যুদ্ধ ও পরিবহন ব্যয়ে বাড়ছে খাদ্যমূল্য, অনিশ্চয়তায় বিশ্ববাজার
যুদ্ধ, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি ও প্রতিকূল আবহাওয়ার প্রভাবে বিশ্বজুড়ে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ছে। এতে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়ছেন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ। খাদ্যের বাড়তি দাম সামলাতে অনেক পরিবারকে দৈনন্দিন খাদ্যগ্রহণ কমাতে হচ্ছে। পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে চলতি বছরের শেষ ভাগ থেকে ২০২৭ সালজুড়ে বিশ্ব খাদ্য সরবরাহব্যবস্থায় এর বড় প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ইন্দোনেশিয়ার রাজধানী জাকার্তার পার্কিংকর্মী মুহাম্মদ ইয়াসিনের অভিজ্ঞতা এই সংকটেরই প্রতিচ্ছবি। খাবারের বাড়তি দাম সামলাতে তিনি দৈনন্দিন খাদ্যগ্রহণ কমিয়ে দিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, আগে যে খাবার কিনতে ৭ থেকে ৮ হাজার রুপিয়া খরচ হতো, এখন তার জন্য ব্যয় করতে হচ্ছে ১৫ হাজার রুপিয়া। অথচ তাঁর সাপ্তাহিক আয় মাত্র ২ লাখ থেকে ৩ লাখ রুপিয়া। চার সন্তানের জনক ইয়াসিনের মতো সীমিত আয়ের মানুষের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) প্রধান অর্থনীতিবিদ মাক্সিমো তোরেরো বলেন, বিভিন্ন সংকট একসঙ্গে বিশ্ব খাদ্য সরবরাহব্যবস্থার ওপর বড় চাপ তৈরি করেছে। চলতি বছরের শেষ দিকে, আগামী বছরের শুরুতে এবং পুরো ২০২৭ সালজুড়েই এর উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়তে পারে।
বিশ্বব্যাংকের ১৫০টি দেশের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৬ সালের জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে ২২ শতাংশ দেশে খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির হার সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিকে ছাড়িয়ে গেছে। আগের প্রান্তিকে এ হার ছিল ১৪ শতাংশ।
গত সেপ্টেম্বরে বৈশ্বিক খাদ্য মূল্যসূচক গড়ে ১৩৬ পয়েন্টে পৌঁছায়, যা ২০২২ সালের নভেম্বরের পর সর্বোচ্চ। খাদ্যের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি এ পরিস্থিতিতে সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকিও বাড়ছে। সংকট মোকাবিলায় বড় খাদ্য রপ্তানিকারক দেশগুলো রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ আরও কমে যেতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা ও এশিয়ার নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে এ সংকটের প্রভাব বেশি অনুভূত হচ্ছে। এসব অঞ্চলের দরিদ্র পরিবারগুলো চাল, ডাল, রুটি ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য কিনতে হিমশিম খাচ্ছে।
বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। কৃষ্ণসাগর অঞ্চলে শস্য রপ্তানির অবকাঠামোয় হামলার কারণে গম সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। এতে মিশর ও ইন্দোনেশিয়ার মতো বড় আমদানিকারক দেশগুলোকে বিকল্প উৎস খুঁজতে হচ্ছে।
অন্যদিকে, লোহিত সাগরে নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে পণ্যবাহী জাহাজগুলোকে আফ্রিকা ঘুরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে। এতে পরিবহনের সময় ও ব্যয়—দুটিই বাড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে জ্বালানি বাজারেও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে সার পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় কৃষি উৎপাদনের ব্যয় বাড়ছে। পাশাপাশি এল নিনোর প্রভাবে ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে শুষ্ক আবহাওয়া ফসল উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
চলতি বছর বিশ্ববাজারে গমের দাম আগের বছরের তুলনায় ৩০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। এশিয়ার প্রধান রপ্তানিকারক দেশগুলোতে চালের পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও দাম বেড়েছে ১০ থেকে ১৩ শতাংশ। ইরান যুদ্ধের শুরুর দিকে সারের দামও সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছিল। পরে কিছুটা কমলেও এখনো তা তুলনামূলক বেশি রয়েছে।
কৃষ্ণসাগর থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পণ্য পরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি আন্তর্জাতিক নৌপথে ভাড়া প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।
খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বাজারে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মিশরে ভর্তুকিবিহীন বড় আকারের একেকটি রুটির দাম জুলাইয়ের ৪ মিশরীয় পাউন্ড থেকে বেড়ে প্রায় ৫ পাউন্ড হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে রান্নার তেলের দাম বেড়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় পাম তেল উৎপাদক দেশ ইন্দোনেশিয়ায় এ বছর ভোজ্যতেলের দাম বেড়েছে ৭ শতাংশ। ভারতে উৎপাদন কমে যাওয়ায় সেপ্টেম্বরে চিনি, পেঁয়াজ ও ডালের দাম আগের মাসের তুলনায় ১০ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
নেসলে ইন্ডিয়ার চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মনীশ তিওয়ারি বলেছেন, পণ্যের বাড়তি দাম ব্যবসার জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। বিশেষ করে খাদ্য মূল্যস্ফীতি এখন বড় বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মিশরের রাজধানী কায়রোর একটি বেকারির মালিক সাঈদ আবদেল হামিদ মোহাম্মদ জানান, শুধু ময়দার দামই নয়, দক্ষ শ্রমিক নিয়োগের ব্যয়ও বেড়েছে। বিদ্যুৎ, পানি, ইস্টসহ রুটি তৈরির প্রায় সব উপকরণের দাম বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসা পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে।
২০২৫ সালের শেষ দিক থেকেই বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ছিল। এখন স্থানীয় বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়া এবং উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাব ভোক্তাদের ওপর পড়তে শুরু করায় মূল্যস্ফীতি আরও বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার কয়েকটি বড় খাদ্য আমদানিকারক দেশ সাম্প্রতিক সময়ে স্থানীয় উৎপাদন ভালো হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজার থেকে কেনাকাটা কমিয়েছিল। কিন্তু স্থানীয় সরবরাহ কমে গেলে তাদের আবার বিশ্ববাজারে ফিরতে হবে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যশস্যের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে।
লন্ডনভিত্তিক আন্তর্জাতিক শস্য কাউন্সিলের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ আলেক্সান্ডার কারাভাইতসেভ বলেন, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে আমদানিকারক দেশগুলো বাজারে ফিরলে চাহিদার ওপর নতুন করে চাপ তৈরি হতে পারে।
এফএওর প্রধান অর্থনীতিবিদ তোরেরো বলেন, বিশ্বজুড়ে শস্যের রেকর্ড মজুত এত দিন বাজারকে কিছুটা সুরক্ষা দিয়েছে। তবে সেই সুরক্ষা ক্রমেই কমে আসছে।
খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত তিন থেকে ছয় মাসের চুক্তিতে কাঁচামাল কেনে। কিন্তু এখন চুক্তি নবায়নের সময় তাদের বেশি দাম দিতে হচ্ছে। স্থানীয় মুদ্রার অবমূল্যায়নের কারণে আমদানি ব্যয়ও বাড়ছে।
ইন্দোনেশিয়ার বৃহৎ খাদ্য কোম্পানি পিটি ইন্দোফুডের পরিচালক ফ্রান্সিসকুস ওয়েলিরাং জানান, পণ্য পরিবহনের খরচ বেড়েছে। পাশাপাশি রুপিয়ার মান কমে যাওয়ায় স্থানীয় মুদ্রায় এই ব্যয়ের চাপ আরও বেশি অনুভূত হচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের মতে, বেশি দাম দিয়েও প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে গমের চালান কমে যাওয়ায় ইন্দোনেশিয়ার কয়েকটি গমকল তাদের পূর্ণ উৎপাদনক্ষমতা ব্যবহার করতে পারছে না।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, ইন্দোনেশিয়ায় চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে গম আমদানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪১ শতাংশ কমে ৪ লাখ ৯১ হাজার টনে দাঁড়িয়েছে।
তবে আপাতত সয়াবিন ও ভুট্টার পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। ভবিষ্যতে এ দুই শস্যের সরবরাহ অনেকটাই নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ আমেরিকার উৎপাদন পরিস্থিতির ওপর।
সব মিলিয়ে, যুদ্ধ, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং জলবায়ুগত প্রতিকূলতা বিশ্ব খাদ্যবাজারে অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে। সংকট দীর্ঘায়িত হলে খাদ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ, সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং নিম্ন আয়ের মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা দেশগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।










Disqus comments are not configured yet.