মাছের সংকটে কিশোরগঞ্জের হাওরের জেলেরা, বিলুপ্তির পথে দেশি প্রজাতি
সংগ্রহীত ছবি
একসময় মাছের ভান্ডার হিসেবে পরিচিত ছিল কিশোরগঞ্জের বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চল। হাওরের নদী, খাল-বিল ও জলমহাল ঘিরে গড়ে উঠেছিল হাজারো জেলে পরিবারের জীবন-জীবিকা। তবে মাছের উৎপাদন কমে যাওয়ায় এখন সংকটে পড়েছে এসব পরিবারের জীবন-জীবিকা। আয় কমে যাওয়ায় অনেকেই পৈতৃক পেশা ছেড়ে অন্য কাজে যুক্ত হচ্ছেন।
জেলেদের অভিযোগ, নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারি জাল, রিং জাল ও কারেন্ট জালের অবাধ ব্যবহার, নির্বিচারে পোনা মাছ নিধন, জলমহালের অপরিকল্পিত ইজারা এবং নদ-নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ায় হাওরে মাছের উৎপাদন আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। এর ফলে একদিকে মৎস্যজীবীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, অন্যদিকে দেশি নানা প্রজাতির মাছও বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়েছে।
কিশোরগঞ্জের বিস্তীর্ণ হাওরজুড়ে এখনো জেলেদের বিচরণ চোখে পড়ে। কোথাও দলবদ্ধভাবে জাল টেনে মাছ ধরছেন জেলেরা, আবার কোথাও একাকী নৌকায় মাছ শিকারে ব্যস্ত কেউ। হাওরাঞ্চলের স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকার অন্যতম প্রধান অবলম্বন এই মৎস্য আহরণ।
স্থানীয়দের ভাষ্য, একসময় ভোরে জাল নিয়ে হাওরে বের হলে জেলেরা মাছভর্তি নৌকা নিয়ে বাড়ি ফিরতেন। কিন্তু সেই চিত্র এখন অনেকটাই বদলে গেছে। দিনের পর দিন হাওরে অবস্থান করেও কাঙ্ক্ষিত মাছ পাচ্ছেন না অনেক জেলে। এতে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাঁদের।
এক জেলে বলেন, “সারাদিন পানিতে ডুবে মাছ ধরি। এখন মাছই পাই না। মাছ না পেলে সংসার চালানোর আর কোনো উপায় থাকে না।”
আরেক জেলের ভাষ্য, বর্তমানে মাছ পাওয়া গেলেও তা দিয়ে আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলানো কঠিন। দৈনিক আয় থেকে নৌকা, জাল ও অন্যান্য খরচ বাদ দিলে হাতে খুব সামান্য অর্থ থাকে।
হাওরের মাছের ওপর নির্ভরশীল ব্যবসায়ীদেরও একই অভিযোগ। কয়েক বছর আগেও যেখানে প্রতিদিন দেড় থেকে দুই কোটি টাকার মাছ কেনাবেচা হতো, সেখানে এখন তার চার ভাগের এক ভাগও হচ্ছে না বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
এক মাছ ব্যবসায়ী বলেন, “কয়েক বছর আগেও এখান থেকে কোটি কোটি টাকার মাছ সারা বাংলাদেশে যেত। এখন সেই তুলনায় মাছের সরবরাহ প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে।”
জেলেদের ভাষ্য, আগে চিংড়ি, রানি, মহাশোল, সরপুঁটি, রিটা, পাঙ্গাস, আইড়, চিতল, পাবদা, কালিবাউশ, গাংমাগুর ও শালবাইমসহ বিভিন্ন দেশি প্রজাতির মাছ প্রচুর পাওয়া যেত। এখন এসব মাছের অনেক প্রজাতিই আগের তুলনায় খুব কম পাওয়া যায়। কোনো কোনো প্রজাতি স্থানীয়ভাবে প্রায় বিলুপ্তির পথে বলে দাবি তাঁদের।
জেলেদের অভিযোগ, মাছের প্রজনন মৌসুমে নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার এবং নির্বিচারে পোনা মাছ ধরার কারণে হাওরের মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে চায়না দুয়ারি, রিং ও কারেন্ট জালের ব্যবহার বন্ধ করা না গেলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে বলে মনে করছেন তাঁরা।
তাঁদের আরও দাবি, জলমহালের অপরিকল্পিত ইজারা বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে মাছের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র রক্ষায় অভয়াশ্রম বাড়ানোর পাশাপাশি বিদ্যমান অভয়াশ্রমগুলো যথাযথভাবে সংরক্ষণ করতে হবে।
মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার বন্ধে অভিযান চালানো হলেও পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব হচ্ছে না। মাছের প্রজনন ও উৎপাদন বাড়াতে অভয়াশ্রমের সংখ্যাও বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এক কর্মকর্তা বলেন, “মৎস্য আইনে নিষিদ্ধ যেসব জাল রয়েছে, সেগুলোর ব্যবহার পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব হচ্ছে না। বর্তমানে জেলায় ২১টি মৎস্য অভয়াশ্রম রয়েছে। আরও ২৫টি অভয়াশ্রম স্থাপনের জন্য ইতোমধ্যে মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।”
মৎস্য উৎপাদন বাড়াতে হাওরের জলজ সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, মাছের প্রজননক্ষেত্র সংরক্ষণ এবং নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার বন্ধে কার্যকর নজরদারির ওপর জোর দিচ্ছেন মৎস্যসংশ্লিষ্টরা।
তাঁদের মতে, শুধু অভিযান চালিয়ে মাছের উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব নয়। হাওরের জলমহাল ব্যবস্থাপনা, মাছের অভয়াশ্রম সংরক্ষণ, প্রজনন মৌসুমে মাছ ধরা নিয়ন্ত্রণ, পোনা নিধন বন্ধ এবং নদ-নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
এ উদ্যোগ কার্যকর করা গেলে একদিকে যেমন হাওরের মাছের প্রাকৃতিক উৎপাদন বাড়বে, অন্যদিকে সংকটে থাকা জেলেদের জীবন-জীবিকাও ঘুরে দাঁড়াবে। পাশাপাশি দেশি মাছের বৈচিত্র্য ও হাওরের জলজ জীববৈচিত্র্য রক্ষার পথও তৈরি হবে।














Warning: Array to string conversion in /home/dkishoreganj/public_html/wp-content/plugins/gs-facebook-comments/public/class-wpfc-public.php on line 311
Array