প্যারোলে মুক্তি না দিয়ে কারাফটকে মরদেহ দেখানো মানবাধিকার লঙ্ঘন: আসক
যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি বাগেরহাট সদর উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি জুয়েল হাসান সাদ্দামকে আবেদন সত্ত্বেও প্যারোলে মুক্তি না দিয়ে কারাফটকে তার স্ত্রী ও নয় মাসের শিশুসন্তানের মরদেহ দেখানো সংবিধান ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে মন্তব্য করেছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)।
সংস্থাটির চেয়ারপারসন জেড আই খান পান্নার বিবৃতিতে বলা হয়, সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সব নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং সমান আইনি সুরক্ষার অধিকারী। অনুচ্ছেদ ৩১ নাগরিককে আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার দেয়। আর অনুচ্ছেদ ৩৫(৫) অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তিকে নিষ্ঠুর, অমানবিক বা অবমাননাকর দণ্ড বা আচরণের শিকার করা যাবে না।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, একজন বিচারাধীন বন্দি হিসেবে জুয়েল হাসান সাদ্দাম এসব সাংবিধানিক সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত নন। অথচ স্ত্রী ও শিশুসন্তানের মৃত্যুর মতো চরম মানবিক পরিস্থিতিতে পরিবারের আবেদন থাকা সত্ত্বেও তাকে প্যারোলে মুক্তি না দেওয়া এবং জানাজা ও দাফনে অংশগ্রহণের সুযোগ না দেওয়া কার্যত তাকে অমানবিক ও অবমাননাকর আচরণের শিকার করেছে। এটি সংবিধানের ৩৫(৫) অনুচ্ছেদের সরাসরি ব্যত্যয়।
আসক জানায়, প্যারোলে মুক্তির বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২০১৬ সালের ১ জুন একটি নীতিমালা প্রণয়ন করে। ওই নীতিমালা অনুযায়ী, ভিআইপি বা অন্যান্য শ্রেণির কয়েদি ও হাজতির নিকটাত্মীয়—যেমন বাবা-মা, শ্বশুর-শাশুড়ি, স্বামী-স্ত্রী, সন্তান কিংবা ভাই-বোনের মৃত্যু হলে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য প্যারোলে মুক্তি দেওয়া যেতে পারে। যদিও বিষয়টি প্রশাসনিক বিবেচনার ওপর নির্ভরশীল, তবে তা ইচ্ছামতো বা কোনো কারণ না জানিয়ে প্রত্যাখ্যান করা যায় না। পরিবার আবেদন জানানো সত্ত্বেও বিধানটি প্রয়োগ না হওয়া আইনের উদ্দেশ্য ও ন্যায্য প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার পরিপন্থী বলে মনে করছে সংস্থাটি।
বিবৃতিতে বলা হয়, আন্তর্জাতিক আইনেও বিচারাধীন বন্দিদের প্যারোল সংক্রান্ত অধিকার সুরক্ষিত। আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদ (আইসিসিপিআর)-এর বিভিন্ন ধারায় এ বিষয়ে উল্লেখ রয়েছে। কারাফটকে মাত্র কয়েক মিনিটের জন্য মৃত স্ত্রী ও শিশুসন্তানের মুখ দেখিয়ে একজন শোকাহত বন্দিকে জানাজা ও দাফনে অংশ নিতে না দেওয়া আইসিসিপিআরের সঙ্গেও অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
আসক আরও বলেছে, কোন আইন, বিধি বা নির্বাহী আদেশের ভিত্তিতে আবেদন থাকা সত্ত্বেও প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয়নি—তা জানার অধিকার জনগণের রয়েছে। আইনের শাসন কেবল সিদ্ধান্ত গ্রহণেই সীমাবদ্ধ নয়; সিদ্ধান্তের কারণ প্রকাশ এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করাও এর অপরিহার্য অংশ। এ ক্ষেত্রে কারা কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের নীরবতা প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচার ও বৈষম্যের গুরুতর প্রশ্ন সৃষ্টি করেছে। এই ঘটনা সংবিধানস্বীকৃত গণতান্ত্রিক ও মানবাধিকারসম্মত রাষ্ট্রব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলেও উল্লেখ করেছে সংস্থাটি।
সংস্থাটি বলেছে, সাদ্দামকে প্যারোলে মুক্তি না দেওয়ার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্পষ্ট ব্যাখ্যা ও জবাবদিহি জরুরি। পাশাপাশি উচ্চ আদালতের স্বপ্রণোদিত পদক্ষেপ নেওয়ারও সুযোগ রয়েছে।
এদিকে, সাদ্দামকে প্যারোলে মুক্তি না দেওয়ায় তীব্র নিন্দা, ক্ষোভ ও গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ)। সংস্থাটি ঘটনার নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও দ্রুত তদন্তের দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পরিবারকে প্রয়োজনীয় মানসিক, সামাজিক ও আইনি সহায়তা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে এমএসএফ।







