সৌদি-পাকিস্তান-তুরস্কের প্রতিরক্ষা চুক্তি: প্রত্যাহারে ১০ বছরের শর্ত
মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি থেকে বের হতে হলে কার্যকর হওয়ার পর অন্তত ১০ বছর অপেক্ষা করতে হবে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ককে। এরপর কোনো সদস্য দেশ চুক্তি থেকে সরে যেতে চাইলে অন্তত তিন মাস আগে কূটনৈতিক মাধ্যমে লিখিত নোটিশ দিতে হবে। তবে চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা রাখা হয়নি।
তুরস্কের পার্লামেন্টে অনুমোদনের জন্য চুক্তিটি পাঠানোর আগে এর ১৬টি ধারার পূর্ণাঙ্গ পাঠ প্রকাশ করেছে দেশটির সংবাদমাধ্যম তুর্কিয়ে টুডে। এতে চুক্তি থেকে বের হওয়ার নিয়মের পাশাপাশি কোনো সদস্য দেশ আক্রান্ত হলে অন্য সদস্যদের সহায়তার ধরন ও শর্তও উল্লেখ করা হয়েছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডের প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়।
চুক্তির ১৬ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, এটি কার্যকর হওয়ার ১০ বছর পর যেকোনো সদস্য দেশ চুক্তি থেকে সরে যেতে পারবে। এ জন্য কূটনৈতিক মাধ্যমে লিখিত নোটিশ দিতে হবে। নোটিশ দেওয়ার অন্তত তিন মাস পর চুক্তি থেকে বের হওয়ার প্রক্রিয়া কার্যকর হবে।
চুক্তিতে সই করার দিন থেকে নয়, বরং এটি কার্যকর হওয়ার দিন থেকে ১০ বছরের হিসাব শুরু হবে। জোটের সচিবালয়ে চুক্তি অনুমোদনের শেষ দলিল জমা দেওয়ার পর এটি কার্যকর হবে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, মঙ্গলবার তুরস্ক সরকার চুক্তিটি অনুমোদনের জন্য পার্লামেন্টে পাঠিয়েছে।
গত ৭ আগস্ট মক্কায় এই চুক্তিতে সই করেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান, সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। চুক্তিতে যৌথ সামরিক মহড়া, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনে সহযোগিতার বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।এক দেশের ওপর হামলা, সব দেশের ওপর হামলা
চুক্তির মূল শর্ত অনুযায়ী, সদস্য দেশগুলোর যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা হলে তা সব সদস্য দেশের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচিত হবে। কোনো সদস্য দেশ অন্য কোনো দেশ বা কয়েকটি দেশের জোটের সশস্ত্র হামলা কিংবা সামরিক আগ্রাসনের শিকার হলে অন্য সদস্যদের দ্রুত সহায়তা করতে হবে।
তবে কী ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে, তা পরিস্থিতি বিবেচনা করে নির্ধারণ করা হবে। আক্রান্ত দেশের প্রয়োজন, অন্য সদস্যদের সহায়তা দেওয়ার সামর্থ্য এবং তাদের সামরিক সক্ষমতা বিবেচনায় নেওয়া হবে। চুক্তিতে নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি, আক্রান্ত দেশকে সহায়তা করতে কতজন সেনা পাঠাতে হবে বা কী ধরনের সামরিক পদক্ষেপ নিতে হবে। ফলে সহায়তা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও এর ধরন নির্ধারণে সদস্য দেশগুলোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ থাকবে।
ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে রয়েছে সৌদি আরব। এমন পরিস্থিতিতে আক্রান্ত সদস্যকে সহায়তা করার শর্ত বাস্তবে কীভাবে কার্যকর হবে, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
চলতি মাসের শুরুতে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে এক জরুরি বৈঠকে তিন দেশের প্রতিনিধিরা সৌদি আরবে দ্রুত সামরিক বাহিনী ও সামরিক সক্ষমতা মোতায়েন নিশ্চিত করার বিষয়ে সম্মত হন।
পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরিফ চৌধুরী বলেছেন, সৌদি আরবের সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও পবিত্র স্থানগুলোর সুরক্ষায় পাকিস্তান ‘যেকোনো প্রয়োজনীয় সহায়তা’ দিচ্ছে।
রোববার ইনডিপেনডেন্ট আরাবিয়াকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, এসব স্থান ও স্থাপনার সুরক্ষা পাকিস্তানের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে কোনো আপস করা হবে না। তবে কী ধরনের বা কতটা সহায়তা দেওয়া হচ্ছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানাননি তিনি।
তুরস্কের এক কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, সৌদি আরবকে তুরস্কের সহায়তা মূলত সামরিক সরঞ্জাম, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ও অস্ত্রব্যবস্থার মধ্যে সীমিত থাকতে পারে।
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান চুক্তিটিকে প্রতিরক্ষামূলক হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, অন্য কোনো দেশে হামলা চালানোর জন্য তুরস্ক সেখানে সেনা পাঠাবে না।
চুক্তি কার্যকর করার প্রক্রিয়া তিন দেশে এক রকম নয়। তুরস্কে চুক্তিটি কার্যকর করতে পার্লামেন্টের অনুমোদন প্রয়োজন। এ ছাড়া দেশের বাইরে সেনা পাঠাতেও পার্লামেন্টের আলাদা অনুমতি নিতে হয়।
সৌদি আরবে আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুমোদনের জন্য পার্লামেন্টের পরিবর্তে রাজকীয় আদেশের ব্যবস্থা রয়েছে। অন্যদিকে, পাকিস্তানের ক্ষেত্রে চুক্তির আওতায় সেনা মোতায়েন এবং ইয়েমেনের সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
তবে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, এই চুক্তির আওতায় সেনা মোতায়েন করতে পার্লামেন্টের অনুমোদন প্রয়োজন নেই। তাদের দাবি, এ ধরনের মোতায়েন বিদ্যমান আইন ও সরকারি প্রক্রিয়া অনুযায়ী করা হবে।
২০১৫ সালে পাকিস্তানের পার্লামেন্ট সৌদি আরবের ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি সমর্থন জানিয়েছিল। তবে ইয়েমেনের যুদ্ধে অংশ নিতে সেনা পাঠানোর অনুমতি দেয়নি। ইসলামাবাদ জানিয়েছে, বর্তমান চুক্তির আওতায় পাকিস্তানি সেনারা সৌদি আরবের ভূখণ্ড রক্ষা করবেন; হুতিদের ওপর হামলা চালাতে ইয়েমেনে প্রবেশ করবেন না।












Disqus comments are not configured yet.