।
সংস্থাটি সতর্ক করেছে, জরুরি খাদ্য সহায়তা না পেলে প্রায় দুই লাখ মানুষ অনাহারজনিত মৃত্যুর ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। শিশুদের পুষ্টির অবস্থাও উদ্বেগজনক। গাজার প্রতি পাঁচটি শিশুর মধ্যে মাত্র একটি পর্যাপ্ত বৈচিত্র্যপূর্ণ খাবার পায়। স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য জরুরি পরিষেবায় প্রবেশাধিকারও সীমিত।
শীত ঘনিয়ে আসায় গাজার মানুষের জন্য জরুরি খাদ্য সহায়তা অব্যাহত রাখা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এ পরিস্থিতিতে খাদ্য সরবরাহের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় প্রকৌশলগত সহায়তা এবং শিশু, অন্তঃসত্ত্বা ও স্তন্যদানকারী নারীদের অপুষ্টি প্রতিরোধে দ্রুত অর্থায়নের আহ্বান জানিয়েছে ডব্লিউএফপি।
সংস্থাটি জানিয়েছে, ২০২৬ সালে ফিলিস্তিনে তাদের কার্যক্রমের জন্য পাওয়া অর্থের পরিমাণ আগের কয়েক বছরের তুলনায় অর্ধেকেরও কম। গাজা ও পশ্চিম তীরে আগামী মার্চ পর্যন্ত জরুরি কার্যক্রম চালিয়ে যেতে তাদের ৪৫ কোটি ডলার প্রয়োজন।
অর্থসংকটের প্রভাব গাজার বাইরেও পড়েছে। অধিকৃত পশ্চিম তীরে গত সেপ্টেম্বরে সহায়তা পাওয়া মানুষের সংখ্যা চার লাখ থেকে কমিয়ে দুই লাখে নামানো হয়েছে।
খাদ্য সহায়তা কমে যাওয়ায় যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় মানবিক পরিস্থিতির উন্নতি ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে শীতের মধ্যে পর্যাপ্ত খাবার, পুষ্টি ও প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করা না গেলে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা শিশু, নারী ও বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর দুর্ভোগ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।







Disqus comments are not configured yet.