বছরের পর বছর ধরে অর্থ পাচারের ফলে দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা ‘ফোকলা’ হয়ে পড়েছে এবং বেসরকারি খাত তীব্র তারল্য সংকটে ধুঁকছে—এমন মন্তব্য করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় আগামী দুই বছরের জন্য বাংলাদেশের একটি আর্থিক ‘কুশন’ প্রয়োজন, যার মাধ্যমে ব্যাংক ও বেসরকারি খাতের মূলধন ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হবে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ও বিশ্ব ব্যাংক-এর বসন্তকালীন সভা উপলক্ষে আটলান্টিক কাউন্সিল-এর এক বিশেষ আয়োজনে প্রচারিত সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, “বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত আর্থিক খাতকে স্থিতিশীল করা এবং বেসরকারি খাতকে পুনরুজ্জীবিত করা।” তিনি দাবি করেন, আগের সরকারের আমলে ব্যাপক আর্থিক ‘লুটপাট’ ও অর্থ পাচারের ফলে দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়েছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমান সরকার যে অর্থনীতি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে, তা কার্যত স্থবির অবস্থায় রয়েছে। পুঁজিবাজার অত্যন্ত নাজুক এবং দেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ ২০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বাজারে মূলধন ও চলতি মূলধনের ‘তীব্র সংকট’ তৈরি হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর ফলে বেসরকারি খাতকে এখন প্রায় অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই করতে হচ্ছে। “বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সব সময় বেসরকারি খাতনির্ভর। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় এই খাতকে আগে উদ্ধার করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ,” বলেন তিনি।
অর্থমন্ত্রী আরও জানান, দেশের অনেক ব্যাংকই এখন প্রায় দেউলিয়া অবস্থায় রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলোকে দ্রুত নতুন মূলধন জোগান দেওয়ার ওপর সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে।
বেসরকারি খাতে মূলধন ঘাটতির জন্য অতীত সরকারের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাকে দায়ী করে তিনি বলেন, “অতীতে অর্থনীতি গুটিকয়েক গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে ছিল, যা সাধারণ উদ্যোক্তাদের জন্য বাজারভিত্তিক অর্থনীতিতে টিকে থাকা কঠিন করে তোলে।”
তিনি আরও বলেন, ওই পরিস্থিতির কারণে দেশের মুদ্রার মান প্রায় ৪০ শতাংশ কমেছে এবং মূল্যস্ফীতির চাপে প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা আরও কমেছে। সব মিলিয়ে বেসরকারি খাতের প্রায় ৫০ শতাংশ মূলধন ও চলতি মূলধন কার্যত বিলীন হয়ে গেছে।
এর ফলে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান টিকে থাকলেও তাদের উৎপাদন সক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমে গেছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ৩০ থেকে ৪০ শতাংশে নেমে এসেছে বলে জানান তিনি।
অর্থমন্ত্রী বলেন, এই মন্দার কারণে কোম্পানিগুলো লোকসানে চলছে এবং মূলধন ভেঙে টিকে থাকার চেষ্টা করছে। একদিকে মুদ্রার অবমূল্যায়ন ও মূল্যস্ফীতি মূলধন কমিয়ে দিচ্ছে, অন্যদিকে পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাবে ব্যবসাগুলো আরও ক্ষতির মুখে পড়ছে। “অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি যারা, তারাই এখন সবচেয়ে বেশি দুর্দশায়,” যোগ করেন তিনি।
এই সংকট মোকাবিলার বিষয়টি আইএমএফ ও বিশ্ব ব্যাংকের সঙ্গে বৈঠকেও গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরা হয়েছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, “সংস্কারের ক্ষেত্রে প্রথম পদক্ষেপ হওয়া উচিত বেসরকারি খাত ও ব্যাংকিং খাতে মূলধন জোগান দেওয়া। এর আগে অন্য কোনো সংস্কার কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না।”
প্রসঙ্গত, ২০২৩ সালে আইএমএফের কাছ থেকে বাংলাদেশ ৪৭০ কোটি ডলারের ঋণ অনুমোদন পায়, যার মধ্যে পাঁচ কিস্তিতে ৩৬৪ কোটি ডলার ইতোমধ্যে ছাড় করা হয়েছে। ষষ্ঠ কিস্তির ১৩০ কোটি ডলার ছাড় হওয়ার কথা থাকলেও শর্ত পূরণে অগ্রগতি না হওয়ায় তা বিলম্বিত হয়েছে।
অন্যদিকে, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা, আসন্ন বাজেট এবং বৈশ্বিক সংঘাতের প্রভাব মোকাবিলায় বাজেট সহায়তা হিসেবে অন্তত ৩০০ কোটি মার্কিন ডলার সহায়তার প্রয়োজন রয়েছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। এ বিষয়েও চলমান আইএমএফ-বিশ্ব ব্যাংক বৈঠকে আলোচনা হচ্ছে।
আইএমএফের শর্ত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশের কর-জিডিপি অনুপাত উদ্বেগজনকভাবে কমে গেছে। এটি ১১ শতাংশ থেকে নেমে এখন ৭ শতাংশের নিচে অবস্থান করছে। তবে ব্যবসা-বাণিজ্য পুনরুজ্জীবিত না হলে কর-জিডিপি বাড়ানো সম্ভব নয় বলেও তিনি মত দেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, “আমরা আইএমএফ ও বিশ্ব ব্যাংককে জানিয়েছি—প্রথমে ব্যবসা-বাণিজ্য ঘুরে দাঁড়াতে হবে, তারপর কর-জিডিপি বাড়ানোর বিষয়টি আসবে। আর এটি সময়সাপেক্ষ।”
সবশেষে তিনি বলেন, “এই মুহূর্তে বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আগামী দুই বছরের জন্য একটি কার্যকর আর্থিক ‘কুশন’, যার মাধ্যমে ব্যাংক ও বেসরকারি খাতের মূলধন ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হবে।”