বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬, ৮ কার্তিক ১৪৩৩
[gtranslate]
বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬, ৮ কার্তিক ১৪৩৩

এডিপি থেকে বাদ ১৮৫ নতুন প্রকল্প, একীভূত হচ্ছে আরও ৩২টি

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:৪৯ পূর্বাহ্ণ ই-পেপার প্রিন্ট ভিউ
এডিপি থেকে বাদ ১৮৫ নতুন প্রকল্প, একীভূত হচ্ছে আরও ৩২টি

অপচয় বন্ধ, সরকারি ব্যয়ে শৃঙ্খলা ফেরানো এবং জাতীয় অগ্রাধিকারের সঙ্গে উন্নয়ন প্রকল্পের সামঞ্জস্য নিশ্চিত করতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) পুনর্গঠন করছে সরকার। এ প্রক্রিয়ায় আনুমানিক ৮ হাজার ৬১৫ কোটি ৪২ লাখ টাকা ব্যয়ের ৯টি প্রকল্প সম্পূর্ণ বাতিল করা হয়েছে। একই সঙ্গে আলাদাভাবে চলমান ৩২টি প্রকল্প একীভূত করে ১৬টি সমন্বিত প্রকল্পে রূপান্তর করা হয়েছে। এ ছাড়া ১৮৫টি অননুমোদিত নতুন প্রকল্পের প্রস্তাব তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

সরকারি নথি অনুযায়ী, বাতিল হওয়া ৯টি প্রকল্পে এ পর্যন্ত মোট ১৫৬ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সদস্য নেয়ামত উল্লাহ ভূঁইয়ার নেতৃত্বে গঠিত বিশেষ কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে এসব প্রকল্প বাতিল ও একীভূত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একীভূতকরণের মাধ্যমে গঠিত ১৬টি সমন্বিত প্রকল্পের প্রাক্কলিত মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২৯ হাজার ৮৯৪ কোটি টাকা।

কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাতিল হওয়া ৯টি প্রকল্পের মধ্যে তিতাস গ্যাস ও পেট্রোবাংলার অধীনে তিনটি স্মার্ট প্রিপেইড গ্যাস মিটার স্থাপন প্রকল্প, পলিটেকনিক ও মাদ্রাসা ভবন নির্মাণ প্রকল্প এবং ময়মনসিংহের একটি পার্ক উন্নয়ন প্রকল্প রয়েছে।

এ পুনর্গঠনের আওতায় সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) বিভিন্ন অঞ্চলের সড়ক ও সেতু নির্মাণ প্রকল্প, বাংলাদেশ রেলওয়ের লেভেল ক্রসিং উন্নয়ন ও রেলপথ সংস্কার প্রকল্প এবং বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) জাহাজ সংগ্রহ ও ড্রেজিং প্রকল্পও একীভূত করা হচ্ছে।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন সরকারের এ পদক্ষেপকে ইতিবাচক বলে মন্তব্য করেছেন। তাঁর মতে, কম অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত প্রকল্প বাতিল এবং একই ধরনের প্রকল্প একীভূত করলে প্রশাসনিক ব্যয় কমবে ও বাস্তবায়ন দক্ষতা বাড়বে। তবে প্রকল্প একীভূত করার কারণে বাস্তবায়নে বিলম্ব বা দুর্নীতির নতুন সুযোগ তৈরি হওয়া ঠেকাতে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। একক প্রকল্প পরিচালকের অধীনে অতিরিক্ত কাজ যুক্ত হলে ব্যয় বৃদ্ধি ও সময়ক্ষেপণের ঝুঁকিও বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ড. মুস্তফা কামাল মুজেরি বলেন, এক হাজারের বেশি প্রকল্প নিয়ে গঠিত বিশাল এডিপি থেকে মাত্র ৯টি প্রকল্প বাদ দেওয়া কিছুটা অপ্রতুল মনে হতে পারে। তবে বিস্তৃত পর্যালোচনার মাধ্যমে আরও প্রকল্প বাতিলের সুযোগ রয়েছে। তাঁর মতে, প্রকল্প একীভূত করে ব্যয় সাশ্রয় করা সম্ভব হলেও অবকাঠামো নির্মাণের মানের সঙ্গে কোনোভাবেই আপস করা যাবে না।

পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা জানান, পুনর্গঠনের মূল উদ্দেশ্য প্রশাসনিক ও তদারকি ব্যয় কমানো, প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি আনা এবং অপচয়মূলক ব্যয় বন্ধ করা। একই ভৌগোলিক এলাকা বা প্রশাসনিক অঞ্চলে চলমান একই ধরনের প্রকল্পগুলোকে একটি সমন্বিত প্রকল্পের আওতায় আনা হচ্ছে। এতে কেনাকাটা, ঠিকাদারি চুক্তি ও ব্যবস্থাপনায় দ্বৈততা কমবে।

কর্মকর্তাদের ভাষ্য, প্রকল্প বাতিলের ক্ষেত্রে আর্থিক ও অর্থনৈতিক লাভজনকতা কঠোরভাবে বিবেচনা করা হয়েছে।

পর্যালোচনায় দেখা গেছে, তিতাস গ্যাস ও পেট্রোবাংলার অধীনে বাস্তবায়নাধীন তিনটি স্মার্ট প্রিপেইড গ্যাস মিটার ও সংশ্লিষ্ট স্কাডা সিস্টেম প্রকল্প বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে আর লাভজনক নয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাতিল হওয়া বৈদেশিক অর্থায়নের প্রকল্পগুলোর অব্যবহৃত অর্থ অন্যান্য জরুরি ও উচ্চ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত উন্নয়নকাজে ব্যবহার করা যাবে।

এ ছাড়া দীর্ঘদিন ধরে স্থবির থাকা এবং ভৌত অগ্রগতি শূন্য বা নগণ্য—এমন কয়েকটি প্রকল্পও বাতিল করা হয়েছে। এর মধ্যে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের ভবন নির্মাণ প্রকল্প এবং ময়মনসিংহের ‘শহীদ মো. সাইফুল পার্ক’ উন্নয়ন প্রকল্প রয়েছে।

তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের অধীনে ৩ হাজার ৫৪২ কোটি ১৭ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘গ্যাস সেক্টর এফিসিয়েন্সি ইমপ্রুভমেন্ট অ্যান্ড কার্বন অ্যাবেটমেন্ট’ শীর্ষক স্মার্ট প্রিপেইড মিটার স্থাপন প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০২৪ সালে। তবে প্রকল্পটির ভৌত অগ্রগতি ছিল মাত্র শূন্য দশমিক ৩৮ শতাংশ।

একইভাবে তিতাস গ্যাসের অধীনে ২ হাজার ২১৪ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ের ‘স্মার্ট মিটারিং এনার্জি এফিসিয়েন্সি ইমপ্রুভমেন্ট’ প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি ছিল ৬ শতাংশ। পিজিসিবিএলের আওতাধীন এলাকায় ৬৮১ কোটি ৩৩ লাখ টাকা ব্যয়ে স্মার্ট প্রিপেইড মিটার, স্কাডা ও বিতরণ নিয়ন্ত্রণ স্টেশন স্থাপনের তৃতীয় প্রকল্পটির অগ্রগতি ছিল ৪ শতাংশ।

বাতিল হওয়া অন্য প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে ১৫টি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সক্ষমতা বৃদ্ধির ১ হাজার ৫১৩ কোটি ৯৫ লাখ টাকার প্রকল্প। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে এর বাস্তবায়ন শুরু হলেও কোনো ভৌত অগ্রগতি হয়নি। এ ছাড়া আটটি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের একাডেমিক ভবন নির্মাণে ৪৫১ কোটি ৭ লাখ টাকার প্রকল্প এবং ৪৪ কোটি ৫৮ লাখ টাকা ব্যয়ে মাদ্রাসা ভবন নির্মাণের একটি প্রকল্প বাতিল করা হয়েছে।

