বিএনপি দলীয় ও বহিষ্কৃত নেতাদের বালু ব্যবসার আধিপত্য বিস্তারের সংঘর্ষে বৃদ্ধের মৃত্যু
কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার ঘোড়াউত্রা নদী থেকে বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে বিএনপির দলীয় নেতাকর্মী ও দল থেকে বহিষ্কৃত নেতাকর্মীদের দ্বন্দ্ব এখন চরম রূপ ধারণ করেছে। এরই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে গত শনিবার রাত প্রায় ১টার সময় উপজেলার ছাতিরচর ইউনিয়নে। বালু উত্তোলনের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও বহিষ্কৃত দুই গ্রুপের সংঘর্ষে বিএনপির কর্মী, সাবেক মেম্বার রমিজ উদ্দিন ও হিরা নামের দুজন গুরুতর আহত হন। এ সংঘর্ষ থামাতে গিয়ে কাছুম আলী (৬০) নামের এক বৃদ্ধের মৃত্যু হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বিএনপি নেতা ও সাবেক মেম্বার রমিজ উদ্দিন চলতি বছর ঘোড়াউত্রা নদীর একাংশ ইজারা নেন। ইজারাকৃত নদীতে বিএনপির বহিষ্কৃত গ্রুপের নেতা জুম্মন মিয়া বালু উত্তোলনের জন্য জোরপূর্বক ড্রেজার বসান। এতে ইজারাদার ও বিএনপি কর্মী রমিজ উদ্দিন বাধা দেন। জুম্মন সেই বাধা অমান্য করে বালু উত্তোলন শুরু করলে দুজনের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয়।
রাত প্রায় ১টার সময় রমিজ উদ্দিন কয়েকজনকে নিয়ে ছাতিরচর বেড়িবাঁধে বসে আলাপ-আলোচনা করছিলেন। এমন সময় বহিষ্কৃত গ্রুপের নেতা জুম্মন ২০/২৫ জনকে সঙ্গে নিয়ে রমিজ মেম্বারকে হত্যার উদ্দেশ্যে রামদা নিয়ে কোপ দিতে উদ্যত হলে রমিজ দৌড়ে গ্রামের একটি বাড়িতে আশ্রয় নেন।
রমিজের ডাক-চিৎকারে বাড়ির মালিক বিএনপি কর্মী হিরা ও কাছুম আলী এসে জুম্মনের হাত থেকে রামদা কেড়ে নেন। এ সময় হিরা ধারালো অস্ত্রের আঘাতে আহত হন এবং কাছুম আলী শ্বাসকষ্টে অজ্ঞান হয়ে পড়েন। পরে কাছুম আলীকে নিকলী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন বলে জানিয়েছেন উভয় গ্রুপের নেতা ও স্থানীয় কয়েকটি সূত্র।
উপজেলার সিংপুর ইউনিয়নের ভাটি বরাটিয়ার ধনু নদী ও বোয়ালিয়া নদীতে বিএনপির বহিষ্কৃতদের একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে আসছে। এরই সূত্র ধরে বিএনপির নেতাকর্মীরাও নদীতে বালু উত্তোলনে ভাগ-বাটোয়ারার সুযোগ খুঁজছেন।
দলীয় দ্বন্দ্বের সুযোগে বিগত আওয়ামী সরকারের মদদপুষ্ট দলীয় বালু ব্যবসায়ীরা গ্রুপ নেতাদের সহায়তায় বালু ব্যবসায় ঢুকে পড়েছেন বলে জানিয়েছেন দুই গ্রুপের একাধিক নেতাকর্মী। গত বছরও বালু ব্যবসা নিয়ে দুই গ্রুপের সংঘর্ষ হয়েছিল।
আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের নিয়ে বহিষ্কৃতরা অবৈধ বালু ব্যবসা পরিচালনা করছেন- এমন অভিযোগে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা রয়েছে।
অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করতে উপজেলা প্রশাসন মাঝে-মধ্যে নামমাত্র অভিযান চালিয়ে জরিমানা করে। অনেকের মতে, নদীতে বালু উত্তোলনের বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী অনৈতিক সুবিধা নিচ্ছেন। তা না হলে তারা কেন বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছেন না- এমন প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
এ ছাড়া স্থানীয়রা প্রতিনিয়ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রাচীন পুকুর, জলাশয়, ফসলি জমি এবং খাল ভরাটের পোস্ট করছেন। এগুলো প্রশাসনের দৃষ্টিতে পড়লেও প্রকৃতপক্ষে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না বলে দাবি করেছেন সচেতন মহল।
গত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কিশোরগঞ্জ-৫ (নিকলী-বাজিতপুর) আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী সৈয়দ এহসানুল হুদার নির্বাচনের বিরোধিতার কারণে ৬০ থেকে ৭০ জন নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। বহিষ্কৃতরা স্বতন্ত্র প্রার্থী শেখ মজিবুর রহমান ইকবালের হাঁস প্রতীকের পক্ষে অবস্থান নেন। বিজয়ের পর থেকেই প্রশাসনিক সুযোগ-সুবিধা ও রাজনৈতিক নানা বিষয়ে মতপার্থক্য চলছে। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিগত সরকারের দলীয় বালু ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন ব্যবসায় ঢুকে পড়েছে এবং উপজেলা প্রশাসন ‘শ্যাম রাখি না কুল রাখি’ অবস্থায় রয়েছে বলে মনে করছেন অনেকেই।
নিকলীর বেশ কয়েকটি পয়েন্টে অবৈধ বালু উত্তোলনের কথা স্বীকার করে নিকলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেহানা মজুমদার মুক্তি এ প্রতিনিধিকে বলেন, “ছাতিরচর এলাকায় নদী থেকে বালু উত্তোলনের বিষয়টি তিনি জানতেন না।”
নিকলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহবুবুর রহমান বলেন, “ছাতিরচরের ঘটনায় এখনো কেউ লিখিত অভিযোগ করেননি। মৃতের লাশের সুরতহাল প্রতিবেদন শেষে ময়নাতদন্তের জন্য জেলা সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।”








Warning: Array to string conversion in /home/dkishoreganj/public_html/wp-content/plugins/gs-facebook-comments/public/class-wpfc-public.php on line 311
Array