এডিপি থেকে বাদ ১৮৫ নতুন প্রকল্প, একীভূত হচ্ছে আরও ৩২টি
অপচয় বন্ধ, সরকারি ব্যয়ে শৃঙ্খলা ফেরানো এবং জাতীয় অগ্রাধিকারের সঙ্গে উন্নয়ন প্রকল্পের সামঞ্জস্য নিশ্চিত করতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) পুনর্গঠন করছে সরকার। এ প্রক্রিয়ায় আনুমানিক ৮ হাজার ৬১৫ কোটি ৪২ লাখ টাকা ব্যয়ের ৯টি প্রকল্প সম্পূর্ণ বাতিল করা হয়েছে। একই সঙ্গে আলাদাভাবে চলমান ৩২টি প্রকল্প একীভূত করে ১৬টি সমন্বিত প্রকল্পে রূপান্তর করা হয়েছে। এ ছাড়া ১৮৫টি অননুমোদিত নতুন প্রকল্পের প্রস্তাব তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
সরকারি নথি অনুযায়ী, বাতিল হওয়া ৯টি প্রকল্পে এ পর্যন্ত মোট ১৫৬ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সদস্য নেয়ামত উল্লাহ ভূঁইয়ার নেতৃত্বে গঠিত বিশেষ কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে এসব প্রকল্প বাতিল ও একীভূত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একীভূতকরণের মাধ্যমে গঠিত ১৬টি সমন্বিত প্রকল্পের প্রাক্কলিত মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২৯ হাজার ৮৯৪ কোটি টাকা।
কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাতিল হওয়া ৯টি প্রকল্পের মধ্যে তিতাস গ্যাস ও পেট্রোবাংলার অধীনে তিনটি স্মার্ট প্রিপেইড গ্যাস মিটার স্থাপন প্রকল্প, পলিটেকনিক ও মাদ্রাসা ভবন নির্মাণ প্রকল্প এবং ময়মনসিংহের একটি পার্ক উন্নয়ন প্রকল্প রয়েছে।
এ পুনর্গঠনের আওতায় সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) বিভিন্ন অঞ্চলের সড়ক ও সেতু নির্মাণ প্রকল্প, বাংলাদেশ রেলওয়ের লেভেল ক্রসিং উন্নয়ন ও রেলপথ সংস্কার প্রকল্প এবং বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) জাহাজ সংগ্রহ ও ড্রেজিং প্রকল্পও একীভূত করা হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন সরকারের এ পদক্ষেপকে ইতিবাচক বলে মন্তব্য করেছেন। তাঁর মতে, কম অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত প্রকল্প বাতিল এবং একই ধরনের প্রকল্প একীভূত করলে প্রশাসনিক ব্যয় কমবে ও বাস্তবায়ন দক্ষতা বাড়বে। তবে প্রকল্প একীভূত করার কারণে বাস্তবায়নে বিলম্ব বা দুর্নীতির নতুন সুযোগ তৈরি হওয়া ঠেকাতে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। একক প্রকল্প পরিচালকের অধীনে অতিরিক্ত কাজ যুক্ত হলে ব্যয় বৃদ্ধি ও সময়ক্ষেপণের ঝুঁকিও বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ড. মুস্তফা কামাল মুজেরি বলেন, এক হাজারের বেশি প্রকল্প নিয়ে গঠিত বিশাল এডিপি থেকে মাত্র ৯টি প্রকল্প বাদ দেওয়া কিছুটা অপ্রতুল মনে হতে পারে। তবে বিস্তৃত পর্যালোচনার মাধ্যমে আরও প্রকল্প বাতিলের সুযোগ রয়েছে। তাঁর মতে, প্রকল্প একীভূত করে ব্যয় সাশ্রয় করা সম্ভব হলেও অবকাঠামো নির্মাণের মানের সঙ্গে কোনোভাবেই আপস করা যাবে না।
পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা জানান, পুনর্গঠনের মূল উদ্দেশ্য প্রশাসনিক ও তদারকি ব্যয় কমানো, প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি আনা এবং অপচয়মূলক ব্যয় বন্ধ করা। একই ভৌগোলিক এলাকা বা প্রশাসনিক অঞ্চলে চলমান একই ধরনের প্রকল্পগুলোকে একটি সমন্বিত প্রকল্পের আওতায় আনা হচ্ছে। এতে কেনাকাটা, ঠিকাদারি চুক্তি ও ব্যবস্থাপনায় দ্বৈততা কমবে।
কর্মকর্তাদের ভাষ্য, প্রকল্প বাতিলের ক্ষেত্রে আর্থিক ও অর্থনৈতিক লাভজনকতা কঠোরভাবে বিবেচনা করা হয়েছে।
পর্যালোচনায় দেখা গেছে, তিতাস গ্যাস ও পেট্রোবাংলার অধীনে বাস্তবায়নাধীন তিনটি স্মার্ট প্রিপেইড গ্যাস মিটার ও সংশ্লিষ্ট স্কাডা সিস্টেম প্রকল্প বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে আর লাভজনক নয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাতিল হওয়া বৈদেশিক অর্থায়নের প্রকল্পগুলোর অব্যবহৃত অর্থ অন্যান্য জরুরি ও উচ্চ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত উন্নয়নকাজে ব্যবহার করা যাবে।
