প্রবাসীদের রেমিট্যান্স সহজ করতে মালদ্বীপে বাংলাদেশি ব্যাংকের শাখা খোলার উদ্যোগ
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বাসসকে বলেন, ‘প্রবাসী আয় যাতে বৈধ পথে দেশে আসে, সে জন্য মালদ্বীপে বাংলাদেশি ব্যাংকের শাখা খোলার চেষ্টা করছি।’
তিনি জানান, এ বিষয়ে সহযোগিতা চেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. মোস্তাকুর রহমান মালদ্বীপ মনিটারি অথরিটির (এমএমএ) গভর্নর আহমেদ মুনাওয়ারকে চিঠি পাঠিয়েছেন। এখন মালদ্বীপের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে বাংলাদেশ।
উদ্যোগটি এগিয়ে নিতে সম্প্রতি মালদ্বীপে বাংলাদেশ দূতাবাসের সঙ্গে ভার্চ্যুয়াল বৈঠক করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বৈঠকে বাংলাদেশি ব্যাংকের শাখা স্থাপনের সম্ভাবনা এবং প্রবাসীদের আয় বৈধ চ্যানেলে দেশে পাঠানোর সুযোগ আরও সহজ ও কার্যকর করার বিষয়ে আলোচনা হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ওই কর্মকর্তা জানান, ব্র্যাক ব্যাংক ও ন্যাশনাল ব্যাংকসহ বাংলাদেশের কয়েকটি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক এরই মধ্যে মালদ্বীপে শাখা স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই করেছে। বর্তমানে শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান ও ভারতের কয়েকটি ব্যাংক মালদ্বীপে শাখা পরিচালনা করছে। বাংলাদেশের জন্য এটিকে কার্যকর দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, মালদ্বীপে বাংলাদেশি ব্যাংকের শাখা চালু হলে প্রবাসীরা সহজে ব্যাংকিং সেবা পাবেন এবং অনুমোদিত চ্যানেলে দেশে অর্থ পাঠানো আরও সুবিধাজনক হবে। তবে এ জন্য দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও পারস্পরিক সহযোগিতা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের দেশভিত্তিক প্রবাসী আয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মালদ্বীপ থেকে বাংলাদেশে ১১ কোটি ৮০ লাখ ডলার এসেছে। আগের অর্থবছরে এ পরিমাণ ছিল ১৪ কোটি ১১ লাখ ডলার। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে মালদ্বীপ থেকে প্রবাসী আয় কমেছে প্রায় ১৬ দশমিক ৪ শতাংশ। তবে চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে দেশটি থেকে ৩ কোটি ৮০ লাখ ৫০ হাজার ডলার দেশে এসেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, প্রবাসী আয় কমে যাওয়া এবং অর্থ পাঠাতে বাংলাদেশি কর্মীদের নানা জটিলতার কারণে বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠানোর ব্যবস্থা আরও সহজ, সাশ্রয়ী ও কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ব্যাংকের শাখা স্থাপনের পাশাপাশি মালদ্বীপ থেকে অর্থ পাঠানো সহজ করতে তিনটি নতুন প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
গত ৮ অক্টোবর এমএমএর গভর্নরের কাছে পাঠানো চিঠিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. মোস্তাকুর রহমান দুই দেশের মুদ্রা কর্তৃপক্ষের মধ্যে নিরাপদ, দক্ষ, স্বচ্ছ ও কম ব্যয়ের রেমিট্যান্স ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সহযোগিতা চেয়েছেন।
প্রথম প্রস্তাবে এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (এসিইউ) আওতায় উপযুক্ত ব্যবস্থার মাধ্যমে মালদ্বীপের স্থানীয় মুদ্রা রুফিয়া ব্যবহারের সম্ভাবনা যাচাইয়ের কথা বলা হয়েছে। এ ব্যবস্থা কার্যকর হলে বাংলাদেশে উপকারভোগীরা অনুমোদিত ডিলার ব্যাংকের মাধ্যমে টাকায় সমপরিমাণ অর্থ পাবেন।
