কিশোরগঞ্জের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে গর্ব: একুশে পদক পেলেন করিমগঞ্জের ইসলাম উদ্দিন
কিশোরগঞ্জের জনপ্রিয় পালাকার ইসলাম উদ্দিন (৫৮) চলতি বছর নাট্যকলা বিভাগে একুশে পদকে ভূষিত হয়েছেন। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তন-এ আয়োজিত অনুষ্ঠানে তাঁর হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে একুশে পদক তুলে দেওয়া হয়।
পদকের জন্য তিনি কোনো আবেদন না করলেও গত ৫ জানুয়ারি সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে ফোনে সুখবরটি পান। পরে ২১ ও ২২ ফেব্রুয়ারি তাঁর মোবাইল ফোনে পাঠানো বার্তায় পদক প্রদান অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার অনুরোধ জানানো হয়।
করিমগঞ্জ উপজেলার নোয়াবাদ ইউনিয়নের নোয়াবাদ গ্রামের বাসিন্দা ইসলাম উদ্দিন এ সম্মাননায় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, এটি তাঁর দীর্ঘদিনের সাধনা ও লোকসংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসার স্বীকৃতি। তাঁর এই অর্জনে গর্বিত এলাকাবাসীও। দেশের বিভিন্ন জেলায় নিয়মিত পালাগানের আমন্ত্রণ পাওয়ার পাশাপাশি বিদেশের মঞ্চেও নিজের শিল্পকলা প্রদর্শন করেছেন তিনি। ১৯৯৯ সালে প্রথম লন্ডনে পালাগান পরিবেশন করেন। পরে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের অনুষ্ঠানে অংশ নিতে সরকারিভাবে ফ্রান্সে যান। এছাড়া ভারতেও পালাগান পরিবেশন করেছেন।
সম্প্রতি নোয়াবাদের দর্গাভিটা বাজারে তাঁর সঙ্গে কথা হলে দেখা যায়, স্বল্প পুঁজির একটি রকমারি দোকান পরিচালনা করছেন তিনি। দোকানের পেছনেই গড়ে তুলেছেন ছোট একটি স্টুডিও। সেখানে একটি কম্পিউটার রয়েছে, যেখানে মাঝে মাঝে কাজ করেন তাঁর ছেলে দিদারুল ইসলাম। দোকানেই বসে ইসলাম উদ্দিন শোনান শৈশব থেকে আজ পর্যন্ত তাঁর লোকজ সংগীত ও নাট্যচর্চার গল্প।
মাত্র ১৩ বছর বয়সে বাবাকে হারান ইসলাম উদ্দিন। মা আমেনা খাতুন ও দুই বড় ভাইকে নিয়ে সংসার চললেও আর্থিক সচ্ছলতা ছিল না। বড় ভাইরা দিনমজুরি করে পরিবার চালাতেন। সেই কঠিন সময়েই পালাগানের প্রতি তাঁর আগ্রহ জন্ম নেয়। নেত্রকোণার বরেণ্য পালাকার কুদ্দুস বয়াতি-এর পালা শুনে অনুপ্রাণিত হন তিনি। ১৯৮৮ সালে কুদ্দুস বয়াতির বাড়িতে গিয়ে টানা নয় মাস তালিম নেন। পরের বছর থেকেই মঞ্চে নিয়মিত পরিবেশনা শুরু করেন এবং ধীরে ধীরে পরিচিতি বাড়তে থাকে।
কর্মজীবনের শুরুতে ঝুমুর যাত্রাপালায় গান ও অভিনয় করেন ইসলাম উদ্দিন। লোককাহিনিভিত্তিক সিনেমায় অভিনয়ের পাশাপাশি গানও গেয়েছেন। ‘কীর্তনখোলা’, ‘পাগলা ঘোড়া’ এবং নুহাশ হুমায়ুন-এর ওয়েব সিরিজ ‘বেসুরা’-তেও অভিনয় ও সংগীত পরিবেশন করেছেন। বর্তমানে স্থানীয় পরিচালক মোস্তাফিজ মামুনের ‘জলমহল’ সিনেমায় কাজ করছেন। এতে গান লেখা, সুরারোপ, কণ্ঠদান ও অভিনয়—সবকিছুই করছেন নিজে।
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলেও তাঁর অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার স্বীকৃতি হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়-এর নাট্যকলা বিভাগে প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।
ব্যক্তিজীবনে তিন সন্তানের জনক ইসলাম উদ্দিন। বড় মেয়ে দিলরুবা আক্তারের মাস্টার্স সম্পন্ন হয়েছে। ছেলে দিদারুল ইসলাম জেলা শহরের ওয়ালী নেওয়াজ খান কলেজ থেকে ভূগোল বিষয়ে অনার্স শেষ করে মাস্টার্সে ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ছোট মেয়ে মাহবুবা আক্তার অনার্সে ভর্তি হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। দিদারুল ইসলাম বলেন, “বাবা খুবই খোলা মনের মানুষ। তিনি কোনো কিছুই গোপন করেন না।”
লোকজ সংস্কৃতির ধারক ও বাহক হিসেবে ইসলাম উদ্দিনের একুশে পদক প্রাপ্তি কিশোরগঞ্জের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নতুন গর্বের সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।





Warning: Array to string conversion in /home/dkishoreganj/public_html/wp-content/plugins/gs-facebook-comments/public/class-wpfc-public.php on line 311
Array