কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার আগানগর ইউনিয়নের শ্যামপুর গ্রামে অগ্নিকাণ্ডে জেলে মোক্তার উদ্দিনের (৫০) বসতঘরসহ পাঁচটি ঘর পুড়ে গেছে। এ সময় তাঁর ঘরের চালের ড্রামে রাখা প্রায় ২২ লাখ টাকা পুড়ে নষ্ট হয়েছে বলে দাবি করেছেন তিনি। আগুনে নগদ টাকার পাশাপাশি ঘরের আসবাবপত্রও পুড়ে যায়। পরে প্রায় ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা আংশিক পোড়া অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে বলে পরিবার সূত্রে জানা গেছে।
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) সকাল সাড়ে ৯টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত শ্যামপুর মধ্যপাড়া এলাকায় এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। স্থানীয়দের চেষ্টায় প্রায় দুই ঘণ্টা পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে।
মোক্তার উদ্দিন শ্যামপুর গ্রামের বাসিন্দা। ছোটবেলা থেকেই বাড়ির পাশের মেঘনা নদী থেকে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করছেন তিনি। প্রতিদিন মাছ বিক্রি করে প্রায় ২ থেকে ৩ হাজার টাকা আয় করতেন। দীর্ঘদিনের সঞ্চয়, বড় ছেলের পাঠানো টাকা এবং ঋণের অর্থ মিলিয়ে তাঁর কাছে প্রায় ২২ লাখ টাকা জমা হয়েছিল বলে জানান তিনি।
মোক্তার উদ্দিনের দুই ছেলে ও এক মেয়ে। বড় ছেলে খাইরুলকে প্রায় আট বছর আগে সৌদি আরবে পাঠান তিনি। খাইরুল নিয়মিত বাড়িতে টাকা পাঠান বলে পরিবার সূত্রে জানা গেছে।
ছোট ছেলে সাইফুল ইসলামের (২২) বিদেশে যাওয়ার খরচ জোগাতে গত পাঁচ-ছয় বছর ধরে টাকা সঞ্চয় করছিলেন মোক্তার উদ্দিন। আগামী মাসে সাইফুলকে মালয়েশিয়া পাঠানোর জন্য টাকা জমা দেওয়ার কথা ছিল।
এর মধ্যে চলতি মাসে পাশের গ্রামের একটি এনজিও থেকে কিস্তির মাধ্যমে আরও ৪ লাখ টাকা ঋণ নেন তিনি। সব মিলিয়ে তাঁর কাছে প্রায় ২২ লাখ টাকা জমা হয়। ব্যাংক হিসাব না থাকায় টাকাগুলো তিনি বাড়ির একটি চালের ড্রামে সংরক্ষণ করে রেখেছিলেন।
স্থানীয়রা জানান, মঙ্গলবার সকালে শ্যামপুর মধ্যপাড়ার রিয়াজ মিয়ার ঘরে প্রথমে আগুনের সূত্রপাত হয়। মুহূর্তের মধ্যে আগুন পাশের ঘরগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। এতে পাশাপাশি থাকা মোট পাঁচটি বসতঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
স্থানীয় বাসিন্দারা প্রায় দুই ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। তবে শ্যামপুর গ্রামটি উপজেলা সদর থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ায় সেখানে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি পৌঁছানোর সুযোগ নেই বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
আগুনে মোক্তার উদ্দিনের ঘরের আসবাবপত্রসহ বিভিন্ন মালামাল পুড়ে যায়। একই সঙ্গে চালের ড্রামে রাখা নগদ টাকাও আগুনে পুড়ে যায়। পরে পোড়া ধ্বংসাবশেষ থেকে প্রায় ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা আংশিক পোড়া অবস্থায় পাওয়া যায় বলে জানান মোক্তার উদ্দিন।
মোক্তার উদ্দিন বলেন, ‘আমি অনেক কষ্ট করে হাজার হাজার টাকা জমিয়ে লক্ষ টাকার বান্ডিল বানিয়ে চালের ড্রামে রাখতাম। ভোরে নদীতে গিয়ে রাতে বাড়ি ফিরতাম। আবার কোনো কোনো দিন সন্ধ্যায় নদীতে গিয়ে সকালে বাড়ি ফিরতাম। এভাবে প্রতিদিন দুই-তিন হাজার টাকার মাছ বিক্রি করে আয় হতো। কষ্টের এই টাকা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় আমি দিশেহারা। এখন কীভাবে আমার ছেলেকে মালয়েশিয়ায় পাঠাব, বুঝতে পারছি না।’
স্থানীয় বাসিন্দা ফজলু রহমান বলেন, ‘মোক্তার উদ্দিন সহজ-সরল মানুষ। মাছ ধরা ছাড়া অন্য কোনো কাজে তাঁর তেমন মনোযোগ নেই। কয়েক মাসে একবারও উপজেলা সদরে যাওয়া হয় না তাঁর। ব্যাংকে টাকা রাখতে ঝামেলা মনে করায় তাঁর কোনো ব্যাংক হিসাবও নেই।’
আগানগর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘শ্যামপুর গ্রামে আমার বোনের শ্বশুরবাড়ি। অগ্নিকাণ্ডে তাঁদের বসতঘর পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। আমার বোন খাইরুন্নেসার ঘরে স্বর্ণালংকার ছিল। আগুনের পর সেগুলো বের করতে গেলে সে আহত হয়।’
স্থানীয়দের ভাষ্য, গ্রামের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে অগ্নিকাণ্ডের সময় দ্রুত ফায়ার সার্ভিসের সহায়তা পাওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে আগুন দ্রুত এক ঘর থেকে পাশের ঘরে ছড়িয়ে পড়ে এবং ক্ষয়ক্ষতি বাড়ে।
ভৈরব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এ কে এম মামুনুর রশীদ বলেন, ‘অগ্নিকাণ্ডে ক্ষয়ক্ষতির কথা শুনেছি। খোঁজ নিয়ে জেনেছি, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো মোটামুটি অস্বচ্ছল। আগামীকাল বৃহস্পতিবার ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর কাছে শুকনো খাবার পৌঁছে দেওয়ার কথা রয়েছে।’
মোক্তার উদ্দিনের আংশিক পোড়া টাকা প্রসঙ্গে ইউএনও বলেন, ‘প্রায় ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা আংশিক পুড়ে যাওয়ার বিষয়টি যাচাই-বাছাই করে দেখা হবে। প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ব্যাংকের মাধ্যমে এসব টাকা পরিবর্তন করে দেওয়ার ব্যবস্থা করা যায় কি না, সে বিষয়ে চেষ্টা করা হবে।’
অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো দ্রুত সরকারি সহায়তা এবং পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছে।
Warning: Array to string conversion in /home/dkishoreganj/public_html/wp-content/plugins/gs-facebook-comments/public/class-wpfc-public.php on line 311
Array