ময়মনসিংহ গণপূর্ত বিভাগের অধীনে ‘শহীদ মো. সাইফুল পার্ক’ নির্মাণ প্রকল্পের অগ্রগতি ছিল মাত্র ১ শতাংশ। দীর্ঘদিন ধরে কাজ বন্ধ থাকায় এটি বাতিল করা হয়েছে। বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমির (বার্ড) ৪০ কোটি ৪৫ লাখ টাকার একটি গবেষণা প্রকল্পে কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় সেটিও বাতিল হয়েছে। অন্যদিকে ফরিদপুরে মিল্ক ভিটার গবাদিপশুর জাত উন্নয়নের একটি প্রকল্প ২২ দশমিক ৯৭ শতাংশ ভৌত অগ্রগতি সত্ত্বেও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশনের প্রতিবেদনে পরিবহন খাতের বেশ কয়েকটি বড় একীভূতকরণের পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে।

কুমিল্লা জোনে আড়াইহাজার-নবীনগর এবং নবীনগর-আশুগঞ্জ সড়ক উন্নয়নের দুটি প্রকল্প একীভূত করা হয়েছে। প্রকল্প দুটির সম্মিলিত ব্যয় ২ হাজার ১৩৭ কোটি টাকা। এগুলোর ভৌত অগ্রগতি ছিল যথাক্রমে ১০ ও ৮৩ শতাংশ।

সিলেট জোনে ৫৫ শতাংশ অগ্রগতি হওয়া কুমারগাঁও চার লেন সড়ক প্রকল্প এবং ৬ শতাংশ অগ্রগতির বড়ভাঙ্গা সেতু নির্মাণ প্রকল্প একত্র করা হয়েছে। একইভাবে ৬৮ শতাংশ অগ্রগতি হওয়া শরীয়তপুর ফেরি টার্মিনাল সংযোগ সড়ক এবং ৮২ শতাংশ অগ্রগতির শরীয়তপুর-জাজিরা সংযোগ সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পকে একটি সমন্বিত প্রকল্পের আওতায় আনা হয়েছে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলে লেভেল ক্রসিং আধুনিকায়নের ৩৩৩ কোটি ৫৪ লাখ টাকার দুটি পৃথক প্রকল্প একীভূত করা হয়েছে। প্রকল্প দুটির অগ্রগতি ছিল যথাক্রমে ১০০ ও ৯৮ দশমিক ৬৯ শতাংশ।

এ ছাড়া পূর্বাঞ্চলে ৩ দশমিক ৫০ শতাংশ এবং পশ্চিমাঞ্চলে শূন্য শতাংশ অগ্রগতি থাকা রেলপথ সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের দুটি প্রকল্প একীভূত করা হয়েছে। প্রকল্প দুটির সম্মিলিত ব্যয় ৩ হাজার ৮২১ কোটি টাকা।

বিআইডব্লিউটিএর জাহাজ সংগ্রহ ও ড্রেজিংসংক্রান্ত ৬ হাজার ৬০১ কোটি টাকা ব্যয়ের দুটি বড় প্রকল্পও একীভূত করা হয়েছে। প্রকল্প দুটির ভৌত অগ্রগতি ছিল যথাক্রমে ১৮ ও ৪৮ দশমিক ১৭ শতাংশ।

প্রতিরক্ষা খাতেও সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রশাসনিক ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে সেনাবাহিনী ও বিমানবাহিনীর আবাসন এবং প্রশিক্ষণ অবকাঠামোর পৃথক প্রকল্পগুলোকে সমন্বিত প্যাকেজের আওতায় আনা হয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তাদের মতে, একই এলাকায় ছোট ছোট একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়নের কারণে প্রশাসনিক ব্যয় বেড়ে যাচ্ছিল। প্রকল্পের পরিধি পুনর্নির্ধারণ ও পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে বাস্তবায়নের গতি বাড়ানো এবং অপচয় কমানোর আশা করছে কমিশন। একই সঙ্গে বাতিল হওয়া প্রকল্পের অব্যবহৃত বৈদেশিক ঋণের অর্থ জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট অগ্রাধিকারমূলক প্রকল্পে স্থানান্তরের সুযোগ তৈরি হবে।

রাজস্ব ব্যয়ে শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে সংশোধিত এডিপি থেকে প্রস্তাবিত কিন্তু অননুমোদিত ১৮৫টি ‘গ্রিন পেজ’ প্রকল্প বাদ দেওয়া হয়েছে।

সরকারের একটি বিশেষ উপদেষ্টা কমিটি মনে করেছে, প্রস্তাবিত এসব প্রকল্পের অনেকগুলোই দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও জাতীয় উন্নয়ন অগ্রাধিকারের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।