দ্বিতীয় প্রস্তাবে মালদ্বীপের লাইসেন্সধারী ব্যাংক ও অর্থ স্থানান্তরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাংলাদেশি নাগরিকদের ভ্রমণসংক্রান্ত যোগ্য পরিশোধ রুফিয়ায় করার সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশে অনুমোদিত ডিলার ব্যাংকগুলো টাকাভিত্তিক কার্ড ইস্যু করবে এবং দুই দেশের সমন্বিত নিয়ন্ত্রক কাঠামোর আওতায় লেনদেনের নিষ্পত্তি হবে।
তৃতীয় প্রস্তাবে বাংলাদেশ ও মালদ্বীপের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় মুদ্রা বিনিময় বা কারেন্সি সোয়াপ ব্যবস্থা চালুর সম্ভাবনা খতিয়ে দেখার কথা বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশি কর্মীদের উপার্জিত অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনা আরও সহজ হতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, এসব প্রস্তাব বাস্তবায়ন দুই দেশের আইন ও সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের ওপর নির্ভর করবে। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা ও মালদ্বীপে বাংলাদেশ মিশনের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি যৌথ প্রতিনিধিদল গঠন করে এমএমএর সঙ্গে বৈঠক করার প্রস্তুতিও রয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। সম্ভাব্য ওই বৈঠকে নিয়ন্ত্রক শর্ত, পরিচালনাগত ব্যবস্থা ও অর্থ নিষ্পত্তির কাঠামো নিয়ে আলোচনা হবে।
মালদ্বীপে বর্তমানে এক লাখের বেশি বাংলাদেশি কর্মরত রয়েছেন। ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে দুই লাখের বেশি বিদেশি কর্মী রয়েছেন, যাঁদের মধ্যে বাংলাদেশির সংখ্যা এক লাখের বেশি।
বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী থাকা সত্ত্বেও মালদ্বীপের স্থানীয় মুদ্রা রুফিয়া সরাসরি গ্রহণে ব্যাংক ও মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানগুলোর অনীহার কারণে প্রবাসীরা বৈধ পথে অর্থ পাঠাতে সমস্যায় পড়ছেন। ফলে অনেককে অনানুষ্ঠানিক বাজার থেকে প্রথমে মার্কিন ডলার কিনে পরে ব্যাংক বা এক্সচেঞ্জ হাউসের মাধ্যমে দেশে অর্থ পাঠাতে হয়। এর সঙ্গে উচ্চ কমিশন যুক্ত হওয়ায় বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠানোর খরচও বেড়ে যায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, এসব জটিলতা বৈধ চ্যানেল ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করে এবং হুন্ডিসহ অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা বাড়ায়। এতে দেশের আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় প্রবাসী আয়ের প্রবাহ সীমিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আশা, প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে মালদ্বীপে বাংলাদেশি ব্যাংকের শাখা চালু এবং প্রস্তাবিত মুদ্রা নিষ্পত্তি ব্যবস্থাগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে অনানুষ্ঠানিক মুদ্রাবাজারের ওপর নির্ভরতা কমবে। একই সঙ্গে লেনদেনের স্বচ্ছতা বাড়বে এবং প্রবাসীরা আরও সহজে পরিবারের কাছে অর্থ পাঠাতে পারবেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এ উদ্যোগের লক্ষ্য প্রবাসী আয় স্থানান্তরকে আরও নিরাপদ, দ্রুত ও কম ব্যয়বহুল করা এবং বৈধ চ্যানেলে দেশে আসা রেমিট্যান্সের পরিমাণ বাড়ানো। তবে উদ্যোগগুলোর বাস্তবায়ন মালদ্বীপ মনিটারি অথরিটির সাড়া, প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক অনুমোদন এবং দুই দেশের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের ওপর নির্ভর করবে।







Disqus comments are not configured yet.