ইশরাকের পদত্যাগে আলোচনায় মন্ত্রিসভা থেকে বিদায়ের ইতিহাস
রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় মাদকবিরোধী অভিযানে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে অংশ নিয়ে বিতর্কের মুখে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর পদ ছেড়েছেন ইশরাক হোসেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে পদত্যাগের কথা জানিয়ে তিনি বলেছেন, বিএনপি ও সরকারকে ‘বিব্রতকর’ পরিস্থিতি থেকে বাঁচাতেই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে অভিযানে কোনো ভুল করেননি বলেও দাবি করেছেন তিনি।
ইশরাকের পদত্যাগের ঘটনা রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে বর্তমান বিএনপি সরকারের মন্ত্রিসভা থেকে তিনজন সদস্য বাদ পড়লেন। গত ফেব্রুয়ারিতে তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠনের পর তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়া জহির উদ্দিন স্বপনকে গত ২২ আগস্ট মন্ত্রিসভা থেকে সরিয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা করা হয়। আর দায়িত্ব নেওয়ার তিন মাসের মাথায় গত ১ জুন শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেন পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান।
ইশরাকের পদত্যাগ নতুন করে সামনে এনেছে বাংলাদেশের মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ ও অপসারণের ইতিহাস। প্রথম আলোর পর্যালোচনায় দেখা যায়, স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে প্রায় তিন ডজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর পদত্যাগ ও মন্ত্রিসভা থেকে বাদ পড়ার নজির রয়েছে। তবে প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে অভিযানে অংশ নেওয়াকে কেন্দ্র করে মন্ত্রিত্ব ছাড়ার ঘটনা আগে দেখা যায়নি। সে দিক থেকে ইশরাকের পদত্যাগ ব্যতিক্রম।
২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের শাসনামলে পাঁচজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর পদত্যাগ বা মন্ত্রিসভা থেকে অপসারণের ঘটনা ঘটে।
২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পাঁচ মাসের মাথায় ৩১ মে পদত্যাগ করেন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের ছেলে তানজিম আহমেদ সোহেল তাজ। পরে বিভিন্ন সময়ে তিনি বলেন, মন্ত্রণালয়ে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছিলেন না। সরকারের ভেতরের প্রভাবশালী গোষ্ঠী তাঁর সংস্কারমূলক কাজে বাধা দিচ্ছিল। নামমাত্র মন্ত্রী হয়ে থাকতে চাননি বলেও জানিয়েছিলেন তিনি।
২০১২ সালের এপ্রিলে তৎকালীন রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) ও রেলের দুজন কর্মকর্তাকে নিয়ে বিপুল পরিমাণ টাকাসহ একটি গাড়ি বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদর দপ্তরে ঢুকে পড়ে। এ ঘটনায় আটক তিনজন দাবি করেন, তাঁরা ওই টাকা নিয়ে রেলমন্ত্রীর বাড়িতে যাচ্ছিলেন। সমালোচনার মুখে ১৬ এপ্রিল সংবাদ সম্মেলন করে পদত্যাগের ঘোষণা দেন সুরঞ্জিত। তবে প্রধানমন্ত্রী তাঁর পদত্যাগপত্র সরাসরি গ্রহণ না করে তাঁকে দপ্তরবিহীন মন্ত্রী হিসেবে রাখেন। পরে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্তে তিনি অভিযোগ থেকে দায়মুক্তি পান।
একই বছর পদ্মা সেতু প্রকল্পে পরামর্শক নিয়োগ নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগে তৎকালীন যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনের নাম আলোচনায় আসে। কানাডীয় প্রতিষ্ঠান এসএনসি-লাভালিনের কাছ থেকে ঘুষ লেনদেনের ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলে বিশ্বব্যাংক প্রকল্পে অর্থায়ন বাতিল করে। বিশ্বব্যাংককে অর্থায়নে ফেরানোর উদ্যোগের অংশ হিসেবে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ২০১২ সালের ২৩ জুলাই পদত্যাগ করেন আবুল হোসেন। তবে দুদকের তদন্তে দুর্নীতির প্রমাণ মেলেনি। ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে কানাডার আদালতেও এ-সংক্রান্ত মামলা খারিজ হয়। এর আগে ১৯৯৭ সালেও প্রতিমন্ত্রীর পদ ছাড়তে হয়েছিল তাঁকে।