পরিকল্পনা কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাদ পড়া প্রকল্পগুলোর মধ্যে কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের ৫৩টি, ভৌত অবকাঠামো বিভাগের ৪৬টি, আর্থসামাজিক অবকাঠামো বিভাগের ৬৩টি এবং শিল্প ও জ্বালানি বিভাগের ২৩টি প্রকল্প রয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশনের লক্ষ্য, নতুন প্রকল্পের জট তৈরি হতে না দেওয়া এবং অননুমোদিত প্রকল্পে নতুন করে অর্থ বরাদ্দ না করে জাতীয় গুরুত্বসম্পন্ন চলমান বড় প্রকল্পগুলোতে অর্থায়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া। এর মাধ্যমে বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে রাখারও পরিকল্পনা রয়েছে।

কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের অধীনে নোয়াখালী, ময়মনসিংহ ও পার্বত্য অঞ্চলের গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প, পটুয়াখালী ও বরগুনার সেচ কর্মসূচি, বীজ বিতরণ উদ্যোগ এবং সামুদ্রিক মৎস্য জরিপসংক্রান্ত প্রকল্প বাদ দেওয়া হয়েছে।

ভৌত অবকাঠামো বিভাগের তালিকা থেকে বাদ পড়েছে চৌমুহনী-লক্ষ্মীপুর রেলপথ সম্প্রসারণ, নতুন পদ্মা রেলসেতুর (ঢালারচর-রাজবাড়ী) সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, বাঘাবাড়ী নদীবন্দর আধুনিকায়ন এবং থানা ভবন পুনর্নির্মাণের প্রকল্প।

আর্থসামাজিক অবকাঠামো খাতের ৬৩টি প্রস্তাবের মধ্যে সাতটি আঞ্চলিক মাদ্রাসা শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট স্থাপন, দেশব্যাপী স্মার্ট ক্লাসরুম চালু এবং বিশেষায়িত পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট আধুনিকায়নের প্রকল্প রয়েছে।

শিল্প ও জ্বালানি বিভাগের প্রস্তাবিত ‘বাংলাদেশ লবণ গবেষণা ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র’ প্রকল্পটিও বাদ দেওয়া হয়েছে। আর্থিক সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলস লিমিটেড ও খুলনা হার্ডবোর্ড মিলস লিমিটেডের জমিতে নতুন স্টার্চ ও সক্রিয় ওষুধি উপাদান (এপিআই) কমপ্লেক্স স্থাপনের প্রস্তাবও তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

পিএইচপির নিরাপত্তাঝুঁকির আশঙ্কায় বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট বন্ধ

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬, ৮:১২ অপরাহ্ণ
পিএইচপির নিরাপত্তাঝুঁকির আশঙ্কায় বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট বন্ধ

জরুরি সাইবার নিরাপত্তাঝুঁকি এড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। পিএইচপি প্রোগ্রামিং ভাষার নিরাপত্তা ত্রুটি থেকে সম্ভাব্য সাইবার হামলার আশঙ্কায় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে ওয়েবসাইটটিতে কোনো সাইবার হামলা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটে প্রবেশ করা যাচ্ছিল না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ওয়েবসাইটের নিরাপত্তা দুর্বলতা শনাক্ত করা এবং তা সমাধানের কাজ চলছে। ঝুঁকি পর্যালোচনা ও প্রয়োজনীয় সুরক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করার পর ওয়েবসাইটটি পুনরায় চালু করা হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান গণমাধ্যমকে জানান, জরুরি নিরাপত্তা সমস্যার কারণে ওয়েবসাইটটি বন্ধ রাখা হয়েছে। সম্ভাব্য নিরাপত্তাঝুঁকি এড়াতে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পিএইচপি প্রোগ্রামিং ভাষার দুটি গুরুতর নিরাপত্তা ত্রুটি নিয়ে বিশ্বব্যাপী সতর্কতা তৈরি হয়েছে। এসব ত্রুটি কাজে লাগিয়ে সম্ভাব্য হামলাকারীরা দূর থেকে সার্ভারে অননুমোদিত নির্দেশনা কার্যকর করার সুযোগ পেতে পারেন।

