দেশের শিল্পায়ন, আবাসন, শিক্ষা ও চিকিৎসা খাতের অন্যতম পথিকৃৎ এবং ইসলাম গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান আলহাজ জহুরুল ইসলামের ৩১তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ ১৯ অক্টোবর। ১৯৯৫ সালের এই দিনে সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন তিনি। শিল্পোদ্যোগ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষার প্রসার এবং জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে তিনি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রযাত্রায় যে অবদান রেখে গেছেন, তা আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়।
দৃঢ় আত্মপ্রত্যয়, সরলতা, দয়াশীলতা, কর্মনিষ্ঠা, ধর্মপরায়ণতা ও আত্মপ্রচারবিমুখতা ছিল তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। সীমিত সুযোগের একটি সরকারি চাকরি দিয়ে কর্মজীবন শুরু করলেও নিজের সামর্থ্য, শ্রম ও দূরদর্শিতার ওপর আস্থা রেখে তিনি ব্যবসা-বাণিজ্যে আত্মনিয়োগ করেন। পরবর্তী সময়ে তাঁর উদ্যোগে গড়ে ওঠে নানা শিল্প ও বাণিজ্যপ্রতিষ্ঠান। দেশের ব্যবসায়িক অঙ্গনে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন স্বতন্ত্র অবস্থান। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগ সম্প্রসারণেও রেখে যান উল্লেখযোগ্য অবদান।
আলহাজ জহুরুল ইসলাম ১৯২৮ সালের ১ আগস্ট কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর উপজেলার ভাগলপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা আলহাজ আফতাব উদ্দিন আহমদ এবং মাতা বেগম রহিমা। কলকাতার রিপন স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করার পর তিনি কিছুদিন কলেজে পড়াশোনা করেন। ১৯৪৮ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ত বিভাগে স্বল্প বেতনে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। তবে বৃহত্তর কর্মক্ষেত্রে কাজ করার আকাঙ্ক্ষা তাঁকে ব্যবসার দিকে নিয়ে যায়। চাকরি ছেড়ে তিনি নিজ উদ্যোগে ব্যবসা শুরু করেন।
১৯৫১ সালে তাঁর হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত হয় ইসলাম গ্রুপের প্রথম প্রতিষ্ঠান বেঙ্গল ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন। এই উদ্যোগের মধ্য দিয়েই শুরু হয় তাঁর শিল্পোদ্যোগের দীর্ঘ যাত্রা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নির্মাণ, প্রকৌশল, ভূমি ও গৃহায়ন ব্যবস্থাপনা, পাট ও পাটজাত পণ্য, গাড়ি সংযোজন, ওষুধ, ব্যাংকিং, পোল্ট্রি, ডেইরি ও মৎস্য খাতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর উদ্যোগের বিস্তার ঘটে। তাঁর নেতৃত্বে ইসলাম গ্রুপের অধীনে গড়ে ওঠে বহু শিল্পকারখানা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান।
সীমিত সুযোগের চাকরি ছেড়ে নিজের উদ্যোগে কর্মক্ষেত্র তৈরি করার সিদ্ধান্ত তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হয়। পরিশ্রম, অধ্যবসায়, ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতা এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সুদূরপ্রসারী চিন্তা তাঁকে ব্যবসায়িক সাফল্যের পথে এগিয়ে নেয়। তাঁর উদ্যোগে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানগুলো দেশের শিল্প ও বাণিজ্য খাতের বিকাশে ভূমিকা রাখে।
১৯৭৫ সালে জহুরুল ইসলাম মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন ঠিকাদারি প্রকল্পের কাজ শুরু করেন। এসব প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশের শ্রমিকদের বিদেশে কাজের সুযোগ সম্প্রসারিত হয় এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশি কর্মীদের অংশগ্রহণ বাড়ে। দেশে শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পাশাপাশি বিদেশেও ব্যবসায়িক কার্যক্রম সম্প্রসারণের মধ্য দিয়ে তিনি নিজের উদ্যোগকে আরও বিস্তৃত করেন।
ব্যবসা ও শিল্পের বিভিন্ন খাতে তাঁর উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য ছিল কর্মসংস্থান সৃষ্টি। নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং বিদ্যমান কার্যক্রম সম্প্রসারণের মাধ্যমে বহু মানুষের কাজের সুযোগ তৈরি হয়। তাঁর পোল্ট্রি খামার সম্প্রসারণ প্রকল্পের আওতায় কয়েক শ পোল্ট্রি খামার গড়ে ওঠে বলে জানা যায়। এসব খামারের মাধ্যমে বহু তরুণ-তরুণী ও তাঁদের পরিবারের স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়।
তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বেসরকারি ব্যাংকিং খাতের বিকাশেও তাঁর ভূমিকার কথা উল্লেখ করা হয়। তিনি ইস্টার্ন ব্যাংকিং করপোরেশন প্রতিষ্ঠা করেন। পাশাপাশি বাংলাদেশের বেসরকারি আর্থিক খাতের অন্যতম প্রতিষ্ঠান আইএফআইসি ব্যাংকের প্রতিষ্ঠার সঙ্গেও তাঁর নাম জড়িত। শিল্প ও আর্থিক খাতে উদ্যোগ গ্রহণের মধ্য দিয়ে তিনি দেশের বেসরকারি খাতের বিকাশে অবদান রাখেন।
শিল্প ও ব্যবসার পাশাপাশি শিক্ষা বিস্তারকে জহুরুল ইসলাম সামাজিক উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে দেখতেন। বিশেষ করে নিজ জন্মস্থান বাজিতপুরের শিক্ষাব্যবস্থা উন্নয়নে তাঁর আগ্রহ ছিল গভীর। ঢাকা ও বাজিতপুরে তাঁর প্রতিষ্ঠিত বা সহায়তাপ্রাপ্ত বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ, এতিমখানা ও মাদ্রাসা তাঁর জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের পরিচয় বহন করে।
তাঁর উদ্যোগ ও সহায়তায় গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে ঢাকার পুরানা পল্টনের বেগম রহিমা আদর্শ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় ও পুরানা পল্টন মসজিদ, পল্লবীর মাজেদুল ইসলাম মডেল হাইস্কুল, পল্লবী এতিমখানা ও মাদ্রাসা। বাজিতপুরে রয়েছে আফতাব উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়, বেগম রহিমা উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়, হাফেজ আবদুর রাজ্জাক উচ্চ বিদ্যালয়, রাজ্জাকুন্নেসা উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়, নাজিরুল ইসলাম কলেজিয়েট স্কুল, সরারচর শিবনাথ উচ্চ বিদ্যালয় এবং বাজিতপুর ডিগ্রি কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
বাজিতপুরকে ‘এডুকেশন সিটি’ ও ‘হেলথ সিটি’ হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নের পথ খুঁজতে জীবনের শেষ কয়েক বছরে তিনি ঘন ঘন বাজিতপুরে যাতায়াত করেন। এ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষাবিদ এবং স্থানীয় সুধীজনদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। তাঁর পরিকল্পনা ও উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় ১৯৯১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘জহুরুল ইসলাম এডুকেশন কমপ্লেক্স’।
নিজ এলাকার শিক্ষার সুযোগ বাড়ানো, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং নতুন প্রজন্মের জন্য উন্নত পরিবেশ নিশ্চিত করার মাধ্যমে তিনি শিক্ষা বিস্তারকে সামাজিক দায়িত্বের অংশ হিসেবে দেখেছিলেন। তাঁর এসব উদ্যোগের লক্ষ্য ছিল স্থানীয় মানুষের জন্য নিজ এলাকায় থেকেই শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ সম্প্রসারণ করা।
জহুরুল ইসলামের অন্যতম উল্লেখযোগ্য অবদান কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর উপজেলার ভাগলপুরে জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল এবং জহুরুল ইসলাম নার্সেস ট্রেনিং ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা। প্রত্যন্ত অঞ্চলে চিকিৎসাশিক্ষা ও আধুনিক চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণের লক্ষ্য নিয়ে তিনি এসব প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন।
জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল কিশোরগঞ্জসহ হাওরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার মানুষের চিকিৎসাসেবা গ্রহণের সুযোগ সম্প্রসারণে ভূমিকা রেখেছে। চিকিৎসাশিক্ষার জন্যও প্রতিষ্ঠানটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে শিক্ষার্থীরা এখানে পড়াশোনা করতে আসেন; বিদেশি শিক্ষার্থীদেরও এখানে অধ্যয়নের সুযোগ রয়েছে বলে জানা যায়।
শিক্ষা ও চিকিৎসাকে একই উদ্যোগের আওতায় এনে তিনি নিজ এলাকার মানুষের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সুযোগ তৈরির চেষ্টা করেন। ভাগলপুরের মতো প্রত্যন্ত এলাকায় চিকিৎসাশিক্ষার প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতাল গড়ে তোলার উদ্যোগ তাঁর দূরদর্শিতা এবং জনকল্যাণমূলক চিন্তার পরিচয় বহন করে। একদিকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণের সুযোগ, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবা—দুই ক্ষেত্রেই এসব প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব রয়েছে।
তাঁর স্বপ্ন ছিল, বাজিতপুর শুধু নিজস্ব ঐতিহ্যে পরিচিত থাকবে না; শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠবে। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠানগুলো তাঁর কর্মজীবনের অন্যতম স্থায়ী উত্তরাধিকার।
জহুরুল ইসলামের জীবনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল দানশীলতা। এতিম, অসহায় বৃদ্ধ, দরিদ্র শিক্ষার্থী এবং কন্যাদায়গ্রস্ত পিতাদের তিনি সহায়তা করতেন। বিভিন্ন মসজিদে অর্থসাহায্য দেওয়ার পাশাপাশি বহু আলেমকে নিজের খরচে হজ করানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন বলে তাঁর জীবন ও কর্মসম্পর্কিত বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।
তাঁর দানশীলতার বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল আত্মপ্রচারবিমুখতা। অনেক ক্ষেত্রেই তিনি গোপনে সাহায্য করতেন। মানুষের দুর্দশা লাঘব করা, দরিদ্র পরিবারের পাশে দাঁড়ানো এবং অসহায় ব্যক্তিদের প্রয়োজন পূরণে সহযোগিতা করাকে তিনি মানবিক দায়িত্বের অংশ হিসেবে দেখতেন।
মুক্তিযুদ্ধের সময়ও তাঁর অবদানের কথা বিভিন্ন লেখায় উঠে এসেছে। ১৯৭১ সালে লন্ডনস্থ বাংলাদেশ মিশনে ‘সুবেদ আলী’ ছদ্মনামে নিয়মিত অর্থসাহায্য দিয়ে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অবদান রেখেছিলেন বলে সাবেক কূটনীতিক মহিউদ্দিন আহমদের বিভিন্ন লেখায় উল্লেখ রয়েছে। এ ঘটনা তাঁর দেশপ্রেম ও আত্মগোপনে থেকে সহায়তা করার মানসিকতার একটি দিক তুলে ধরে।
শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষের পাশে দাঁড়ানো ছিল তাঁর জীবনদর্শনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাঁর কাছে সাফল্য কেবল ব্যবসায়িক অর্জনে সীমাবদ্ধ ছিল না; মানুষের জীবনমান উন্নয়নে অবদান রাখাকেও তিনি গুরুত্ব দিতেন।
কঠোর পরিশ্রম, অধ্যবসায়, একাগ্রতা এবং ভবিষ্যৎমুখী চিন্তার মাধ্যমে জহুরুল ইসলাম নিজের কর্মজীবনে সাফল্য অর্জন করেন। শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, ব্যবসার নতুন ক্ষেত্র তৈরি, মানুষের কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার প্রসার এবং জনকল্যাণমূলক উদ্যোগের মাধ্যমে তিনি দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রযাত্রায় অবদান রাখেন।
১৯৯৫ সালের ১৯ অক্টোবর সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, চার কন্যা, একমাত্র পুত্র মঞ্জুরুল ইসলামসহ বহু আত্মীয়স্বজন, সহকর্মী ও গুণগ্রাহী রেখে যান। পরে নিজ গ্রাম ভাগলপুরে তাঁর প্রতিষ্ঠিত জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল ক্যাম্পাসে তাঁকে সমাহিত করা হয়।
তাঁর জীবনের প্রতিটি অধ্যায় মূল্যায়ন করা সহজ নয়। তবে শিল্প ও বাণিজ্যে উদ্যোগ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষা বিস্তার, চিকিৎসাসেবার সুযোগ সম্প্রসারণ এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়ে তিনি যে উত্তরাধিকার রেখে গেছেন, তা তাঁকে স্মরণীয় করে রেখেছে। তাঁর প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলো এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় তাঁর উদ্যোগ আজও তাঁর কর্মময় জীবনের স্মারক হিসেবে বিবেচিত।
আলহাজ জহুরুল ইসলামের ৩১তম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর কর্ম, অবদান ও স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানানো হচ্ছে। তাঁর জীবন নতুন প্রজন্মের উদ্যোক্তা, পেশাজীবী এবং সমাজকল্যাণে আগ্রহী মানুষের জন্য প্রেরণার উৎস হয়ে থাকুক। তাঁর প্রতিষ্ঠিত মূল্যবোধ, কর্মনিষ্ঠা ও জনকল্যাণের চেতনাকে ধারণ করে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকুক—এটাই প্রত্যাশা।
Disqus comments are not configured yet.