তেলের পাম্পে ‘তেল নেই’ ঘোষণা: যুদ্ধের ছায়া, নাকি কৃত্রিম সংকট?
প্রতীকী ছবি
রাজধানী ঢাকার রাজপথে গতকাল এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের ছবি ফুটে উঠেছে। একদিকে সরকারের নীতিনির্ধারক ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তাদের আশ্বাস—‘তেলের কোনো অভাব নেই, মজুত পর্যাপ্ত’; অন্যদিকে সাধারণ মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতা—‘পাম্পে তালা, মাইকে তেল নেই ঘোষণা’। মধ্যপ্রাচ্যের ইরান–ইসরায়েল যুদ্ধের আঁচ যেন হাজার মাইল দূরের বাংলাদেশের তেলের বাজারেও এসে লেগেছে।
গতকাল সকাল থেকে ঢাকা শহরের অলিগলি ও প্রধান সড়কগুলোতে যে হাহাকার দেখা গেছে, তা কেবল তেলের সংকট নয়; বরং সাধারণ মানুষের জীবন–জীবিকার ওপর এক বড় প্রশ্নচিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শুক্রবার জুমার নামাজের পর থেকেই রাজধানীর চিত্র বদলাতে শুরু করে। বিকেলে যেখানে দীর্ঘ সারি ছিল, শনিবার সকালে সেখানে দেখা গেছে সুনসান নীরবতা কিংবা ‘তেল নেই’ লেখা সাইনবোর্ড।
অথচ গতকালই জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু এবং প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত রাজধানীর কয়েকটি ফিলিং স্টেশন পরিদর্শন করে দাবি করেন, দেশে তেলের কোনো সংকট নেই এবং আগামী সপ্তাহেই নতুন তেলের জাহাজ বন্দরে পৌঁছাবে। কিন্তু মন্ত্রীদের এই আশ্বাস মাঠপর্যায়ে তেমন কোনো স্বস্তি ফেরাতে পারেনি। বরং পাম্প মালিকদের একাংশের রহস্যময় আচরণ এবং সরবরাহ ব্যবস্থার স্থবিরতা সাধারণ মানুষকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।
রাজধানীর তেজগাঁও, সাতরাস্তা ও ধানমন্ডি এলাকার বেশ কয়েকটি ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা গেছে, প্রবেশপথ দড়ি দিয়ে আটকে রাখা হয়েছে। কর্মচারীরা অলস সময় পার করছেন।
পাম্প মালিকদের দাবি, ডিপো থেকে তেলের সরবরাহ কমে গেছে। তবে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) বলছে ভিন্ন কথা। তাদের মতে, সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলেও পাম্প মালিকদের একটি অংশ ভবিষ্যতে দাম বাড়ার আশায় তেল মজুত করে রাখছে অথবা কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে।
মগবাজারের একটি পাম্পের ব্যবস্থাপক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “গতকাল রাতেও তেলের জন্য মানুষ মারামারি করেছে। আমাদের যে পরিমাণ তেল ছিল, তা রাতেই শেষ হয়ে গেছে। নতুন করে ডিপো থেকে গাড়ি আসেনি।”
তবে সাধারণ মানুষের অভিযোগ, কিছু পাম্প পরিচিত গ্রাহকদের কাছে বা বেশি দামে গোপনে তেল বিক্রি করছে। এই অরাজকতা নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের কার্যকর কোনো নজরদারি চোখে পড়েনি বলেও অভিযোগ রয়েছে।
ইরান ও ইসরায়েলের চলমান সংঘাত বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি করলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে এর প্রভাব এখনই তেলের ‘শূন্য মজুত’ পর্যায়ে পৌঁছানোর কথা নয়। তাদের মতে, এটি মূলত একটি ‘মনস্তাত্ত্বিক সংকট’।
এই সংকটের পেছনে কয়েকটি কারণ উল্লেখ করা হচ্ছেঃ ১. প্যানিক বায়িং: অনেকেই প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তেল কিনে মজুত করছেন। ২. গুজব: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ‘তেল শেষ হয়ে যাচ্ছে’ ধরনের বার্তায় মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পাম্পে ভিড় করছেন। ৩. বাজার নিয়ন্ত্রণহীনতা: সরকারের আশ্বাসের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মিল না থাকায় মানুষের মধ্যে অনাস্থা তৈরি হয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। দ্রুত তেলের সরবরাহ নিশ্চিত করা না হলে এবং পাম্পগুলোতে তদারকি বাড়ানো না হলে এর প্রভাব সরাসরি নিত্যপণ্যের বাজারেও পড়তে পারে। পরিবহন ধর্মঘট বা ভাড়া বৃদ্ধির মতো পরিস্থিতি তৈরি হলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে।
যারা দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল, তাদের কথা বিবেচনায় রেখে সরকারকে কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরাঃ ডিপো থেকে সরবরাহ ত্বরান্বিত করা: বর্তমান মজুত থেকে দ্রুত পাম্পগুলোতে তেল পৌঁছে দেওয়া। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা: তেল থাকা সত্ত্বেও ‘নেই’ বলে বিক্রি বন্ধ রাখা পাম্পগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া। সঠিক তথ্য প্রকাশ: প্রতিদিন কোন পাম্পে কত তেল সরবরাহ হচ্ছে, তা সরকারিভাবে প্রকাশ করা।
যুদ্ধ পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তেই হোক না কেন, তার মাশুল যেন দেশের খেটে খাওয়া মানুষকে দিতে না হয়—এটাই এখন সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা।







