ফ্রান্সে জনরোষের নেপথ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য, অনলাইনে ষড়যন্ত্রতত্ত্বের প্রচার
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জরাজীর্ণ অবস্থা, শিক্ষক সংকট, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরকারি সেবার মানের অবনতির প্রতিবাদে ফ্রান্সে তীব্র নাগরিক অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দেশটির বিভিন্ন এলাকায় কারফিউ জারি করা হয়েছে। প্যারিসসহ প্রধান শহরগুলোতে বিরাজ করছে থমথমে অবস্থা। তবে এই অস্থিরতার মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য ও অপপ্রচার ছড়াচ্ছেন কয়েকজন বিদেশি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও ষড়যন্ত্র তাত্ত্বিক।
এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফ্রান্সের চলমান সংকটকে কেন্দ্র করে চরম ডানপন্থী গোষ্ঠী ও ষড়যন্ত্র তাত্ত্বিকেরা অনলাইনে নানা দাবি ছড়াচ্ছেন। কেউ একে শ্বেতাঙ্গবিরোধী অভ্যুত্থান, কেউবা ইসলামপন্থী বিদ্রোহ হিসেবে তুলে ধরছেন। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও ফ্রান্সের সীমান্ত বন্ধ করার আহ্বান জানিয়ে দাবি করেছেন, অভিবাসনের কারণেই দেশটি ধ্বংস হচ্ছে।
তবে স্বাধীন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া অনেক ছবি ও ভিডিওর সঙ্গে ফ্রান্সের বর্তমান পরিস্থিতির কোনো সম্পর্ক নেই। উদাহরণ হিসেবে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত একটি জ্বলন্ত বাসের ভিডিওটি ২০২২ সালে দক্ষিণ ফ্রান্সে ঘটে যাওয়া একটি দুর্ঘটনাজনিত অগ্নিকাণ্ডের পুরোনো দৃশ্য।
এ ছাড়া অ্যালেক্স জোনস ও টমি রবিনসনের মতো প্রভাবশালী ডানপন্থী ব্যক্তিরা কোনো প্রমাণ ছাড়াই ‘সবখানে মৃতদেহ পড়ে আছে’ কিংবা গির্জায় হামলার মতো দাবি করে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন।
প্যারিসের শ্রমিক-অধ্যুষিত শহরতলি থেকে শুরু হওয়া আন্দোলনটি বর্তমানে মার্সেই, বোর্দো, লিওঁ, নিস ও স্ট্রাসবার্গের মতো প্রধান শহরগুলোতে ছড়িয়ে পড়েছে।
আন্দোলন ঘিরে সহিংসতায় এখন পর্যন্ত শত শত পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। লিমোজ শহরে ফরাসি ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে পরিচিত ১৪০ বছরের পুরোনো একটি টাউন হল অগ্নিকাণ্ডে আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রাজধানী প্যারিসসহ বিভিন্ন স্থানে পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। মুখোশধারী কিছু দল দোকানপাট ও সুপারমার্কেটে ভাঙচুর ও লুটপাট চালিয়েছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাখোঁ সরকারি সম্পত্তি রক্ষা এবং সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রজাতন্ত্রে সহিংসতার কোনো স্থান নেই।’
প্রাথমিকভাবে শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী এবং বিদ্যালয়ের জরাজীর্ণ অবকাঠামোর প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা রাজপথে নামেন। পরে শিক্ষক, অভিভাবক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন তাদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করলে আন্দোলন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
এ ছাড়া দক্ষিণ ফ্রান্সে ডিজেলের দাম বৃদ্ধি ও ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতিতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে উঠেছে। আন্দোলনকারীদের মতে, কেবল শিক্ষাব্যবস্থার সংকট নয়, বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্যই এই ব্যাপক জনঅসন্তোষের অন্যতম প্রধান কারণ।
ফ্রান্সে রাজপথে নেমে দাবি আদায়ের ঐতিহ্য দীর্ঘদিনের। ১৩৫৮ সালের কৃষক বিদ্রোহ, ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লব, ১৮৩০ ও ১৮৪৮ সালের গণ-অভ্যুত্থান এবং ১৯৬৮ সালের মে আন্দোলন- দেশটির রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসে এসব ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রয়েছে।
এই ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা বর্তমান প্রজন্মের প্রতিবাদী মনোভাবেও ভূমিকা রাখছে। ফরাসিদের একটি বড় অংশের বিশ্বাস, আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারের কাছ থেকে কার্যকর সিদ্ধান্ত ও পরিবর্তন আদায় করা সম্ভব।
তবে চলমান সংকটের প্রকৃত কারণ ও ব্যাপ্তি নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভ্রান্তিকর তথ্য পরিস্থিতি সম্পর্কে জনমতকে প্রভাবিত করছে। ফলে দেশটির নাগরিক অসন্তোষের পেছনে থাকা শিক্ষা, অর্থনীতি ও সরকারি সেবাসংক্রান্ত সমস্যাগুলো অনলাইন অপপ্রচারের ভিড়ে আড়ালে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।












Disqus comments are not configured yet.