এ ধরনের নিরাপত্তা দুর্বলতা কাজে লাগানো হলে সার্ভারের ফাইল, ডেটাবেজ ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। এমনকি সংশ্লিষ্ট সার্ভারে অননুমোদিত প্রবেশের সুযোগ তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও থাকে। এ কারণে ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নিচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পাশাপাশি পিএইচপিভিত্তিক আরও কিছু ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটেও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটে আলোচিত নিরাপত্তা ত্রুটিগুলো কাজে লাগিয়ে কোনো সাইবার হামলা চালানো হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

পিএইচপি একটি বহুল ব্যবহৃত সার্ভারভিত্তিক প্রোগ্রামিং ভাষা। বিশ্বের বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান, সংবাদমাধ্যম, ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম ও অনলাইন সেবা পরিচালনায় এ প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়। তবে কোনো ওয়েবসাইটে পিএইচপি ব্যবহার করা হলেই সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে না। ব্যবহৃত সংস্করণ, নিরাপত্তা হালনাগাদ, সার্ভারের কনফিগারেশন এবং অন্যান্য সুরক্ষাব্যবস্থার ওপর ঝুঁকির মাত্রা নির্ভর করে।

সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের পরিস্থিতিতে সার্ভারে ব্যবহৃত পিএইচপির সংস্করণ শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা হালনাগাদ করা জরুরি। দ্রুত ত্রুটি সংশোধন সম্ভব না হলে ফায়ারওয়াল ব্যবহার, অননুমোদিত সংযোগ সীমিত করা এবং প্রয়োজনে সার্ভার সাময়িকভাবে ইন্টারনেট থেকে বিচ্ছিন্ন রাখার মতো পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট বন্ধ থাকায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিভিন্ন তথ্য ও অনলাইন সেবা ব্যবহারে সাময়িক অসুবিধা হতে পারে। তবে ওয়েবসাইটটি পুনরায় চালুর বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সময় জানানো হয়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, নিরাপত্তা ত্রুটি শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় সুরক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করার পরই ওয়েবসাইটটি চালুর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

সন্তানের হাতে অল্প বয়সে মোটরসাইকেল-অ্যান্ড্রয়েড ফোন তুলে দেবেন না: এমপি জালাল

নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬, ৭:৩৪ অপরাহ্ণ
সন্তানের হাতে অল্প বয়সে মোটরসাইকেল-অ্যান্ড্রয়েড ফোন তুলে দেবেন না: এমপি জালাল

কিশোরগঞ্জ-২ (কটিয়াদী–পাকুন্দিয়া) আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মো. জালাল উদ্দিন বলেছেন, সন্তানদের সব আবদার পূরণ করা অভিভাবকদের উচিত নয়। বয়স ও সামর্থ্য বিবেচনায় নিয়ে তাদের আবদার পূরণ করতে হবে। বিশেষ করে অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের হাতে মোটরসাইকেল ও অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোন তুলে দেওয়ার বিষয়ে অভিভাবকদের সতর্ক থাকতে হবে। অপরিণত বয়সে এসবের ব্যবহার সন্তানদের বিপথে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) সকালে কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার জাঙ্গালিয়া ইউনিয়ন উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজ মাঠে সোনালী স্বপ্ন ফাউন্ডেশন আয়োজিত ২০২৫ সালের বৃত্তিপ্রাপ্ত কৃতী শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা ও পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

অভিভাবকদের উদ্দেশে সংসদ সদস্য জালাল উদ্দিন বলেন, ‘সন্তানের অন্যায় আবদার পূরণ করতে গিয়ে তাকে অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল কিনে দিচ্ছেন। মোবাইল কিনে দিলেন, নাকি আপনার সন্তানকে ধ্বংস করে দিলেন? এই ধ্বংসের জন্য দায়ী আপনারা, সেই অভিভাবকেরা, যারা সন্তান পঞ্চম বা ষষ্ঠ শ্রেণিতে উঠলেই মোটরসাইকেল কিনে দেন।’

সড়ক দুর্ঘটনায় এক মেধাবী শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমি সেদিন আফতাবউদ্দিন উচ্চবিদ্যালয়ের একটি অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। কিশোরগঞ্জ জেলার মধ্যে প্রথম হওয়া ওই বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী মোটরসাইকেলে প্রাইভেট পড়তে যাওয়ার পথে অটোরিকশার সঙ্গে সংঘর্ষে মারা যায়। এই মেধাবী শিক্ষার্থীর মৃত্যুর জন্য কি শুধু সে-ই দায়ী? প্রশ্নটি আপনাদের বিবেকের কাছে রাখলাম। আমি ওই শিক্ষার্থীকে দায়ী করি না। ছোটরা আবদার করবে, কিন্তু তাদের সব আবদার কি আমাদের পূরণ করতে হবে?’

