দীর্ঘ ২১ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টেনে আর্জেন্টিনা জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন ফুটবল কিংবদন্তি লিওনেল মেসি। সোমবার (৩১ আগস্ট) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা এক আবেগঘন বার্তায় ৩৯ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড জানান, জাতীয় দলের হয়ে আর মাঠে নামবেন না তিনি।
২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হারের পর থেকেই মেসির আন্তর্জাতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে জল্পনা চলছিল। তবে অবসরের সিদ্ধান্তটি যে একেবারে হঠাৎ নেওয়া নয়, তা তাঁর প্রকাশিত চিঠি থেকেই স্পষ্ট। মেসি জানিয়েছেন, বিশ্বকাপ ফাইনালের মাত্র দুই দিন পর, ২১ জুলাই তিনি অবসরের চিঠিটি লিখেছিলেন। পরে সেটি প্রকাশ না করে নিজের কাছে রেখে দেন।
অবসরের ঘোষণায় মেসি বলেন, সিদ্ধান্তটি তাঁর জন্য অত্যন্ত কষ্টের এবং এখনো গভীরভাবে নাড়া দেয়। তবে দীর্ঘ সময় ভেবে তিনি বুঝেছেন, জাতীয় দলকে বিদায় জানানোর এটাই উপযুক্ত সময়।
জাতীয় দলের হয়ে প্রতিটি ম্যাচে নিজের সর্বোচ্চটা দেওয়ার কথাও স্মরণ করেছেন তিনি। শুধু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিরোপা জয়ের সময় নয়, তার আগের কঠিন সময়েও আর্জেন্টিনার জার্সির জন্য নিজের সবটুকু উজাড় করে দেওয়ার কথা জানিয়েছেন মেসি।
জাতীয় দলের হয়ে খেলা তাঁর কাছে সবসময় ভালোবাসার বিষয় ছিল উল্লেখ করে মেসি জানান, নিজের দেওয়ার মতো আর কিছু অবশিষ্ট নেই বলে তাঁর মনে হয়েছে। একই সঙ্গে আর্জেন্টিনার নতুন প্রজন্মের প্রতিভাবান ফুটবলারদের জায়গা করে দেওয়ার কথাও বলেছেন তিনি।
মেসির অবসরের সিদ্ধান্তের সঙ্গে তাঁর বাবা হোর্হে মেসির মৃত্যুর ঘটনাটিও গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। হোর্হে মেসি ৮ আগস্ট ৬৮ বছর বয়সে মারা যান। দীর্ঘদিনের অসুস্থতার পর রোজারিওতে তাঁর মৃত্যু হয়। তিনি শুধু মেসির বাবা ছিলেন না; শৈশব থেকেই তাঁর ফুটবল ক্যারিয়ারের অন্যতম প্রধান অভিভাবক ও এজেন্ট ছিলেন।
বাবার মৃত্যুর পর মেসি এক আবেগঘন বার্তায় নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার কথা জানিয়েছিলেন। তখন তিনি বলেছিলেন, বাবাকে ছাড়া কীভাবে এগিয়ে যাবেন, তা জানেন না এবং দীর্ঘদিন আর ফুটবল চালিয়ে যেতে পারবেন কি না, তা নিয়েও তাঁর যথেষ্ট সংশয় তৈরি হয়েছে।
তবে সোমবারের অবসরবার্তায় মেসি স্পষ্ট করেন, বাবার মৃত্যু তাঁর সিদ্ধান্তের মূল কারণ নয়; বরং সেই ঘটনার পর নিজের নেওয়া সিদ্ধান্তের ব্যাপারে তিনি আরও নিশ্চিত হয়েছেন।
মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচ হয়ে থাকল ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনাল। ১৯ জুলাই নিউইয়র্ক–নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয় স্পেন।
নির্ধারিত ৯০ মিনিটে কোনো গোল হয়নি। অতিরিক্ত সময়ের ১০৬তম মিনিটে ফেরান তোরেসের গোলে জয় নিশ্চিত করে স্পেন। ফলে ২০২২ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে রানার্সআপ হয়েই টুর্নামেন্ট শেষ করতে হয়।
