ফাঁসির সেল থেকে জাতীয় সংসদে: অভাবনীয় প্রত্যাবর্তন
দীর্ঘদিন কারাগারের ফাঁসির সেলে কাটানোর পর সেখান থেকে মুক্ত হয়ে জাতীয় সংসদে যাচ্ছেন তিন প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা। তারা হলেন বিএনপি নেতা ও সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. লুৎফুজ্জামান বাবর, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুস সালাম পিন্টু এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতা এটিএম আজহারুল ইসলাম।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিজ নিজ আসনে বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছেন তারা। পৃথক মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে দীর্ঘদিন কারাবন্দি থাকা এসব নেতা ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর আদালতে আবেদন করে খালাস পান।
লুৎফুজ্জামান বাবরঃ
নেত্রকোনা-৪ (মোহনগঞ্জ–মদন–খালিয়াজুরি) আসনে বিএনপির প্রার্থী মো. লুৎফুজ্জামান বাবর বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছেন। তিনি নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে ১ লাখ ২০ হাজার ৯৬১ ভোট বেশি পেয়ে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হন।
লুৎফুজ্জামান বাবরের গ্রামের বাড়ি মদন উপজেলার বাড়িবাদেরা এলাকায়। তিনি এর আগে তিনবার এই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৭ বছরের বেশি সময় তিনি কারাগারে ছিলেন।
২০০৪ সালের ১ এপ্রিল চট্টগ্রামের সিইউএফএল ঘাট থেকে ১০ ট্রাক অস্ত্র জব্দের ঘটনায় দায়ের করা অস্ত্র ও বিশেষ ক্ষমতা আইনের মামলায় ২০১৪ সালের ৩০ জানুয়ারি চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালত ও বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-১ বাবরসহ ১৪ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেন। অন্য একটি মামলায় তিনি যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত হন। পরে সব মামলায় খালাস পাওয়ার পর গত বছরের জানুয়ারিতে কারামুক্ত হন তিনি।
১৯৯১ সালে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন বাবর। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
আবদুস সালাম পিন্টুঃ
টাঙ্গাইল-২ (গোপালপুর–ভূঞাপুর) আসন থেকে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুস সালাম পিন্টু নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি জেলার আটটি আসনের ৪৭ জন প্রার্থীর মধ্যে সর্বোচ্চ ভোট পেয়েছেন এবং সবচেয়ে বড় ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন।
পিন্টু পেয়েছেন ১ লাখ ৯৮ হাজার ২১৩ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হুমায়ুন কবীর পেয়েছেন ৬০ হাজার ৮৭১ ভোট।
টাঙ্গাইল জেলা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক আবদুস সালাম পিন্টু ১৯৯১ সালে প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনেও তিনি বিজয়ী হন। ২০০১ সালে খালেদা জিয়ার মন্ত্রিসভায় তিনি উপমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
২০০৮ সালের জানুয়ারিতে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় গ্রেফতার হন পিন্টু। ওই মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে দীর্ঘ ১৭ বছর কারাভোগের পর ২০২৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর উচ্চ আদালত থেকে খালাস পান তিনি।
কারাবন্দি অবস্থায় তাঁর অনুপস্থিতিতে ছোট ভাই সুলতান সালাউদ্দিন টুকু টাঙ্গাইল-২ আসনে বিএনপির সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করেন। দলের নেতারা বলছেন, দুই ভাইয়ের দীর্ঘ ত্যাগেরই প্রতিফলন এই নির্বাচনী ফলাফল।
এটিএম আজহারুল ইসলামঃ
রংপুর-২ (তারাগঞ্জ–বদরগঞ্জ) আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী এটিএম আজহারুল ইসলাম বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। আসনটির ১৩৭টি কেন্দ্রে তিনি দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে পেয়েছেন ১ লাখ ৩৯ হাজার ৬৮০ ভোট।
তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির মোহাম্মদ আলী সরকার পেয়েছেন ৭৯ হাজার ৯১০ ভোট।
জামায়াতে ইসলামীর সাবেক ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম আজহারুল ইসলামকে ২০১২ সালের ২২ আগস্ট মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়। ২০১৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন।
গত বছরের ২৭ মে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ মৃত্যুদণ্ড থেকে খালাস দিয়ে রায় ঘোষণা করেন। প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে সাত বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ এই রায় দেন। পরদিন ২৮ মে কারাগার থেকে মুক্তি পান তিনি।







