সৌদি আরবে আকস্মিক বজ্রপাতে নিহত কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর পৌরসভার পশ্চিম ধুলজুরী গ্রামের প্রবাসী রাসেল মিয়ার পরিবারের সদস্যরা চরম দারিদ্র্য ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। মৃত্যুর কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও সরকারি সহায়তার অধিকাংশ আশ্বাস এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে সীমাহীন আর্থিক সংকটে স্ত্রী ও চার সন্তানকে নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে পরিবারটিকে।
একসময় প্রবাসে কঠোর পরিশ্রম করে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন রাসেল মিয়া। তাঁর উপার্জনেই চলত সংসার। কিন্তু আকস্মিক মৃত্যুর পর পরিবারটি যেন দিশেহারা হয়ে পড়েছে। অনেক দিনই চুলায় আগুন জ্বলে না। খাদ্যসংকটের কারণে পরিবারের সদস্যদের অনেক সময় না খেয়ে থাকতে হয়। চলমান বর্ষা মৌসুমে ভাঙাচোরা একটি ঘরে চার সন্তানকে নিয়ে অসহায় জীবন কাটাচ্ছেন রাসেলের স্ত্রী শাহানাজ পারভীন।
সরেজমিনে কথা হলে শাহানাজ পারভীন বলেন, “স্বামী চলে যাওয়ার ১৬ দিন পর আমার মাও মারা যান। এখন আমার মা-বাবা, ভাই-বোন—কেউ নেই। চার সন্তান নিয়ে কোথায় যাব, কীভাবে বাঁচব বুঝতে পারছি না। অনেক সময় সন্তানদের ঠিকমতো খাবারও দিতে পারি না। সরকারি সহযোগিতার আশায় আছি, কিন্তু এখনো তেমন কোনো সহায়তা পাইনি। নানা দুশ্চিন্তায় আমি নিজেও অসুস্থ হয়ে পড়েছি।”
রাসেলের মা মোমেনা আক্তার বলেন, অনেক দিন তিন বেলার পরিবর্তে এক বেলা খাবার খেয়েই দিন পার করতে হচ্ছে পরিবারটির। চরম দারিদ্র্যের কারণে শিশুদের লেখাপড়াও বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। লেখাপড়ার খরচ বহন তো দূরের কথা, নিয়মিত খাবারের সংস্থান করাই এখন পরিবারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তাই সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান ও হৃদয়বান মানুষের কাছে মানবিক সহায়তার আবেদন জানিয়েছেন তিনি।
জানা গেছে, ২০২৬ সালের ১০ মার্চ সৌদি আরবে কর্মস্থলে মাঠে কাজ করার সময় বজ্রপাতে মারা যান রাসেল মিয়া। তাঁর মৃত্যুর পর পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে স্ত্রী ও চার সন্তান চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে।
ঈদ উপলক্ষে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কাজী নাহিদ ইভা নিহতের বাড়িতে গিয়ে জামাকাপড়, খাদ্যসামগ্রী ও নগদ অর্থ বিতরণ করেন। সে সময় তিনি পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা দিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা এবং সরকারি অনুদানের ব্যবস্থা করার আশ্বাস দেন।
তবে পরিবারের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও স্থায়ী কোনো সরকারি সহায়তা তারা পাননি। ফলে দিন দিন আরও অসহায় হয়ে পড়ছে পরিবারটি।
প্রতিবেশী আবু রায়হানসহ স্থানীয় অনেকেই বলেন, রাসেল মিয়ার পরিবার বর্তমানে চরম আর্থিক সংকটে রয়েছে। তাই সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন, সমাজসেবা অধিদপ্তর, বিভিন্ন মানবিক সংগঠন এবং দেশের বিত্তবান ব্যক্তিদের এই অসহায় পরিবারের পাশে দাঁড়ানো উচিত।
স্থানীয়দের দাবি, শুধু সাময়িক সহায়তা নয়; পরিবারটির জন্য স্থায়ী পুনর্বাসন, বিধবা ভাতা, শিশুদের শিক্ষা সহায়তা এবং নিয়মিত সরকারি সহযোগিতার ব্যবস্থা করা জরুরি। কারণ একজন প্রবাসী দেশের অর্থনীতিতে অবদান রেখে মৃত্যুবরণ করার পর তাঁর পরিবারকে চরম দারিদ্র্য ও অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে রাখা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
হোসেনপুর পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর মো. মিসবাহ উদ্দিন মানিক বলেন, রাসেল মিয়ার পরিবার বর্তমানে অত্যন্ত অসহায় অবস্থায় রয়েছে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে তারা মানবেতর জীবনযাপন করছে। সরকারি সহায়তার পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি ও মানবিক সংগঠনগুলোরও দ্রুত এই পরিবারের পাশে দাঁড়ানো উচিত। একই সঙ্গে চার শিশুর ভবিষ্যৎ রক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
তিনি বলেন, “একজন প্রবাসীর মৃত্যু শুধু একটি প্রাণের অবসান নয়; এটি একটি পরিবারের স্বপ্ন, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতেরও মৃত্যু। রাসেল মিয়ার চার সন্তান আজও অপেক্ষা করছে—রাষ্ট্র ও সমাজের সহযোগিতায় অন্তত তাদের বাবার স্বপ্নগুলো যেন বেঁচে থাকে।”
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কাজী নাহিদ ইভা বলেন, “সরকারিভাবে পরিবারটিকে সাময়িক সহযোগিতা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি স্থায়ীভাবে তাদের পুনর্বাসনের জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণে আমরা কাজ করছি।”
Warning: Array to string conversion in /home/dkishoreganj/public_html/wp-content/plugins/gs-facebook-comments/public/class-wpfc-public.php on line 311
Array