ফাইনালের দুই দিন পরই মেসি অবসরের চিঠি লিখেছিলেন। তবে তখনই সেটি প্রকাশ করেননি। প্রায় ছয় সপ্তাহ পর সোমবার আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় দলকে বিদায় জানান তিনি।
আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শেষ হলো রেকর্ডের চূড়ায় দাঁড়িয়ে। ২০০৫ সালে অভিষেকের পর জাতীয় দলের হয়ে তিনি খেলেছেন ২০৭ ম্যাচ এবং করেছেন ১২৫ গোল—দুটিই আর্জেন্টিনার হয়ে সর্বোচ্চ।
তাঁর নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা ২০২১ ও ২০২৪ কোপা আমেরিকা এবং ২০২২ বিশ্বকাপ জিতেছে। ২০২৬ বিশ্বকাপেও দলকে ফাইনালে তুলেছিলেন তিনি। এর আগে ২০১৪ বিশ্বকাপেও আর্জেন্টিনা তাঁর নেতৃত্বে ফাইনালে উঠেছিল।
আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে মেসির অবসর অবশ্য এই প্রথম নয়। ২০১৬ সালে কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির কাছে হারের পর আবেগের বশে জাতীয় দল ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি। তবে কয়েক মাসের মধ্যেই সিদ্ধান্ত বদলে আবার আর্জেন্টিনার জার্সিতে ফিরে আসেন।
এরপরই শুরু হয় তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে সফল অধ্যায়। কোপা আমেরিকা, বিশ্বকাপ এবং আরও একটি কোপা আমেরিকা জিতে তিনি আর্জেন্টিনার হয়ে নিজের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটান।
বিদায়বার্তায় মেসি আর্জেন্টিনার সমর্থকদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। দুই দশকের বেশি সময় ধরে জাতীয় দলের হয়ে খেলার পথে যে ভালোবাসা ও সমর্থন পেয়েছেন, তা কখনো ভুলবেন না বলে জানিয়েছেন তিনি।
এখন থেকে জাতীয় দলের জার্সি পরে নয়, একজন সাধারণ সমর্থক হিসেবে আর্জেন্টিনাকে অনুসরণ করতে চান মেসি। সতীর্থ, কোচ, কর্মকর্তা ও পরিবারের সদস্যদেরও ধন্যবাদ জানিয়েছেন তিনি।
তাঁর ভাষায়, সতীর্থদের সঙ্গে মিলে এমন কিছু স্বপ্নের মুহূর্ত উপহার দিতে পেরেছেন, যেগুলো একসময় শুধু স্বপ্নই ছিল—এটাই তাঁর সবচেয়ে বড় তৃপ্তি।
মেসির অবসর শুধু আর্জেন্টিনা দলের জন্য নয়, বিশ্ব ফুটবলের জন্যও একটি যুগের সমাপ্তি। ২১ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে হতাশা, সমালোচনা ও ব্যর্থতার দীর্ঘ পথ পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপসহ বড় তিনটি আন্তর্জাতিক শিরোপা জিতে নিজের উত্তরাধিকারকে পূর্ণতা দিয়েছেন তিনি।
৩৯ বছর বয়সে জাতীয় দলকে বিদায় জানালেও ক্লাব ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দেননি মেসি। বর্তমানে ইন্টার মায়ামির হয়ে খেলছেন তিনি। অর্থাৎ আর্জেন্টিনার নীল-সাদা জার্সিতে আর দেখা না গেলেও ফুটবল মাঠে তাঁর অধ্যায় এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি।
বিশ্বকাপ ফাইনালের হতাশা, বাবার মৃত্যুশোক এবং দীর্ঘ আত্মবিশ্লেষণের পর শেষ পর্যন্ত নিজের সিদ্ধান্ত জানালেন মেসি। ২১ বছরের আন্তর্জাতিক পথচলার শেষে তাঁর বিদায় তাই কেবল একজন ফুটবলারের অবসর নয়—আর্জেন্টাইন ফুটবলের এক মহাকাব্যিক অধ্যায়ের পরিসমাপ্তিও।
Warning: Array to string conversion in /home/dkishoreganj/public_html/wp-content/plugins/gs-facebook-comments/public/class-wpfc-public.php on line 311
Array