এ ছাড়া দীর্ঘদিন ধরে স্থবির থাকা এবং ভৌত অগ্রগতি শূন্য বা নগণ্য—এমন কয়েকটি প্রকল্পও বাতিল করা হয়েছে। এর মধ্যে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের ভবন নির্মাণ প্রকল্প এবং ময়মনসিংহের ‘শহীদ মো. সাইফুল পার্ক’ উন্নয়ন প্রকল্প রয়েছে।
তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের অধীনে ৩ হাজার ৫৪২ কোটি ১৭ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘গ্যাস সেক্টর এফিসিয়েন্সি ইমপ্রুভমেন্ট অ্যান্ড কার্বন অ্যাবেটমেন্ট’ শীর্ষক স্মার্ট প্রিপেইড মিটার স্থাপন প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০২৪ সালে। তবে প্রকল্পটির ভৌত অগ্রগতি ছিল মাত্র শূন্য দশমিক ৩৮ শতাংশ।
একইভাবে তিতাস গ্যাসের অধীনে ২ হাজার ২১৪ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ের ‘স্মার্ট মিটারিং এনার্জি এফিসিয়েন্সি ইমপ্রুভমেন্ট’ প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি ছিল ৬ শতাংশ। পিজিসিবিএলের আওতাধীন এলাকায় ৬৮১ কোটি ৩৩ লাখ টাকা ব্যয়ে স্মার্ট প্রিপেইড মিটার, স্কাডা ও বিতরণ নিয়ন্ত্রণ স্টেশন স্থাপনের তৃতীয় প্রকল্পটির অগ্রগতি ছিল ৪ শতাংশ।
বাতিল হওয়া অন্য প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে ১৫টি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সক্ষমতা বৃদ্ধির ১ হাজার ৫১৩ কোটি ৯৫ লাখ টাকার প্রকল্প। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে এর বাস্তবায়ন শুরু হলেও কোনো ভৌত অগ্রগতি হয়নি। এ ছাড়া আটটি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের একাডেমিক ভবন নির্মাণে ৪৫১ কোটি ৭ লাখ টাকার প্রকল্প এবং ৪৪ কোটি ৫৮ লাখ টাকা ব্যয়ে মাদ্রাসা ভবন নির্মাণের একটি প্রকল্প বাতিল করা হয়েছে।
ময়মনসিংহ গণপূর্ত বিভাগের অধীনে ‘শহীদ মো. সাইফুল পার্ক’ নির্মাণ প্রকল্পের অগ্রগতি ছিল মাত্র ১ শতাংশ। দীর্ঘদিন ধরে কাজ বন্ধ থাকায় এটি বাতিল করা হয়েছে। বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমির (বার্ড) ৪০ কোটি ৪৫ লাখ টাকার একটি গবেষণা প্রকল্পে কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় সেটিও বাতিল হয়েছে। অন্যদিকে ফরিদপুরে মিল্ক ভিটার গবাদিপশুর জাত উন্নয়নের একটি প্রকল্প ২২ দশমিক ৯৭ শতাংশ ভৌত অগ্রগতি সত্ত্বেও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের প্রতিবেদনে পরিবহন খাতের বেশ কয়েকটি বড় একীভূতকরণের পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে।
কুমিল্লা জোনে আড়াইহাজার-নবীনগর এবং নবীনগর-আশুগঞ্জ সড়ক উন্নয়নের দুটি প্রকল্প একীভূত করা হয়েছে। প্রকল্প দুটির সম্মিলিত ব্যয় ২ হাজার ১৩৭ কোটি টাকা। এগুলোর ভৌত অগ্রগতি ছিল যথাক্রমে ১০ ও ৮৩ শতাংশ।
সিলেট জোনে ৫৫ শতাংশ অগ্রগতি হওয়া কুমারগাঁও চার লেন সড়ক প্রকল্প এবং ৬ শতাংশ অগ্রগতির বড়ভাঙ্গা সেতু নির্মাণ প্রকল্প একত্র করা হয়েছে। একইভাবে ৬৮ শতাংশ অগ্রগতি হওয়া শরীয়তপুর ফেরি টার্মিনাল সংযোগ সড়ক এবং ৮২ শতাংশ অগ্রগতির শরীয়তপুর-জাজিরা সংযোগ সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পকে একটি সমন্বিত প্রকল্পের আওতায় আনা হয়েছে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলে লেভেল ক্রসিং আধুনিকায়নের ৩৩৩ কোটি ৫৪ লাখ টাকার দুটি পৃথক প্রকল্প একীভূত করা হয়েছে। প্রকল্প দুটির অগ্রগতি ছিল যথাক্রমে ১০০ ও ৯৮ দশমিক ৬৯ শতাংশ।
এ ছাড়া পূর্বাঞ্চলে ৩ দশমিক ৫০ শতাংশ এবং পশ্চিমাঞ্চলে শূন্য শতাংশ অগ্রগতি থাকা রেলপথ সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের দুটি প্রকল্প একীভূত করা হয়েছে। প্রকল্প দুটির সম্মিলিত ব্যয় ৩ হাজার ৮২১ কোটি টাকা।
