দাঙ্গা-লুটপাটে উত্তাল ফ্রান্স, বিভিন্ন শহরে কারফিউ
ফ্রান্সজুড়ে দাঙ্গা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্যারিসের কয়েকটি এলাকা ও দেশটির বিভিন্ন শহরে রাতের কারফিউ জারি করেছে কর্তৃপক্ষ। সহিংসতা ঠেকাতে স্থানীয় মেয়রদেরও প্রয়োজন অনুযায়ী কারফিউ জারির ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা জারির বিষয়টিও বিবেচনা করছে সরকার। খবর বিবিসির।
প্যারিস পুলিশের বরাত দিয়ে বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজধানীর প্লাস দে লা রিপাবলিক ও লে আল শপিং এলাকায় স্থানীয় সময় রাত ১১টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত কারফিউ কার্যকর থাকবে। শহরের কেন্দ্রীয় কয়েকটি এলাকায় অনুমতি ছাড়া জমায়েতও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ ছাড়া মার্সেই, বোর্দো, নিস, লিওঁ ও লিলসহ বিভিন্ন শহরে তরুণদের চলাচল ও জনসমাবেশের ওপর আংশিক বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
জরুরি বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু জানিয়েছেন, সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর পুনরুদ্ধারে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হবে। তবে ক্ষয়ক্ষতির জন্য দায়ীদের কাছ থেকে সেই অর্থ আদায়ের উদ্যোগ নেওয়া হবে। দাঙ্গার কারণে কাজে যোগ দিতে না পারা ব্যক্তিদের জন্য আংশিক বেকারত্ব সহায়তারও ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ স্বীকার করেছেন, কয়েকটি শহরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল। সহিংসতা মোকাবিলায় প্রস্তুতির ঘাটতি নিয়ে সমালোচনার মুখে তাঁর পদত্যাগের প্রস্তাব প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ প্রত্যাখ্যান করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে দাঙ্গায় জড়িত সম্ভাব্য মূল হোতাদের শনাক্ত করতে প্রায় ২০০ তদন্তকারী সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করছেন।
কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, সহিংসতার ঘটনায় আড়াই হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আহত হয়েছেন প্রায় এক হাজার পুলিশ সদস্য। এ ছাড়া পুলিশের ভিড় নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত গ্রেনেডের বিস্ফোরণে এক বিক্ষোভকারীর হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি।
দাঙ্গার প্রভাব পড়েছে ব্যবসা-বাণিজ্যেও। ফ্রান্সের চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির প্রধান আলাঁ দি ক্রেসেনজোর তথ্য অনুযায়ী, দুই হাজারের বেশি দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ কয়েকশ মিলিয়ন ইউরো। মার্সেইয়ের ব্যবসায়ীরাও নিজেদের ব্যবসার ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
দাঙ্গার সময় লুট হওয়া বিভিন্ন পণ্য অনলাইন বিক্রয় প্ল্যাটফর্মে বিক্রির জন্য তালিকাভুক্ত করার খবর পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে অনলাইন মার্কেটপ্লেস ভিন্টেড জানিয়েছে, চুরি করা পণ্য বিক্রি বা বিক্রির প্রস্তাব তাদের নীতিমালায় কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। এ ধরনের সন্দেহজনক বিজ্ঞাপন শনাক্ত ও সরিয়ে দিতে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, জীবনযাত্রার ব্যয় ও সরকারি সেবার অবনতির প্রতিবাদে গত সপ্তাহান্তে প্রায় পাঁচ লাখ ৫০ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। পরে প্যারিস, মার্সেইসহ বিভিন্ন শহরে গাড়ি ও ভবনে অগ্নিসংযোগ এবং দোকানপাটে লুটপাটের ঘটনা ঘটে। লিমোজ শহরের ঐতিহাসিক টাউন হলও আগুনে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
পরিস্থিতির কারণে ফ্রান্সে অবস্থানরত নিজেদের নাগরিকদের সতর্ক করেছে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও জার্মানি। বড় জমায়েতের আশপাশে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে দেশগুলো।
এদিকে সহিংসতায় বামপন্থী দল লা ফ্রঁস ইনসুমিজের ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক দেখা দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী লেকর্নু অভিযোগ করেছেন, কিছু গোষ্ঠী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন পর্যন্ত দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে চায়। তবে দলটির নেতা জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁ এ অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ দিতে অথবা ক্ষমা চাইতে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
দাঙ্গা ও লুটপাটের ঘটনায় নিরাপত্তা জোরদার, গ্রেপ্তার অভিযান এবং ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর পুনরুদ্ধারে নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে ফরাসি সরকার। তবে সহিংসতা কত দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আসবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।










Disqus comments are not configured yet.