মোটরসাইকেলের গতি এবং শিশু-কিশোরদের তা নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সংসদ সদস্য বলেন, ‘বাবা পালসার বা অ্যাপাচির মতো মোটরসাইকেল চালান, আর অষ্টম শ্রেণিতে পড়া ছেলেকেও একই ধরনের মোটরসাইকেল কিনে দিতে হয়। এসব মোটরসাইকেলের গতি মুহূর্তেই ঘণ্টায় ৭০ থেকে ৮০ কিলোমিটারে উঠে যায়। এই গতি নিয়ন্ত্রণ করার সক্ষমতা অষ্টম, নবম ও দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের নেই।’

অভিভাবকদের সতর্ক করে তিনি আরও বলেন, ‘আমি আপনাদের অনুরোধ করছি, একজন ভাই হিসেবে বলছি, সন্তানদের এমন সর্বনাশ করবেন না। তাদের হাতে অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল তুলে দেবেন না। তারা গেম খেলতে খেলতে অনলাইন জুয়ায় জড়িয়ে পড়ছে, অথচ আপনারা খবরও রাখছেন না। মোটরসাইকেল নিয়ে তারা কোথায় যায়, কার সঙ্গে মেশে, সেদিকেও নজর রাখছেন না।’

তিনি বলেন, মোটরসাইকেল পাওয়ার পর কিশোরদের বন্ধুমহল বড় হয়। এর ফলে তারা খারাপ সঙ্গেও জড়িয়ে পড়তে পারে। একপর্যায়ে মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। মাদকে আসক্ত হয়ে পড়লে তা থেকে বেরিয়ে আসাও কঠিন হয়ে পড়ে। তাই সন্তানদের চলাফেরা, বন্ধুমহল ও প্রযুক্তির ব্যবহার সম্পর্কে অভিভাবকদের সচেতন থাকার পাশাপাশি তাদের প্রতি আরও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

সন্তানদের সুশিক্ষিত ও সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়ে সংসদ সদস্য বলেন, জীবনের এ পর্যায়ে এসে সন্তানদের মানুষ করে তোলাই অভিভাবকদের অন্যতম প্রধান আকাঙ্ক্ষা। সন্তানরা সঠিকভাবে গড়ে উঠলেই অভিভাবকদের জীবন সার্থক হয়।

বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করে তিনি বলেন, বর্তমানে শিশুরা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশ নিয়ে বৃত্তি পাচ্ছে এবং ক্রেস্ট, বৃত্তির অর্থ ও সনদপত্র অর্জন করছে। তাঁদের সময়ে এ ধরনের সুযোগ ছিল না। বর্তমানে বিভিন্ন সংগঠন শিশুদের মেধা বিকাশে কাজ করছে, যা শিক্ষার্থীদের জন্য একটি সুবর্ণ সুযোগ।

বিশেষ করে প্রবাসীদের স্ত্রীদের একা সন্তান লালন-পালনের ক্ষেত্রে নানা চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করে তিনি মায়েদের সন্তানদের সঠিক পথে পরিচালিত করার আহ্বান জানান। সন্তানদের সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে অভিভাবকদের সচেতনতা, দায়িত্বশীলতা ও যথাযথ দিকনির্দেশনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন উপজেলা বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক ও জাঙ্গালিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ভিপি তৌফিকুল ইসলাম। অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন পাকুন্দিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হেলাল উদ্দিন, উপজেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি আহমেদ ফারুক খোকন, উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক মিজানুর রহমান খান সুমন এবং উপজেলা ছাত্রদলের সদস্যসচিব শাহীন আলম জনি।

অনুষ্ঠানে প্রথম থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত ২৭০ জন বৃত্তিপ্রাপ্ত কৃতী শিক্ষার্থীকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। আলোচনা সভা শেষে শিক্ষার্থীদের হাতে ক্রেস্ট ও সনদপত্র তুলে দেন অতিথিরা।

পাগলেও বিশ্বাস করবে না’, তবে ভালো মানুষের অন্তরে কি বিশ্বাস জাগে না?

