বাঁ থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী মুজিবুর রহমান ইকবাল, বিএনপির প্রার্থী সৈয়দ এহসানুল হুদা, ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীর অধ্যাপক রমজান আলী ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর অ্যাডভোকেট হাসনাত কাইয়ুম
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে কিশোরগঞ্জ-৫ (বাজিতপুর–নিকলী) আসনে ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। স্বাধীনতার পর থেকে একসময় মুসলিম লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই আসনটি পরবর্তী সময়ে বিএনপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিতি পেলেও এবারের নির্বাচনে দলটির ভেতরেই বড় ধরনের বিভাজন দেখা দিয়েছে।
দীর্ঘ দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে বাজিতপুর ও নিকলী উপজেলায় বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা রেখে আসা বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত সাবেক জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমান ইকবাল তৃণমূলে শক্ত অবস্থান গড়ে তুলেছেন। সামাজিক কর্মকাণ্ড, উন্নয়নমূলক উদ্যোগ এবং দলীয় নেতাকর্মীদের সুখে-দুঃখে পাশে থাকার কারণে দুই উপজেলাতেই তার ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।
উঠান বৈঠকে বক্তব্য রাখতে গিয়ে শেখ মুজিবুর রহমান ইকবাল বলেন, “দল আমাকে মূল্যায়ন করছিল। কিন্তু অন্য দলের একজন প্রার্থী তার দলের নিবন্ধন না থাকায় রাতের আঁধারে নিজ দল বিলুপ্ত করে বিএনপিতে যোগ দিয়ে আমার মার্কা লুট করে নিয়েছে। এই বিচারের ভার আমি বাজিতপুর–নিকলীর জনগণের হাতে তুলে দিলাম। দুই যুগের বেশি সময় ধরে পরিবার-পরিজনের খোঁজ না নিয়ে হামলা-মামলা ও জেল-জুলুম সহ্য করে নেতাকর্মীদের পাশে থেকেছি। আজ স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে হচ্ছে—এটা আমার জন্য হৃদয়ের রক্তক্ষরণের মতো।”
তিনি আরও বলেন, নির্বাচিত হলে দল-মত নির্বিশেষে মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবেন এবং এলাকায় উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নে কাজ করবেন।
প্রথমদিকে কেন্দ্র থেকে শেখ মুজিবুর রহমান ইকবালকে বিএনপির মনোনয়ন দেওয়ার গুঞ্জন থাকলেও শেষ পর্যন্ত বিএনপি ও ১২ দলীয় জোটের সমন্বয়ক সৈয়দ এহসানুল হুদাকে ধানের শীষ প্রতীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। উল্লেখ্য, সৈয়দ এহসানুল হুদার দল বাংলাদেশ জাতীয় দল নিবন্ধন না থাকায় গত ২২ ডিসেম্বর দলটি বিলুপ্ত ঘোষণা করে বিএনপিতে যোগ দেয়। এরপর তিনি ধানের শীষ প্রতীকে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পান।
উঠান বৈঠকে সৈয়দ এহসানুল হুদা বলেন, নির্বাচিত হলে তিনি বাজিতপুর–নিকলীর বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ বাস্তবায়ন করবেন। তবে মাঠের বাস্তবতা ভিন্ন বলে মন্তব্য করছেন স্থানীয় ভোটাররা। মনোনয়নকে কেন্দ্র করে বিএনপির ভেতরে স্পষ্ট বিভাজন তৈরি হয়েছে। একাংশ ধানের শীষের পক্ষে থাকলেও তৃণমূলের বড় একটি অংশ শেখ মুজিবুর রহমান ইকবালের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
পরবর্তীতে শেখ মুজিবুর রহমান ইকবাল স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিয়ে হাঁস প্রতীক বরাদ্দ পান। এ অবস্থায় দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষার নামে বিএনপি থেকে একাধিক ধাপে শেখ মুজিবুর রহমান ইকবালসহ বিভিন্ন পর্যায়ের মোট ৫৮জন নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করা হয়। বহিষ্কারের পরও মাঠে ইকবালের পক্ষে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের তৎপরতা আরও বেড়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
অন্যদিকে ধানের শীষের প্রার্থীর পক্ষে মাঠ চাঙা করার চেষ্টা চললেও তা আশানুরূপ ফল দিচ্ছে না বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। সাধারণ মানুষের ধারণা—বিএনপির ভোট এবার দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে, যা ধানের শীষের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।
এদিকে ১১ দলীয় জোট থেকে মনোনীত বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কিশোরগঞ্জ জেলা আমির অধ্যাপক মো. রমজান আলী দাড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে দিন-রাত মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। তিনি দুই উপজেলার বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে ভোটারদের সমর্থন চাইছেন। উঠান বৈঠকে অধ্যাপক রমজান আলী বলেন, নির্বাচিত হলে সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী জলমহাল জনগণের জন্য উন্মুক্ত করবেন এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ এলাকার সার্বিক উন্নয়নে কাজ করবেন।
অন্যদিকে বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের প্রধান ও সভাপতি অ্যাডভোকেট হাসনাত কাইয়ুম দলীয় নিবন্ধন না থাকায় স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে হরিণ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। উঠান বৈঠকে তিনি বলেন, নির্বাচিত হলে দিঘীরপাড়–পাটুলি এলাকায় চামড়ার ট্যানারি স্থাপনসহ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবেন।
এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ থেকে মো. দেলোয়ার হোসেন (হাতপাখা), জাতীয় পার্টি থেকে মাহবুব আলম (নাঙ্গল), বাংলাদেশ মুসলিম লীগ থেকে মো. সাজ্জাদ হোসেন (হারিকেন) এবং বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট থেকে মো. অলিউল্লাহ (মোমবাতি) প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন।
মোট আটজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও মাঠের বাস্তবতায় হাঁস, ধানের শীষ ও দাড়িপাল্লা—এই তিন প্রতীকের মধ্যেই মূল লড়াই সীমাবদ্ধ থাকবে বলে মনে করছেন স্থানীয় ভোটার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। সব মিলিয়ে শেষ মুহূর্তে এসে কিশোরগঞ্জ-৫ আসনের নির্বাচন অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে।