কিশোরগঞ্জ জেলা পরিষদের নতুন প্রশাসক ভিপি খালেদ সাইফুল্লাহ সোহেল
কিশোরগঞ্জের হাওরবেষ্টিত উপজেলা অষ্টগ্রামে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে দাঁড়িয়েছেন জেলা পরিষদের প্রশাসক খালেদ সাইফুল্লাহ সোহেল। তিনি সরেজমিনে ক্ষতিগ্রস্ত হাওর এলাকা পরিদর্শন করে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলেন এবং দ্রুত সহায়তার আশ্বাস দেন।
বুধবার (২৯ এপ্রিল) দুপুরে প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেই অষ্টগ্রাম উপজেলার সদর ইউনিয়নের বিভিন্ন হাওর এলাকা পরিদর্শন করেন তিনি। এ সময় তিনি সরাসরি কৃষকদের জমিতে গিয়ে তাদের ক্ষয়ক্ষতির চিত্র দেখেন এবং সহমর্মিতা প্রকাশ করেন।
পরিদর্শনকালে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা জানান, টানা বৃষ্টিপাত ও আকস্মিক বন্যার কারণে তাদের অধিকাংশ জমির পাকা ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। ফলে তারা পরিবার-পরিজন নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন। অনেকেই সারা বছরের খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেন।
জেলা পরিষদ প্রশাসক খালেদ সাইফুল্লাহ সোহেল কৃষকদের সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, সরকার হাওরাঞ্চলের কৃষকদের পাশে রয়েছে এবং থাকবে। তিনি উল্লেখ করেন, প্রধানমন্ত্রী হাওরাঞ্চলের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য তিন মাসের আর্থিক সহায়তার ঘোষণা দিয়েছেন। পাশাপাশি জেলা পরিষদের পক্ষ থেকেও ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য বিশেষ বরাদ্দের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, “হাওরের কৃষকরা আমাদের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাদের এই দুর্দিনে পাশে দাঁড়ানো আমাদের দায়িত্ব। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রস্তুত করে দ্রুত সহায়তা পৌঁছে দিতে আমরা কাজ করছি।”
প্রশাসকের এই মাঠপর্যায়ের উপস্থিতি ও আশ্বাসে স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে। তারা দ্রুত সরকারি সহায়তা পাওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন।
পরিদর্শনকালে উপস্থিত ছিলেন অষ্টগ্রাম উপজেলা বিএনপির সভাপতি সৈয়দ সাঈদ আহমেদ, সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সৈয়দ ফাইয়াজ হাসান বাবু, উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক নিজামুল হক নজরুল, শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন ইয়াকুব, উপজেলা যুবদলের সদস্য সচিব মো. আলী রহমান, উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক জুয়েল মিয়া, সদর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সজু মিয়াসহ স্থানীয় রাজনৈতিক ও অঙ্গসংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
অতিবৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলের কারণে কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার হাওরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ ফসলি জমি পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে। পানি বাড়তে থাকায় সময়মতো ধান কাটতে পারছেন না কৃষকরা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তীব্র শ্রমিক সংকট, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
স্থানীয় কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার প্রায় ৮০ শতাংশ ধান পেকে গেছে এবং ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশ ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে। তবে বাকি পাকা ও আধাপাকা ধান কাটতে দেরি হলে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
হাওরাঞ্চলের একমাত্র প্রধান ফসল বোরো ধান। নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে কৃষকরা প্রতি বছর এ ফসল উৎপাদন করেন। আগে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিপুল সংখ্যক শ্রমিক হাওরে ধান কাটতে এলেও বর্তমানে আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহারের কারণে সেই প্রবণতা কমে গেছে। বিগত কয়েক বছর ধরে কৃষকরা দ্রুত ও কম খরচে ধান কাটার জন্য কম্বাইন হারভেস্টারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন।