রেজাউল হক প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬, ৭:০৪ অপরাহ্ণ
পাগলেও বিশ্বাস করবে না’, তবে ভালো মানুষের অন্তরে কি বিশ্বাস জাগে না?

রাজনীতিতে অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগ নতুন কিছু নয়। এক পক্ষ অভিযোগ তোলে, অন্য পক্ষ তা প্রত্যাখ্যান করে। কিন্তু কোনো বক্তব্য যতই দৃঢ় হোক, বাস্তবতার সামনে তার ব্যাখ্যা দেওয়ার দায় এড়ানো যায় না। আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর সম্পর্ক নিয়ে বিএনপি ও জামায়াতের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের মধ্যে কিশোরগঞ্জে ছাত্রলীগের কমিটিতে এক জামায়াত নেতার ছেলের পদ পাওয়ার ঘটনা নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

গত ১৮ অক্টোবর কার্যক্রম নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কিশোরগঞ্জ জেলা কমিটির পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশের পর বিষয়টি সামনে আসে। জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেন মোল্লার ফেসবুকে প্রকাশিত ওই কমিটিতে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদে নাম রয়েছে ইটনা উপজেলার বাদলা ইউনিয়ন জামায়াতের সভাপতি সিরাজ উদ্দিনের ছেলে আলী আকবর তানভীরের। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় আলোচনা-সমালোচনা।

সিরাজ উদ্দিনের দাবি, ছেলের ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সম্পৃক্ততার বিষয়ে তিনি কিছুই জানতেন না। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তানভীর কয়েক মাস ধরে মালয়েশিয়ায় রয়েছেন। কমিটি প্রকাশের পর ছেলের সঙ্গে কথা হলে তিনি পদত্যাগের কথা জানিয়েছেন বলেও দাবি করেন সিরাজ উদ্দিন। তবে পদত্যাগের কোনো প্রমাণ তাঁর কাছে নেই। এমনকি ছেলের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের নম্বরও তিনি দিতে পারেননি।

অন্যদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তানভীরের নামে প্রচারিত বক্তব্যে ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে নিজের পরিচয় দেওয়ার পাশাপাশি সংগঠন করার সাংবিধানিক অধিকারের কথা বলা হয়েছে। বাবার বক্তব্যের সঙ্গে ছেলের নামে প্রচারিত এই বক্তব্যের পার্থক্যই বিষয়টিকে আরও আলোচনায় এনেছে।

এখানে কয়েকটি প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে। তানভীরের নাম ছাত্রলীগের জেলা কমিটিতে এল কারণ তিনি অবশ্যই আগে থেকেই সংগঠনটির রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। কমিটিতে তাঁর পদ পাওয়ার পেছনে তার মত অবশ্যই ছিলো। আর পদত্যাগের যে কথা বলা হচ্ছে, তার বাস্তব কোন ভিত্তি নাই।

কিশোরগঞ্জের এই ঘটনা এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর সম্পর্ক নিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে চলছে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য। ২২ অক্টোবর কিশোরগঞ্জ জেলা জামায়াতের রুকন সম্মেলনে দলটির কেন্দ্রীয় নেতা অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ বলেন, আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামী একাকার হয়ে গেছে- এমন অভিযোগ বাংলাদেশের কোনো পাগলও বিশ্বাস করবে না।

বক্তব্যটি ছিল অভিযোগের বিরুদ্ধে কঠোর রাজনৈতিক প্রত্যাখ্যান। কিন্তু কোনো অভিযোগকে অবিশ্বাস্য বলে উড়িয়ে দিলেই কি সংশ্লিষ্ট সব প্রশ্নের অবসান ঘটে? বিশেষ করে, যে কিশোরগঞ্জে জামায়াত নেতার ছেলের ছাত্রলীগের কমিটিতে পদ পাওয়ার ঘটনা আলোচনায় এসেছে, সেই জেলাতেই এমন বক্তব্য নতুন করে বিতর্কের অবকাশ তৈরি করেছে।

