বাজিতপুরে ফেরিঘাটে টোল নৈরাজ্য, চরম ভোগান্তিতে যাত্রী-চালক
সংগ্রহীত
কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর উপজেলার পাটুলী ফেরিঘাটে যানবাহন পারাপারে সরকার নির্ধারিত টোল হার মানা হচ্ছে না-এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি টাকা আদায়ের কারণে চালক, ব্যবসায়ী ও সাধারণ যাত্রীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।
সরকারি তালিকা অনুযায়ী ৩ টন পর্যন্ত মিনি ট্রাক পারাপারের টোল ৯৫ টাকা হলেও বাস্তবে আদায় করা হচ্ছে ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা। কৃষি কাজে ব্যবহৃত ট্রাক্টর বা পাওয়ার টিলারের ক্ষেত্রে ৭৫ টাকার বদলে নেওয়া হচ্ছে প্রায় ৬০০ টাকা। মাইক্রোবাস ও ফোর-হুইল যানবাহনের জন্য নির্ধারিত ৫০ টাকার পরিবর্তে ৪০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে।
ব্যক্তিগত সিডান কারের জন্য ৩০ টাকার স্থলে নেওয়া হচ্ছে প্রায় ৪০০ টাকা। অটোরিকশা, সিএনজি ও অন্যান্য ৩/৪ চাকার যানবাহনের ক্ষেত্রে ১৫ টাকার পরিবর্তে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। মোটরসাইকেলের জন্য ৫ টাকার বদলে ৩০ টাকা এবং রিকশা-ভ্যানের ক্ষেত্রে ৫ টাকার পরিবর্তে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।
ভুক্তভোগীরা জানান, দীর্ঘদিন ধরেই এই অতিরিক্ত টোল আদায় চললেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যাচ্ছে না।
অটোরিকশা চালক ও সবজি ব্যবসায়ী মালেক মিয়া (৩৫) বলেন, “প্রতিদিন পিরোজপুর পাইকারি আড়ত থেকে সবজি কিনে অষ্টগ্রামে বিক্রি করি। ফেরিতে উঠলেই মালামালের ওপর নির্ভর করে ২০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া নেয়।”
হাওরাঞ্চলের কৃষক মজিবুর রহমান (৩৮) বলেন, “বোরো ধান কেটে বাজিতপুরে নিতে গেলে গত মৌসুমে প্রতি গাড়িতে ৮০০ টাকা দিয়েছি। এবার আরও বেশি দিতে হতে পারে।”
হার্ভেস্টার মালিক রমজান আলী (৫২) জানান, “গত মৌসুমে প্রতি হার্ভেস্টার পারাপারে ১,৬০০ থেকে ২,২০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে।” অভিযোগ রয়েছে, রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স থেকেও ৬০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে।
একটি পণ্যবাহী পিকআপের চালক আকাশ মিয়া (২৯) বলেন, “৪০০ টাকা দিয়ে রশিদ চাইলে উল্টো তেড়ে আসে। পরে ভয়ে টাকা দিয়ে চলে আসি।”
বাজিতপুর থেকে অষ্টগ্রাম উপজেলা পরিষদে যাতায়াতকারী এক ব্যক্তি (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) জানান, “প্রতিদিনই ভাড়া নিয়ে বাকবিতণ্ডা হয়। ঘাটের লোকজনের ভয়ে কেউ প্রতিবাদ করতে পারে না। যার কাছ থেকে যেমন ইচ্ছা তেমন ভাড়া নেওয়া হচ্ছে।”
স্থানীয় পাটুলী ঘাটের এক ব্যবসায়ী (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন, “প্রায় প্রতিদিনই চালকদের সঙ্গে ভাড়া নিয়ে বিরোধ হয়, কিন্তু ভয়ের কারণে কেউ মুখ খোলেন না।”
এ সম্পর্কিত একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হলে তোফাজ্জল হোসেন নামে এক ব্যক্তি মন্তব্যে জানান, একটি ধান কাটার মেশিনবাহী ট্রাক পারাপারে তার কাছে ১২ হাজার টাকা দাবি করা হয়। পরে দরকষাকষির মাধ্যমে ৪ হাজার টাকায় পারাপার করা সম্ভব হয়।
ফেরিঘাটের ইজারাদার বকুল ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী বায়েজিদ হোসেন হৃদয় দাবি করেন, তিন বছরের জন্য ইজারা নিলেও পরে অনানুষ্ঠানিকভাবে ঘাট পরিচালনার দায়িত্ব বদরুল আলম শিপু ও পাটুলীর সোহেল (ফ্রিডম সোহেল)-এর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি হননি।
অন্যদিকে ঘাট পরিচালনায় জড়িত সোহেল (ফ্রিডম সোহেল) বলেন, “সারা দেশেই ফেরিতে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া হয়। ঈদের সময় এই হার আরও বাড়ে, কারণ আমাদেরও অতিরিক্ত খরচ থাকে।”
এ বিষয়ে সড়ক ও জনপথ বিভাগের কিশোরগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী শাকিল মোহাম্মদ ফয়সল বলেন, “জনবল সংকটের কারণে বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।” তবে দায় স্বীকার করে তিনি বলেন, “এটি অবশ্যই আমাদের দায়িত্ব। আমরা বিব্রতকর অবস্থায় আছি এবং উপজেলা প্রশাসনের সহায়তায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
বাজিতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শহিদুল ইসলাম সোহাগ জানান, “ফেরিঘাটটি সড়ক ও জনপথ বিভাগের অধীন। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও প্রমাণ পেলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত এই অনিয়ম বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে।











Warning: Array to string conversion in /home/dkishoreganj/public_html/wp-content/plugins/gs-facebook-comments/public/class-wpfc-public.php on line 311
Array