২০১৪ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে এক অনুষ্ঠানে হজ, তাবলিগ জামাত ও প্রধানমন্ত্রীর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়কে নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করেন তৎকালীন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী। তাঁর বক্তব্যের প্রতিবাদে বিভিন্ন মহলে আন্দোলনের হুমকি এলে ১২ অক্টোবর তাঁকে মন্ত্রিসভা থেকে অপসারণ করা হয়।
২০২১ সালের ডিসেম্বরে তৎকালীন তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মুরাদ হাসানের একাধিক মন্তব্য ও ফোনালাপের অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক সমালোচনা হয়। এসব বিতর্কের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ৮ ডিসেম্বর পদত্যাগ করেন তিনি।
বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের সময় বাজার পরিস্থিতি ও দুর্নীতির অভিযোগের মুখে দুজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীকে পদ ছাড়তে হয়।
২০০৩-০৪ সালের দিকে চাল, ডাল, ভোজ্যতেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়। সে সময় বাণিজ্যমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের দ্বন্দ্বও প্রকাশ্যে আসে। এমন পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নির্দেশে ২০০৪ সালের মার্চে মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন আমির খসরু।
২০০৫ সালের ১৪ জুন প্রথম আলোতে ‘প্রতিমন্ত্রীর জন্য নাইকোর কোটি টাকার গাড়ি’ শিরোনামে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, কানাডীয় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানকারী প্রতিষ্ঠান নাইকোর কাছ থেকে প্রায় ৯০ লাখ টাকা মূল্যের একটি টয়োটা ল্যান্ড ক্রুজার উপহার নিয়েছেন জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী এ কে এম মোশাররফ হোসেন। পরবর্তী কয়েক দিন এ নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিমন্ত্রী তখন উত্তর আমেরিকা সফরে ছিলেন। সফর শেষে ১৮ জুন দেশে ফিরে ওই দিন বিকেলেই পদত্যাগ করেন তিনি। নিজের এমন পরিণতির জন্য সাংবাদিকদের দায়ী করেছিলেন মোশাররফ।
বিদ্যুৎ-সংকটের সময় অবশ্য পদত্যাগ নয়, দপ্তর বদলের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছিল সরকার। ২০০৫ ও ২০০৬ সালে তীব্র বিদ্যুৎ-সংকটে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। প্রতিবাদে বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলন হয়; পুলিশের গুলিতে কয়েকজন নিহতও হন। চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জের কানসাটে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় চাপের মুখে পড়ে সরকার। পরে ২০০৬ সালের ১৩ মার্চ বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুকে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে মেয়াদের শেষ দিকে থাকা জোট সরকার।
১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি সরকার এবং ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় পাঁচজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর পদত্যাগের ঘটনা ঘটে।
১৯৯২-৯৩ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রবর্তনের দাবিতে বিরোধী দলগুলোর আন্দোলনের সময় বিএনপি সরকার এ ব্যবস্থার বিরোধিতা করছিল। এর মধ্যে তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী নাজমুল হুদা তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা চালু বা বিবেচনার পক্ষে মত দেন। মন্ত্রী হয়েও সরকারের নীতির বাইরে বক্তব্য দেওয়ায় প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নির্দেশে ১৯৯৩ সালের জানুয়ারিতে পদত্যাগ করেন তিনি।