অন্যদিকে, বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বও আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের মধ্যে যোগসাজশের অভিযোগ তুলেছে। গত ২০ অক্টোবর রাজশাহীর এক জনসভায় বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান তাঁর বক্তব্যে শ্রমিক অসন্তোষ তৈরির চেষ্টা, পলাতক স্বৈরাচারের অর্থায়ন এবং নির্বাচনের আগে টিকিট বিক্রির চেষ্টায় কয়েকটি দলের সম্পৃক্ততা নিয়ে গোয়েন্দা তথ্য থাকার কথা বলেন। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাঁর বক্তব্যে আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের দিকে ইঙ্গিত ছিল।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীও আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতের সম্পর্কের প্রমাণ থাকার দাবি করেছেন। তাঁর অভিযোগ, বিএনপির সঙ্গে আওয়ামী লীগের সম্পর্ক নিয়ে জামায়াত অপপ্রচার চালাচ্ছে। এর আগে নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের একই সঙ্গে আন্দোলন করার প্রসঙ্গও তিনি তুলে ধরেছিলেন।

অর্থাৎ, বিএনপি অতীতের রাজনৈতিক আন্দোলন ও সাম্প্রতিক ঘটনাবলির প্রসঙ্গ টেনে যোগসাজশের অভিযোগ করছে। জামায়াত সেই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করছে। কিন্তু রাজনৈতিক বক্তব্যের এই পাল্টাপাল্টির মধ্যে কিশোরগঞ্জের ঘটনাটি স্থানীয় রাজনীতির গণ্ডি ছাড়িয়ে বৃহত্তর রাজনৈতিক বিতর্কের অংশ হয়ে উঠেছে।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রাজনৈতিক বক্তব্যের সত্যতা যাচাইয়ের মানদণ্ড সবার জন্য এক হওয়া প্রয়োজন। প্রতিপক্ষের কর্মকাণ্ডের ব্যাখ্যা দাবি করা হলে নিজেদের ঘিরে ওঠা প্রশ্নেরও জবাব দিতে হবে। কোনো অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হতে পারে, আবার কোনো ঘটনার ব্যাখ্যা অস্পষ্ট থাকলে তা নিয়ে জনমনে সন্দেহও তৈরি হতে পারে। সন্দেহ আর প্রমাণ এক বিষয় নয়- এই পার্থক্য মাথায় রেখেই বিতর্কের বিচার করা জরুরি।

কিশোরগঞ্জের ঘটনায় জামায়াতের স্থানীয় নেতৃত্বের অবস্থান যেমন স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন, তেমনি কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছ থেকেও ব্যাখ্যা প্রত্যাশিত। আলী আকবর তানভীর কীভাবে ছাত্রলীগের কমিটিতে স্থান পেলেন, তাঁর রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা কতটুকু এবং পদত্যাগের দাবি বাস্তবে কার্যকর হয়েছে কি না- এসব প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য উত্তরই পারে বিতর্কের অবসান ঘটাতে।

শেষ পর্যন্ত বিষয়টি শুধু একজনের রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা একটি কমিটিতে পদ পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্য, অবস্থান ও বাস্তব কর্মকাণ্ডের মধ্যে সামঞ্জস্য কতটা রয়েছে, সেই প্রশ্নও সামনে আনে। ‘পাগলেও বিশ্বাস করবে না’- এমন দৃঢ় বক্তব্য দিয়ে বিতর্ক থামানোর চেষ্টা করা যেতে পারে, কিন্তু জনমনে ওঠা প্রশ্নের জবাব দিতে প্রয়োজন তথ্য, প্রমাণ ও স্বচ্ছতা।

কিশোরগঞ্জের মানুষও নিশ্চয়ই জানতে চাইবে, আলোচিত এই ঘটনার প্রকৃত সত্য কী। অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা যেমন অনুচিত, তেমনি প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে সবকিছুকে অবিশ্বাস্য বলে উড়িয়ে দেওয়াও দায়িত্বশীল রাজনৈতিক আচরণ হতে পারে না।