বিআইডব্লিউটিএর জাহাজ সংগ্রহ ও ড্রেজিংসংক্রান্ত ৬ হাজার ৬০১ কোটি টাকা ব্যয়ের দুটি বড় প্রকল্পও একীভূত করা হয়েছে। প্রকল্প দুটির ভৌত অগ্রগতি ছিল যথাক্রমে ১৮ ও ৪৮ দশমিক ১৭ শতাংশ।
প্রতিরক্ষা খাতেও সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রশাসনিক ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে সেনাবাহিনী ও বিমানবাহিনীর আবাসন এবং প্রশিক্ষণ অবকাঠামোর পৃথক প্রকল্পগুলোকে সমন্বিত প্যাকেজের আওতায় আনা হয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তাদের মতে, একই এলাকায় ছোট ছোট একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়নের কারণে প্রশাসনিক ব্যয় বেড়ে যাচ্ছিল। প্রকল্পের পরিধি পুনর্নির্ধারণ ও পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে বাস্তবায়নের গতি বাড়ানো এবং অপচয় কমানোর আশা করছে কমিশন। একই সঙ্গে বাতিল হওয়া প্রকল্পের অব্যবহৃত বৈদেশিক ঋণের অর্থ জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট অগ্রাধিকারমূলক প্রকল্পে স্থানান্তরের সুযোগ তৈরি হবে।
রাজস্ব ব্যয়ে শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে সংশোধিত এডিপি থেকে প্রস্তাবিত কিন্তু অননুমোদিত ১৮৫টি ‘গ্রিন পেজ’ প্রকল্প বাদ দেওয়া হয়েছে।
সরকারের একটি বিশেষ উপদেষ্টা কমিটি মনে করেছে, প্রস্তাবিত এসব প্রকল্পের অনেকগুলোই দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও জাতীয় উন্নয়ন অগ্রাধিকারের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।
পরিকল্পনা কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাদ পড়া প্রকল্পগুলোর মধ্যে কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের ৫৩টি, ভৌত অবকাঠামো বিভাগের ৪৬টি, আর্থসামাজিক অবকাঠামো বিভাগের ৬৩টি এবং শিল্প ও জ্বালানি বিভাগের ২৩টি প্রকল্প রয়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের লক্ষ্য, নতুন প্রকল্পের জট তৈরি হতে না দেওয়া এবং অননুমোদিত প্রকল্পে নতুন করে অর্থ বরাদ্দ না করে জাতীয় গুরুত্বসম্পন্ন চলমান বড় প্রকল্পগুলোতে অর্থায়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া। এর মাধ্যমে বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে রাখারও পরিকল্পনা রয়েছে।
কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের অধীনে নোয়াখালী, ময়মনসিংহ ও পার্বত্য অঞ্চলের গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প, পটুয়াখালী ও বরগুনার সেচ কর্মসূচি, বীজ বিতরণ উদ্যোগ এবং সামুদ্রিক মৎস্য জরিপসংক্রান্ত প্রকল্প বাদ দেওয়া হয়েছে।
ভৌত অবকাঠামো বিভাগের তালিকা থেকে বাদ পড়েছে চৌমুহনী-লক্ষ্মীপুর রেলপথ সম্প্রসারণ, নতুন পদ্মা রেলসেতুর (ঢালারচর-রাজবাড়ী) সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, বাঘাবাড়ী নদীবন্দর আধুনিকায়ন এবং থানা ভবন পুনর্নির্মাণের প্রকল্প।
আর্থসামাজিক অবকাঠামো খাতের ৬৩টি প্রস্তাবের মধ্যে সাতটি আঞ্চলিক মাদ্রাসা শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট স্থাপন, দেশব্যাপী স্মার্ট ক্লাসরুম চালু এবং বিশেষায়িত পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট আধুনিকায়নের প্রকল্প রয়েছে।
শিল্প ও জ্বালানি বিভাগের প্রস্তাবিত ‘বাংলাদেশ লবণ গবেষণা ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র’ প্রকল্পটিও বাদ দেওয়া হয়েছে। আর্থিক সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলস লিমিটেড ও খুলনা হার্ডবোর্ড মিলস লিমিটেডের জমিতে নতুন স্টার্চ ও সক্রিয় ওষুধি উপাদান (এপিআই) কমপ্লেক্স স্থাপনের প্রস্তাবও তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।







Disqus comments are not configured yet.