১৯৯৫ সালের শুরুতে বোরো মৌসুমে সারের সংকট দেখা দিলে কৃষকেরা আন্দোলনে নামেন। ওই বছরের মার্চে বিভিন্ন জেলায় পুলিশের গুলিতে কয়েকজন কৃষক নিহত হন। এ ঘটনার পর পদত্যাগ করতে হয়েছিল তৎকালীন শিল্পমন্ত্রী জহিরউদ্দিন খানকে।
এরপর আওয়ামী লীগ সরকারের সময় পদত্যাগে বাধ্য হন মেজর (অব.) রফিকুল ইসলাম, সৈয়দ আবুল হোসেন ও প্রতিমন্ত্রী আফসারউদ্দিন আহমদ।
১৯৯৯ সালের মার্চে যশোরে উদীচীর জাতীয় সম্মেলনে বোমা হামলার পর তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মেজর (অব.) রফিকুল ইসলাম হামলায় ব্যবহৃত গ্রেনেড নিয়ে মন্তব্য করে বিতর্কে পড়েন। এ বক্তব্যের পর তাঁকে মন্ত্রিত্ব ছাড়তে হয়।
এ সরকারে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী ছিলেন দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের ছোট ভাই আফসার উদ্দিন আহমদ। ১৯৯৬ সালের শেষ ও ১৯৯৭ সালের শুরুর দিকে ঢাকায় কয়েকটি বড় বস্তিতে বিকল্প পুনর্বাসনের ব্যবস্থা ছাড়াই উচ্ছেদ অভিযান চালায় গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। এর মধ্যে বিদেশ সফরে যান আফসার উদ্দিন। দেশে ফেরার পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁকে ডেকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন। পরে তিনি পদত্যাগ করেন।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনের বিরুদ্ধে সরকারি দায়িত্বে ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত কূটনৈতিক পাসপোর্টের পাশাপাশি সবুজ পাসপোর্ট গোপনে রেখে তা দিয়ে বিদেশ ভ্রমণের অভিযোগ ওঠে। গণমাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশিত হলে সমালোচনার মুখে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ১৯৯৭ সালের সেপ্টেম্বরে পদত্যাগ করেন তিনি।
১৯৮২ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনামলে মন্ত্রিসভায় বারবার রদবদল হয়। এমনকি প্রধানমন্ত্রী পদেও একাধিকবার পরিবর্তন আনেন তিনি।
সে সময় অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছিলেন আমলা ও অর্থনীতিবিদ আবুল মাল আবদুল মুহিত। অর্থনীতি পরিচালনা ও বাজেট বরাদ্দসহ বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্যের কারণে ১৯৮৪ সালের ৯ জানুয়ারি তিনি মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। একই বছরের মার্চে প্রধানমন্ত্রী হন আতাউর রহমান খান। এরশাদের সঙ্গে মতবিরোধের কারণে নয় মাসের মাথায় তিনিও পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।
১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি সরকারের শিক্ষা উপদেষ্টা আবদুল মজিদ খানের প্রস্তাবিত শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে ছাত্র আন্দোলনে পুলিশ ও যৌথবাহিনীর গুলিতে শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার পর জনরোষ তৈরি হয়। এরশাদ সরকার শিক্ষানীতি স্থগিত করতে বাধ্য হয়। ওই বছরের শেষ দিকে আবদুল মজিদ খানকে শিক্ষামন্ত্রী করা হয়। পরে ১৯৮৪ সালের জুনে তাঁকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে পরিকল্পনামন্ত্রী করা হয়। পরের বছর মন্ত্রিসভা থেকে সরিয়ে রাষ্ট্রদূত হিসেবে তাঁকে বিদেশে পাঠানো হয়।
১৯৮৬ সালের মে মাসে এরশাদের মন্ত্রিসভায় যোগ দেওয়া সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীকে ১৯৮৮ সালের জানুয়ারিতে বাদ দেওয়া হয়। সে সময় ঢাকার মার্কিন দূতাবাস থেকে পাঠানো এক তারবার্তায় তাঁর ব্যক্তিত্ব ও একক সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা নিয়ে সহকর্মীদের অসন্তোষের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।
মিজানুর রহমান চৌধুরী ১৯৮৬ সালের জুলাইয়ে এরশাদ সরকারের প্রধানমন্ত্রী হন। ১৯৮৮ সালের মার্চে তিনিও পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। তৎকালীন বিভিন্ন প্রতিবেদন ও নথিতে বলা হয়, ১৯৮৮ সালের ৩ মার্চের বিতর্কিত সংসদ নির্বাচনের পর বিরোধী দলের চাপ সামলানো এবং প্রশাসন পুনর্গঠনের কৌশলের অংশ হিসেবে তাঁকে সরানো হয়েছিল।
