বেকার যুবকদের দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করে দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির লক্ষ্যে বিপুল অর্থ ব্যয়ে সারা দেশে গড়ে তোলা হয়েছে শতাধিক কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্র (টিটিসি)। তবে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষক, যন্ত্রপাতি ও জনবলের অভাবে এসব প্রতিষ্ঠানের বড় অংশের কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও প্রশিক্ষক নেই, কোথাও আধুনিক যন্ত্রপাতির সংকট, আবার কোথাও ভবন নির্মাণের পরও বছরের পর বছর প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু হয়নি।
কোনো কোনো কেন্দ্রে অস্থায়ী প্রশিক্ষক দিয়ে কোর্স চালানো হচ্ছে। মাঝপথে তাঁরা চলে গেলে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে প্রশিক্ষণ। আবার এক ট্রেডের প্রশিক্ষককে মাত্র কয়েক দিনের প্রশিক্ষণ দিয়ে অন্য ট্রেডের প্রধান প্রশিক্ষকের দায়িত্ব দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে।
এ পরিস্থিতিতে বিপুল অর্থ ব্যয়ে পরিচালিত এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোতে দক্ষতা অর্জনের বদলে প্রশিক্ষণার্থীরা শুধু সনদ পাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বিদ্যমান কেন্দ্রগুলোর এমন দুরবস্থার মধ্যেই ৩ হাজার ৭৫১ কোটি টাকা ব্যয়ে বিভিন্ন উপজেলায় আরও ৫০টি টিটিসি নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে জমি অধিগ্রহণ ও দরপত্রের প্রক্রিয়াও চলছে। বিদ্যমান কেন্দ্রগুলো কার্যকর না করে নতুন ভবন নির্মাণে বিপুল অর্থ ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) সূত্রে জানা গেছে, দেশে ১০৪টি টিটিসি ও ছয়টি ইনস্টিটিউট অব মেরিন টেকনোলজি (আইএমটি) রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় জনবল প্রায় ৪ হাজার ৬০০। তবে অধিকাংশ কেন্দ্র চলছে অর্ধেকেরও কম জনবল নিয়ে। কাগজে-কলমে ৫৫টি ট্রেডে প্রশিক্ষণের সুযোগ থাকলেও অনেক ট্রেড দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। মালয়েশিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে দক্ষ কাঠমিস্ত্রির চাহিদা থাকলেও বন্ধ হয়ে গেছে কার্পেন্ট্রি ট্রেড। আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গেও অনেক ট্রেডের সামঞ্জস্য নেই।
প্রশিক্ষণার্থীদের ব্যবহারিক শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে পুরোনো যন্ত্রপাতি দিয়ে, যার অনেকগুলোই আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের আধুনিক কর্মপরিবেশের উপযোগী নয়। বিভিন্ন এলাকার টিটিসি ঘুরে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
২০২১ সালে চালু হওয়া সুনামগঞ্জ টিটিসিতে ১০টি ট্রেড চালু থাকলেও এখন পর্যন্ত নিজস্ব জনবল নেই একজনও। প্রতিষ্ঠানপ্রধানসহ অন্য কেন্দ্র থেকে ১০ জনকে প্রেষণে এনে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। অস্থায়ী প্রশিক্ষক চলে যাওয়ায় বন্ধ হয়ে গেছে জাপানি ভাষা কোর্স। অথচ এ কোর্স সম্পন্ন করে অন্তত ১২ জন জাপানে গিয়ে ভালো বেতনে চাকরি করছেন।
নোয়াখালী টিটিসিতে ১৫টি কোর্স পরিচালনার জন্য ৪৫ জন প্রশিক্ষক প্রয়োজন হলেও রয়েছেন মাত্র আটজন। রেফ্রিজারেশন অ্যান্ড এয়ার কন্ডিশনিং কোর্সে দুই বছর ধরে কোনো প্রশিক্ষক নেই। পর্যাপ্ত ল্যাব ও যন্ত্রপাতি থাকলেও দক্ষ প্রশিক্ষকের অভাবে সেগুলো কাজে লাগানো যাচ্ছে না। এমনকি যন্ত্রের ত্রুটির কারণে দুই মাস ধরে নিয়মিত বায়োমেট্রিক হাজিরাও নেওয়া যাচ্ছে না।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ টিটিসিতে অটোমেকানিকের সাতটি ট্রেডে ৩৫ জন প্রশিক্ষকের প্রয়োজন হলেও রয়েছেন ১২ জন। ফুড অ্যান্ড বেভারেজ প্রোডাকশন লেভেল-১ ট্রেডে দুই বছর ধরে কোনো প্রশিক্ষক নেই। পুরোনো যন্ত্রপাতিতে ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ নেওয়ায় কর্মক্ষেত্রে আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহারে সমস্যায় পড়ছেন প্রশিক্ষণার্থীরা।
