কুলিয়ারচরে পুলিশের সামনেই মাইক্রোবাসে ডাকাতির অভিযোগ
রাত পৌনে দুইটা। সড়কে যানবাহন চলাচলও তখন তুলনামূলক কম। সিলেটের উদ্দেশে ভালুকা থেকে ছেড়ে আসা একটি মাইক্রোবাস কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার নোয়াগাঁও বাসস্ট্যান্ড এলাকায় পৌঁছালে রিফ্লেক্টিভ ভেস্ট পরা তিন ব্যক্তি গাড়ি থামানোর সংকেত দেন। কাছেই পুলিশের একটি গাড়ি দেখতে পেয়ে চালক ও যাত্রীরা ওই ব্যক্তিদের পুলিশ সদস্য মনে করে গাড়ি থামান। এরপর দেশীয় অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে তাঁদের মালামাল লুট করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন মাইক্রোবাসের যাত্রীরা।
তবে ঘটনাস্থলে থাকা পুলিশের বক্তব্য ভিন্ন। পুলিশের দাবি, মাইক্রোবাসটি হঠাৎ সড়কে থেমে গেলে বিষয়টি দেখতে তারা গাড়িটির সামনে যায়। পুলিশকে দেখে কয়েকজন দৌড়ে পালিয়ে যায়। ঘটনাস্থলে ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে- এমন কোনো প্রমাণ পুলিশ পায়নি বলেও দাবি করা হয়েছে।
একই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভুক্তভোগী ও পুলিশের পরস্পরবিরোধী বক্তব্যে তৈরি হয়েছে প্রশ্ন ও অসঙ্গতি।
ঘটনাটি ঘটে গত বৃহস্পতিবার(২৭ আগস্ট) দিবাগত রাতে কুলিয়ারচর উপজেলার ছয়সূতি ইউনিয়নের নোয়াগাঁও বাসস্ট্যান্ড এলাকায়। মাইক্রোবাসটির নম্বর ঢাকা মেট্রো-গ ১৪-৯৩১০। এ সময় ঘটনাস্থলে কুলিয়ারচর থানার তদন্ত কর্মকর্তা মোবারক হোসেন, এসআই সুজন বিশ্বাসসহ পুলিশের একটি দল উপস্থিত ছিল।
মাইক্রোবাসের যাত্রী সারোয়ার আলম বলেন, গাড়িটিতে তাঁরা মোট আটজন ছিলেন। তাঁদের মধ্যে দুইজন পুরুষ, দুইজন নারী ও চারটি শিশু। ভালুকা থেকে সিলেট যাওয়ার পথে নোয়াগাঁও এলাকায় পৌঁছালে রিফ্লেক্টিভ ভেস্ট পরা তিন ব্যক্তি গাড়ি থামানোর সংকেত দেন। কিছুটা দূরে পুলিশের গাড়ি দেখতে পাওয়ায় তাঁরা ওই ব্যক্তিদের পুলিশ সদস্য মনে করে গাড়ি থামান।
সারোয়ারের অভিযোগ, গাড়ি থামানোর পর কয়েকজন দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তাঁদের ওপর হামলা চালায় এবং অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে বিভিন্ন মালামাল নিয়ে যায়।
তিনি দাবি করেন, এ সময় প্রায় পাঁচ ভরি স্বর্ণালংকার লুট হয়েছে। এর মধ্যে চেইন, কানের দুল, আংটি ও চুড়ি ছিল। এ ছাড়া দুটি Oppo স্মার্টফোন, একটি Xiaomi 8 ট্যাব, একটি GoPro ক্যামেরা, Nothing ব্র্যান্ডের হেডফোন এবং প্রায় এক লাখ টাকা নগদ নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ করেন তিনি। পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র ও ক্রেডিট কার্ডও খোয়া গেছে বলে জানান তিনি।
সারোয়ার আরও অভিযোগ করেন, লুটপাটের সময় ১৪ মাস বয়সী এক শিশুর গলায় ছুরি ধরে ভয় দেখানো হয়। হামলাকারীরা একে অপরকে বিভিন্ন নামে ডাকছিলেন। এর মধ্যে একজনকে ‘জুয়েল’ নামে ডাকতে শুনেছেন বলে দাবি করেন তিনি।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ডাকাতির শেষ পর্যায়ে পুলিশ ঘটনাস্থলের দিকে এগিয়ে এলে হামলাকারীরা পালিয়ে যেতে শুরু করে। তাঁদের দাবি, পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ১০০ গজের মধ্যে অবস্থান করছিল।