এরপর প্রধানমন্ত্রী হন মওদুদ আহমদ। ১৯৮৯ সালের আগস্টে তাঁকে উপরাষ্ট্রপতি করা হলে প্রধানমন্ত্রী হন কাজী জাফর আহমদ। সে সময়ের মার্কিন নথিতে মওদুদকে সরিয়ে মন্ত্রণালয়ের ওপর এরশাদের নিয়ন্ত্রণ জোরদার এবং জাতীয় পার্টির কট্টরপন্থী অংশকে সন্তুষ্ট করার কৌশলের কথা উঠে আসে।
১৯৯০ সালের মার্চে এরশাদের মন্ত্রিসভা থেকে পরিকল্পনামন্ত্রী এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) এ কে খন্দকার পদত্যাগ করেন। সে সময়ের মার্কিন নথিতে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতি, আর্থিক বিশৃঙ্খলা এবং বিরোধী আন্দোলন দমনে সরকারের কঠোর অবস্থানের কারণে তাঁর অস্বস্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।
স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ও মন্ত্রীদের পদত্যাগের ঘটনা ঘটে। ১৯৭৩ সালে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মিজানুর রহমান চৌধুরীর পদত্যাগ ছিল আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি।
মিজানুর রহমান চৌধুরী বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির চেয়ারম্যানও ছিলেন। রেড ক্রিসেন্টের মাধ্যমে আসা ত্রাণসামগ্রী সাধারণ মানুষের কাছে না পৌঁছে বাজারে বিক্রি ও বিদেশে পাচার হওয়ার অভিযোগ নিয়ে সে সময় সংবাদমাধ্যমে লেখালেখি হয়। অভিযোগে মিজানুর রহমান চৌধুরী ও তাঁর ঘনিষ্ঠজনদের নামও আসে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধু তাঁকে ডেকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন বলে বিভিন্ন বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।
এরপর আলোচিত পদত্যাগের ঘটনা ছিল অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের। মুক্তিযুদ্ধের সময় মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা তাজউদ্দীন স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর সরকারে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। বিভিন্ন নীতিগত বিষয়ে দুজনের দূরত্ব বাড়তে থাকলে ১৯৭৪ সালের ২৬ অক্টোবর বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে পদত্যাগপত্র জমা দেন তিনি।
উইকিলিকসের ফাঁস করা ১৯৭৪ সালের ৮ জুলাইয়ের একটি মার্কিন নথিতে বলা হয়, এর আগের দিন ৭ জুলাই বাংলাদেশ সরকারের ছয়জন মন্ত্রী ও তিনজন প্রতিমন্ত্রী পদত্যাগ করেন। তাঁরা হলেন মন্ত্রী শেখ আবদুল আজিজ, শামসুল হক, মোল্লা জালাল উদ্দীন আহমেদ, মতিউর রহমান, এম এ জি ওসমানী ও মফিজ চৌধুরী এবং প্রতিমন্ত্রী আমিরুল ইসলাম, নূরজাহান মুর্শিদ ও আবদুল মালেক খান।
নথিতে এসব পদত্যাগের পেছনে কোনো একক কারণ বা ধারাবাহিক ধরন পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়। তবে মতিউর রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ছিল, আর ওসমানী কয়েক মাস ধরে অসুস্থ ছিলেন বলে জানা যায়।
এ ছাড়া প্রয়াত সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলেও মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগের নজির রয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী কাজী জাফর আহমদ বিএনপি প্রতিষ্ঠার পর দল ও সরকারে ডানপন্থী ধারার প্রভাব বাড়ার বিরোধিতা করে ১৯৭৮ সালের ১১ অক্টোবর পদত্যাগ করেন।
মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের পদত্যাগের পেছনে বিভিন্ন সময়ে দুর্নীতির অভিযোগ, বিতর্কিত বক্তব্য, নীতিগত মতবিরোধ ও রাজনৈতিক চাপ কাজ করেছে। কারও পদত্যাগের ঘোষণা গ্রহণ করা হয়নি, কাউকে মন্ত্রিসভা থেকে সরানো হয়েছে, আবার কারও দায়িত্ব বদলেছে। এসব ঘটনার ধারাবাহিকতায় ইশরাক হোসেনের পদত্যাগের বিশেষ দিক হলো, মাদকবিরোধী অভিযানে প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে অংশ নেওয়ার ঘটনা ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক। তাঁর পদত্যাগের মধ্য দিয়ে মন্ত্রিসভার সদস্যদের আচরণ ও রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার প্রশ্নটি আবার সামনে এসেছে।










Disqus comments are not configured yet.