বরিশাল টিটিসিতে ৪৪টি প্রশিক্ষক পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ২৬ জন। এক ট্রেডের প্রশিক্ষক দিয়ে অন্য ট্রেডের প্রশিক্ষণ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। গার্মেন্টস ট্রেডের প্রশিক্ষক লায়লা আফরোজ ফুড অ্যান্ড বেভারেজ বিষয়ে তিন দিনের একটি বুনিয়াদি কোর্স করে ওই ট্রেডের প্রধান প্রশিক্ষকের দায়িত্ব পেয়েছেন। অন্য প্রশিক্ষকদেরও একাধিক ভিন্ন ট্রেডের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, কোনো কোনো প্রশিক্ষক নিয়মিত ক্লাস নেন না। এমনকি সাবেক প্রশিক্ষণার্থীদের দিয়েও ক্লাস পরিচালনা করা হয়। প্রশিক্ষকদের ব্যক্তিগত কাজ প্রশিক্ষণার্থীদের দিয়ে করানোর অভিযোগও রয়েছে।
রাজশাহী টিটিসিতে বিনা মূল্যে ফরম দেওয়ার কথা থাকলেও শর্ট কোর্সে ৬০ টাকা করে নেওয়ার অভিযোগ করেছেন শিক্ষার্থীরা। কোরিয়ান ভাষা কোর্সের নির্ধারিত ফি দেওয়ার পরও অন্য কোর্সে বাধ্যতামূলক ভর্তি করে অতিরিক্ত ৩ হাজার ৫০০ টাকা নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিএমইটির অনুমোদন ছাড়াই সরকারি অবকাঠামো ব্যবহার করে বাণিজ্যিকভাবে কোর্স পরিচালনা এবং প্রশিক্ষণের গাড়ি ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে।
রংপুর টিটিসিতে অনুমোদিত ২১টি ইন্সট্রাক্টর পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ১১ জন। প্রশিক্ষকদের অভিযোগ, প্রশিক্ষণার্থীদের উপস্থিতির ভিত্তিতে সরকার ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা ভাতা দেয়। এ ভাতার জন্য অনেকে কোর্সে ভর্তি হলেও প্রশিক্ষণকে কাজে লাগান না। রংপুর টিটিসির হিসাব অনুযায়ী, প্রশিক্ষণ নেওয়া ব্যক্তিদের ২৫ থেকে ৩০ শতাংশই তা কাজে লাগাতে পারছেন না। অন্যদিকে তারাগঞ্জে প্রায় ৩৫ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত নারী উন্নয়ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি পাঁচ বছরেও চালু হয়নি। বর্তমানে সেটি পরিত্যক্ত ভবনে পরিণত হয়েছে।
নওগাঁ টিটিসিতে ছয়টি অনুমোদিত কোর্সের জন্য ১০ জন ইন্সট্রাক্টর প্রয়োজন হলেও রয়েছেন সাতজন। তিনটি চিফ ইন্সট্রাক্টর পদ ২০১৬ সাল থেকে শূন্য রয়েছে। পাবনা টিটিসিতে ৭৮টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ৫৭ জন। ছয়টি প্রধান ট্রেডে ৩০ জন প্রশিক্ষকের প্রয়োজন হলেও রয়েছেন ১৭ জন। কেন্দ্রটিতে আধুনিক ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের যন্ত্রপাতিও নেই।
টিটিসিগুলোর এ দুরবস্থার সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থানে। রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) তথ্যমতে, বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের মাত্র ২০ থেকে ২২ শতাংশ দক্ষ। বাকি ৭০ থেকে ৭৪ শতাংশ আধা-দক্ষ বা অদক্ষ। দক্ষতার ঘাটতির কারণে বিদেশে বাংলাদেশি কর্মীরা কম মজুরি পাচ্ছেন। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতার সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, সারা দেশে বিপুল অর্থ ব্যয়ে নতুন নতুন ভবন নির্মাণের পরিবর্তে বিভাগীয় ও বড় জেলা শহরগুলোতে ২০ থেকে ২৫টি বিশ্বমানের কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্র গড়ে তুললে প্রশিক্ষণের মান নিশ্চিত করা সহজ হতো।
এ বিষয়ে বিএমইটির পরিচালক (প্রশিক্ষণ পরিচালনা) শরিফা সুলতানা বলেন, প্রশিক্ষণকেন্দ্রগুলোতে প্রয়োজনীয় জনবল প্রায় ৪ হাজার ৬০০। অর্ধেকেরও কম জনবল দিয়ে জোড়াতালি দিয়ে কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে। অস্থায়ী প্রশিক্ষক দিয়ে কোর্স পরিচালনা করতে হয়। ভালো সুযোগ পেলে তাঁরা অন্যত্র চলে যান। জাপানি ভাষা কোর্সের অনেক প্রশিক্ষক জাপানে চলে গেছেন। এ কারণে হাইব্রিড পদ্ধতিতে একজন প্রশিক্ষক একসঙ্গে একাধিক কেন্দ্রে অনলাইনে ক্লাস নিচ্ছেন।
Disqus comments are not configured yet.