নিকলীতে ডিজেল সংকট: সেচ ব্যাহত হওয়ায় দিশেহারা হাওরের কৃষক, লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে শঙ্কা
কিশোরগঞ্জের নিকলীর হাওরাঞ্চলে ডিজেলের তীব্র সংকটে বোরো আবাদে সেচ কার্যক্রম চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। কৃষি জমিতে পানি দিতে না পেরে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন স্থানীয় কৃষকরা। স্থানীয় বাজারে চড়া দাম দিয়েও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত ডিজেল। ভরা মৌসুমে সময়মতো সেচ দিতে না পারলে উপজেলায় চলতি বছর বোরো ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
কিশোরগঞ্জ একটি হাওরবেষ্টিত জেলা, যেখানে প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। এখানকার হাওরাঞ্চলে বছরে মাত্র একটি ফসল—বোরো ধান উৎপাদিত হয়। নিকলীর বিশাল হাওরে এই ফসল ফলাতে প্রচুর সেচ দিতে হয়।
সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের উত্তেজনাকর পরিস্থিতির প্রভাবে জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। কৃষকদের অভিযোগ, বিশ্ব পরিস্থিতির দোহাই দিয়ে স্থানীয়ভাবে জ্বালানি তেলের কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়েছে। এই সংকটের প্রভাব পরিবহন খাতের চেয়েও বেশি পড়েছে হাওরের কৃষি সেচে। নিকলী উপজেলার বাজারগুলো থেকে হঠাৎ করেই ডিজেল ‘উধাও’ হয়ে গেছে।
উপজেলার নানশ্রী বাজারে একমাত্র ফিলিং স্টেশনটি (পেট্রোল পাম্প) মালিকপক্ষ বন্ধ রেখেছে। এছাড়া বিভিন্ন বাজারে প্রায় শতাধিক খুচরা বিক্রেতা রয়েছেন, যারা জেলা শহরের সাব-ডিলারদের কাছ থেকে তেল সংগ্রহ করে বিক্রি করতেন। সাব-ডিলাররা হঠাৎ সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ায় খুচরা বিক্রেতারা কৃষকদের চাহিদা মেটাতে পারছেন না।
নিকলী পুরাতন বাজারের খুচরা তেল বিক্রেতা আব্দুর রশিদ জানান, বর্তমানে বৃষ্টি না থাকায় ডিজেলের চাহিদা তুঙ্গে। কিন্তু সাব-ডিলাররা সীমিত তেল সরবরাহ করায় তিনি কৃষকদের চাহিদা মেটাতে পারছেন না। ফলে অনেক সময় দোকান বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন। দামপাড়া বাজারের আল-আমিন ও কারপাশা বাজারের রফিকুল ইসলামসহ একাধিক বিক্রেতা একই অভিযোগ করেন। তারা জানান, অতিরিক্ত মূল্য দিয়েও সাব-ডিলারদের কাছ থেকে চাহিদামতো তেল মিলছে না।
উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্যমতে, নিকলীতে এ বছর ১৪ হাজার ৩৬০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬৬ হাজার মেট্রিক টন। হাওরের বিস্তৃত জমিতে মোট ১,৭০২টি সেচ যন্ত্র রয়েছে। এর মধ্যে ১,৫২৫টি সেচ যন্ত্র চলে ডিজেলচালিত ইঞ্জিনে, যার সুবিধাভোগী ১৬ হাজার কৃষক। বাকি ১৭৭টি বিদ্যুৎচালিত সেচ প্রকল্প। এছাড়া পার্শ্ববর্তী অষ্টগ্রাম উপজেলার বিভিন্ন হাওরেও নিকলীর কৃষকদের হাজার হাজার হেক্টর জমি রয়েছে, যার সেচ সরঞ্জামগুলোও মূলত নিকলী থেকেই জ্বালানি সংগ্রহ করে।
বর্তমানে বোরো ধানের থোড় আসার গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ সময় ধানের শীষ পুষ্ট হতে প্রচুর পানির প্রয়োজন হয়। ডিজেল সংকটে সেচ ব্যাহত হলে ধান গাছে ব্লাস্টসহ বিভিন্ন রোগ ও ধানে চিটা দেখা দেওয়ার প্রবল ঝুঁকি রয়েছে।
কারপাশা ইউনিয়নের গৌরীপুর গ্রামের কৃষক শাহজাহান এবং নিকলী সদরের আব্দুল কাদির জানান, একশ টাকার ডিজেল দেড়শ টাকা দিয়েও পাওয়া যাচ্ছে না। জমিতে পানি দিতে না পারায় ফসল নষ্ট হওয়ার ভয়ে আছেন তারা। এতে আবাদের খরচ যেমন বাড়ছে, তেমনি উৎপাদন নিয়ে বাড়ছে শঙ্কা।
নিকলী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আব্দুস সালাম জানান, “বোরো মৌসুমের এই সময়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। এখন সেচ দিতে না পারলে ধানে চিটা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, যা উৎপাদন কমিয়ে দিতে পারে। ডিজেল সংকটের কারণে কৃষি উৎপাদন ব্যয় নিঃসন্দেহে অনেক বেড়ে গেছে।”








Warning: Array to string conversion in /home/dkishoreganj/public_html/wp-content/plugins/gs-facebook-comments/public/class-wpfc-public.php on line 311
Array