দেড়যুগ ধরে স্কুল-ইউনিয়ন পরিষদ চত্বরে গরুর হাট, ব্যাহত শিক্ষা কার্যক্রম ও নাগরিক সেবা
দেড়যুগ ধরে কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার জারইতলা ইউনিয়নের ইউনিয়ন পরিষদ চত্বর ও আঠারোবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে নিয়মিত গরু-ছাগলের হাট বসছে। এতে বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি ইউনিয়ন পরিষদে নাগরিক সেবা প্রদানেও সৃষ্টি হচ্ছে চরম প্রতিবন্ধকতা। পাশাপাশি সড়কে তৈরি হচ্ছে ভয়াবহ যানজট, বাড়ছে জনদুর্ভোগ।
ইউনিয়ন পরিষদের চত্বর ও বিদ্যালয়ের মাঠে সারি সারি গরু-ছাগল, ক্রেতা-বিক্রেতার ভিড় এবং পশুর হাঁকডাকে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। হাট বসার দিন বিদ্যালয়ে নামমাত্র পাঠদান চলে। একইসঙ্গে ইউনিয়ন পরিষদে সেবা গ্রহণের ন্যূনতম পরিবেশও থাকে না।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০০৯ সাল থেকে প্রতি বুধবার জারইতলা ইউনিয়নের ইউনিয়ন পরিষদ চত্বর ও আঠারোবাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে নিয়মিত এই হাট বসছে। শুরুতে গোপী রায়ের বাজার নামে প্রায় ৩৬ শতাংশ ইজারাকৃত জমি এবং কিছু ব্যক্তি মালিকানাধীন জমিতে হাট বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও পরে জোরপূর্বক বিদ্যালয় ও ইউনিয়ন পরিষদের মাঠেই হাট বসানো শুরু হয়। বর্তমানে এটি জেলার অন্যতম বড় গরুর হাটে পরিণত হয়েছে।
হাটের দিন বিদ্যালয়টি নামমাত্র খোলা থাকলেও ইউনিয়ন পরিষদের প্রায় সব নাগরিক সেবা বন্ধ থাকে বলে সরেজমিনে দেখা গেছে। পরিষদের কক্ষগুলোর দরজায় তালা ঝুলতে দেখা যায়।
বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী জানায়, বুধবার হাট বসার কারণে শ্রেণিকক্ষে মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করা কঠিন হয়ে পড়ে। হাট শেষে পুরো মাঠ গোবর ও মলমূত্রে ভরে যায়, ফলে খেলাধুলা তো দূরের কথা, স্বাভাবিক চলাচলও কষ্টকর হয়ে ওঠে। বিদ্যালয়ের মূল ফটক দখল করে গরু বেঁধে রাখায় আতঙ্কে থাকতে হয় বলেও অভিযোগ করে তারা।
নিকলী–বাজিতপুর আঞ্চলিক সড়কসংলগ্ন সাজনপুর গরুর হাটে প্রবেশের জন্য সড়কের দুই পাশে গরুবাহী ট্রাক ও পিকআপ দাঁড়িয়ে থাকে। ফলে প্রতি বুধবার সকাল থেকে রাত পর্যন্ত নিকলী, বাজিতপুর, ভৈরব ও কটিয়াদি সড়কে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। এতে কিশোরগঞ্জ জেলা সদরসহ আশপাশের এলাকায় যাতায়াতে মারাত্মক দুর্ভোগ পোহাতে হয়। এমনকি পাশের জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালের রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্সও সময়মতো চলাচল করতে পারে না।
নিকলী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অ্যাম্বুলেন্স চালক মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, “বুধবার হাটের দিন আধা কিলোমিটার এলাকায় ভয়াবহ যানজট থাকে। জরুরি রোগী নিয়ে যাতায়াতে অনেক সময় লাগে, এতে রোগীর জীবন ঝুঁকিতে পড়ে।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, হাট বসানোর ফলে ইউনিয়ন পরিষদের সেবা কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। সরেজমিনে দেখা গেছে, হাটের দিন ইউনিয়ন পরিষদের সব কক্ষ বন্ধ ছিল।
এ বিষয়ে জারইতলা ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান মো. ইসহাক রানা বলেন, “হাটের দিন সাধারণ মানুষ কম আসে। গরু এলোপাতাড়ি দৌড়ানোর কারণে অনেকে ভয়ে পরিষদে আসেন না। তবে উদ্যোক্তারা দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত পরিষদে ছিলেন।”
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক জোবেদা বেগম বলেন, “হাটের দিন শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কম থাকে। এতে শিক্ষার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে এ বিষয়ে কোনো অভিভাবক লিখিত অভিযোগ করেননি।”
একজন শিক্ষক (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) জানান, হাটের দিন মেয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমে যায়। অনেক সময় ক্রেতা-বিক্রেতাদের কুরুচিপূর্ণ আচরণ ও ইভটিজিংয়ের শিকার হয় শিক্ষার্থীরা।
নিকলী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবু সিদ্দিক বলেন, “বুধবার হাটের দিন সরেজমিনে পরিদর্শন করে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে মাসিক আইনশৃঙ্খলা কমিটির কাছে প্রতিবেদন দেওয়া হবে।”
হাটের ইজারাদার জমশেদ আলী বলেন, “সরকারি বিধি অনুযায়ী হাট পরিচালিত হচ্ছে। ইজারাকৃত ও ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি রয়েছে। বিদ্যালয় ও ইউনিয়ন পরিষদে প্রবেশের জন্য বিকল্প পথ আছে।”
তিনি আরও দাবি করেন, কিছু লোক অর্থনৈতিক সুবিধার জন্য উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সংবাদ প্রকাশ করছে।
নিকলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোছা. রেহানা মজুমদার মুক্তি বলেন, “বিষয়টি সম্পর্কে আগে অবগত ছিলাম না। এখন জেনেছি। তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”