তবে চলতি মৌসুমের শুরুতেই অতিবৃষ্টি ও ভারী বর্ষণে হাওরের খাল-বিল ও নদীনালা পানিতে পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় অনেক জমিতে হারভেস্টার নামানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বাধ্য হয়ে কৃষকদের শ্রমিকের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। কিন্তু চড়া মজুরি দিয়েও শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। বর্তমানে একজন শ্রমিকের মজুরি ১,৩০০ থেকে ১,৪০০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে।
উপজেলার কারপাশা ইউনিয়নের কৃষক আদিত্য হাসান সাজন, শহরমুল গ্রামের আনোয়ার হোসেন এবং নিকলী সদরের কৃষক আব্দুল কাদিরসহ একাধিক কৃষক জানান, মৌসুমের শুরুতে কিছু ধান কাটা গেলেও হঠাৎ বৃষ্টি ও ঢলে জমি তলিয়ে যাওয়ায় এখন ধান কাটতে বড় ধরনের সংকটে পড়েছেন তারা। হারভেস্টার ব্যবহার সম্ভব না হওয়ায় শ্রমিকের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, কিন্তু প্রয়োজনীয় শ্রমিক মিলছে না।
শ্রমিকরা জানান, ঠান্ডা পানি, কাদামাটি ও ভারী বৃষ্টির কারণে ধান কাটার কাজ ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি বজ্রপাতের ঝুঁকির কারণে অনেকেই হাওরে কাজ করতে যেতে ভয় পাচ্ছেন।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার বিভিন্ন হাওরে ইতোমধ্যে প্রায় দুই হাজার একর ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। পানি আরও বাড়লে ক্ষতির পরিমাণ বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
নিকলী উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা কৃষিবিদ আব্দুস সামাদ বলেন, বৈরী আবহাওয়ার কারণে কাদা ও পানিতে হারভেস্টার ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ফলে কৃষকরা শ্রমিকনির্ভর হয়ে পড়েছেন। শ্রমিক সংকটের কারণেই ধান কাটায় দুশ্চিন্তা বাড়ছে। তিনি আরও জানান, স্থানীয় ও জেলা পর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তারা নিয়মিত হাওরাঞ্চলের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন।
টানা ভারী বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসের শেষ সপ্তাহে ঘটে যাওয়া এই অকাল বন্যায় কৃষকের কষ্টে ফলানো সোনালী বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে, ফলে স্বপ্নভঙ্গের শঙ্কায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন স্থানীয় কৃষকরা।
জেলার ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রামসহ বিভিন্ন উপজেলার বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চল ইতোমধ্যেই প্লাবিত হয়েছে। অনেক এলাকায় বোরো ধান পুরোপুরি পাকার আগেই আধাপাকা ও কাঁচা অবস্থায় তলিয়ে যাওয়ায় ক্ষতির পরিমাণ ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। কিছু এলাকায় পাকা ধানও রক্ষা করা সম্ভব হয়নি।
প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, প্রায় দুই হাজার হেক্টরেরও বেশি জমির পাকা ও আধাপাকা ধান পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। এতে বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষকেরা। অনেক কৃষক জানিয়েছেন, সারা বছরের একমাত্র আয়ের উৎস এই ফসলই এখন ধ্বংসের পথে।
নিকলীসহ হাওরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে, যেসব ধান কোনোভাবে কেটে আনা সম্ভব হচ্ছে, সেগুলোও রোদের অভাবে শুকানো যাচ্ছে না। উঠান ও রাস্তার পাশে স্তূপ করে রাখা ধান পচে যাওয়া বা অঙ্কুরিত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, যা কৃষকদের দুশ্চিন্তা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
অন্যদিকে, অনেক কৃষক চড়া সুদে ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করেছিলেন। ফসলহানির কারণে তারা এখন চরম ঋণের বোঝায় পড়ার আশঙ্কায় রয়েছেন, যা হাওর এলাকার সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কৃষকদের ভাষায়, “হাওর এখন সোনালী ধানে ভরে থাকার কথা ছিল, কিন্তু প্রকৃতির এই নিষ্ঠুর পরিণতিতে সবই পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে।”
এ অবস্থায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য জরুরি সরকারি সহায়তা, প্রণোদনা এবং হাওর রক্ষায় টেকসই ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই দুর্যোগের প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে আরও ভয়াবহ হতে পারে।