প্লাস্টিকের দাপটে পেশা বদলাচ্ছেন তাড়াইলের বাঁশ-বেত কারিগররা
একসময় কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলার গ্রামীণ জনপদে বাঁশ-বেতের তৈরি পণ্য ছিল মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর অন্যতম। গৃহস্থালি থেকে কৃষিকাজ, এমনকি বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানেও বাঁশ-বেতের তৈরি সামগ্রীর ব্যাপক ব্যবহার ছিল। সময়ের সঙ্গে আধুনিকতার ছোঁয়া এবং প্লাস্টিকজাত পণ্যের ব্যবহার বাড়ায় হারিয়ে যেতে বসেছে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প। চাহিদা কমে যাওয়ায় পেশা বদল করছেন অনেক কারিগর। ফলে অস্তিত্বসংকটে পড়েছে তাড়াইলের বাঁশ-বেতশিল্প।
সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, একসময় যে পেশায় অসংখ্য পরিবার যুক্ত ছিল, বর্তমানে হাতে গোনা কয়েকটি পরিবার সেই কাজ ধরে রেখেছে। ঝুড়ি, চালুনি, ডালা, কুলা, বেতের চেয়ারসহ বিভিন্ন সামগ্রী তৈরি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন যেসব কারিগর, তাঁদের অনেকেই এখন দিনমজুরি কিংবা ক্ষুদ্র ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন।
কারিগরদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাঁশ-বেতের পণ্য তৈরিতে সময় ও শ্রম বেশি লাগে। অন্যদিকে বাজারে প্লাস্টিক ও বিভিন্ন শিল্পজাত পণ্যের সহজলভ্যতার কারণে ঐতিহ্যবাহী এসব পণ্যের চাহিদা কমেছে। পাশাপাশি কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচও বেড়েছে। ফলে পণ্য বিক্রি করে আগের মতো লাভ থাকছে না।
চরতালজাঙ্গা গ্রামের প্রবীণ কারিগর আব্দুল গফুর (৬০) বলেন, ‘আগে সপ্তাহে কয়েকটি বাঁশ কেটে নানা ধরনের জিনিস তৈরি করে বাজারে বিক্রি করতাম। এখন মানুষ প্লাস্টিকের জিনিস বেশি ব্যবহার করে। তার ওপর বাঁশের দামও বেড়েছে। সব খরচ মিটিয়ে হাতে তেমন লাভ থাকে না।’
আরেক কারিগর মজনু মিয়া বলেন, ‘আমাদের সন্তানরা এখন এই পেশায় আসতে চায় না। তারা মনে করে, এই কাজে ভবিষ্যৎ নেই। অথচ আমরা এই কাজ করেই সারা জীবন কাটিয়েছি।’
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সচেতন নাগরিকদের মতে, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখা কঠিন। কারিগরদের স্বল্প সুদে ক্ষুদ্রঋণ, আধুনিক নকশা ও পণ্য তৈরির প্রশিক্ষণ এবং উৎপাদিত পণ্যের বাজারজাতকরণে সহায়তা দেওয়া গেলে এই শিল্প আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে।
তাঁদের মতে, স্থানীয় কারিগরদের তৈরি পণ্য স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি অনলাইন ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বাজারে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বাঁশ-বেতের পণ্যের আধুনিক ডিজাইন, মানোন্নয়ন ও প্যাকেজিং বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হলে তরুণ প্রজন্মকেও এই পেশায় আগ্রহী করা সম্ভব।
তাড়াইল উপজেলা শিল্পকলা কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্বে) ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তানজিলা আখতার বলেন, ‘আমরা স্থানীয় হস্তশিল্পের তালিকা তৈরির কাজ করছি। ভবিষ্যতে প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তার পরিকল্পনা রয়েছে।’
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাঁশ-বেতের শিল্প শুধু একটি জীবিকার মাধ্যম নয়; এটি গ্রামীণ জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যেরও অংশ। যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা, প্রশিক্ষণ, সহজ শর্তে ঋণ এবং বাজারজাতকরণের সুযোগ তৈরি করা গেলে তাড়াইলের হারিয়ে যেতে বসা বাঁশ-বেতশিল্প নতুন করে প্রাণ ফিরে পেতে পারে। পাশাপাশি এই শিল্পের সঙ্গে নতুন প্রজন্মকে যুক্ত করা গেলে একদিকে যেমন স্থানীয় ঐতিহ্য সংরক্ষণ হবে, অন্যদিকে তৈরি হতে পারে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ।











Warning: Array to string conversion in /home/dkishoreganj/public_html/wp-content/plugins/gs-facebook-comments/public/class-wpfc-public.php on line 311
Array