সারোয়ারের অভিযোগ, এ সময় একজন পুলিশ সদস্য পালিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের পেছনে দৌড় দিলেও এসআই সুজন তাঁকে ধমক দিয়ে থামিয়ে দেন।
ভুক্তভোগীদের আরও অভিযোগ, পুলিশ তাঁদের কাছ থেকে লুট হওয়া মালামালের বিবরণ নেওয়ার সময় হামলাকারীদের একজন পেছন দিক দিয়ে আরও তিন-চারজনের সঙ্গে ঘটনাস্থলে ফিরে আসে। তাঁরা ওই ব্যক্তিকে ডাকাতির সময় উপস্থিত থাকার কথা পুলিশকে জানালে পুলিশ তাঁর ছবি ও পরিচয় নেয়। পরে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন তাঁরা।
ঘটনার পর কী করা উচিত, সে বিষয়েও পুলিশকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন বলে জানান সারোয়ার আলম। তাঁর ভাষ্য, মামলা বা লিখিত অভিযোগের বিষয়ে পুলিশ তাঁদের কোনো পরামর্শ দেয়নি। শুধু নাম-ঠিকানা নেওয়া হয়েছে। ফলে এ ঘটনায় পরবর্তী সময়ে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তা নিয়েও তাঁরা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন বলে জানান তিনি।
অন্যদিকে কুলিয়ারচর থানার তদন্ত কর্মকর্তা মোবারক হোসেন বলেন, পুলিশ কুলিয়ারচরের শেষ সীমানা থেকে কুলিয়ারচরের দিকে আসছিল। বিপরীত দিক থেকে মাইক্রোবাসটি ভৈরবের দিকে যাচ্ছিল। হঠাৎ মাইক্রোবাসটি সড়কে দাঁড়িয়ে গেলে কেন থেমেছে, তা দেখতে পুলিশ গাড়িটি সামনে নিয়ে মাইক্রোবাসটির একেবারে মুখোমুখি দাঁড় করায়। এ সময় পুলিশকে দেখে কয়েকজন দৌড়ে পালিয়ে যায়।
তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, ঘটনাস্থলে ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে—এমন কোনো প্রমাণ পুলিশ পায়নি। ফলে এটিকে ডাকাতির ঘটনা বলা যাচ্ছে না।
তবে ভুক্তভোগীদের বর্ণনায় ঘটনার চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাঁদের দাবি, রিফ্লেক্টিভ ভেস্ট পরা ব্যক্তিদের সংকেতেই তাঁরা গাড়ি থামিয়েছিলেন। এরপর অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে তাঁদের কাছ থেকে স্বর্ণ, নগদ টাকা, মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন মালামাল নিয়ে যাওয়া হয়।
ঘটনার সত্যতা নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যে স্পষ্ট পার্থক্য থাকায় বিষয়টি নিয়ে কয়েকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে। রিফ্লেক্টিভ ভেস্ট পরা ওই তিন ব্যক্তি কারা, তাঁরা কেন মাইক্রোবাসটি থামানোর সংকেত দিয়েছিলেন, পুলিশকে দেখে যারা দৌড়ে পালিয়েছিল তারা কারা- এসব প্রশ্নের পাশাপাশি ভুক্তভোগীদের দাবি করা স্বর্ণ, নগদ টাকা ও অন্যান্য মালামালের কোনো সন্ধান বা আলামত পাওয়া গেছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
নোয়াগাঁও বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ওই রাতে আসলে কী ঘটেছিল, তা নিশ্চিত করতে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, পুলিশের পর্যবেক্ষণ, ঘটনাস্থলের আলামত এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন।













Warning: Array to string conversion in /home/dkishoreganj/public_html/wp-content/plugins/gs-facebook-comments/public/class-wpfc-public.php on line 311
Array