আইএসের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার মামলায় দোষী সাব্যস্ত মার্কিন নারী
ইসলামিক স্টেটের (আইএস) কাছ থেকে অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ নেওয়ার মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জন্ম নেওয়া হালিমা সালমান। কিশোরী বয়সে বাবার সঙ্গে সিরিয়ায় যাওয়ার পর আইএসের এক যোদ্ধার সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। তবে হালিমার আইনজীবীদের দাবি, সে সময় তিনি গৃহযুদ্ধের মধ্যে আটকে পড়েছিলেন এবং স্বামীর নিয়ন্ত্রণে থাকতে বাধ্য হয়েছিলেন।
মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের একটি আদালত হালিমাকে দোষী সাব্যস্ত করেন। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মামলার বিচার চলাকালে তাঁর হাতে একটি স্বয়ংক্রিয় রাইফেল থাকার ভিডিও এবং আইএসের পতাকার সঙ্গে তাঁর একটি ছবি আদালতে উপস্থাপন করা হয়। এ ছাড়া স্বামীর কাছে পাঠানো তাঁর কিছু খুদে বার্তাও প্রমাণ হিসেবে দেখানো হয়।
ব্রুকলিনের মার্কিন অ্যাটর্নি জোসেফ নোসেলা জুনিয়র এক বিবৃতিতে বলেন, এ রায়ের মাধ্যমে একটি সন্ত্রাসী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকার জন্য হালিমাকে দায়ী করা হয়েছে। প্রসিকিউশনের দাবি, তিনি আইএসের প্রতি আনুগত্যের অঙ্গীকার করেছিলেন এবং স্বেচ্ছায় সংগঠনটির কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছিলেন।
তবে হালিমার আইনজীবীরা আদালতে যুক্তি দেন, কিশোরী বয়সে বাবার সঙ্গে সিরিয়ায় যাওয়ার পর তিনি গৃহযুদ্ধের মধ্যে আটকা পড়েন। পরে চরমপন্থী স্বামীর নিয়ন্ত্রণে থাকতে বাধ্য হন। তাঁদের দাবি, স্বামীর নির্দেশ মেনে চলা ছাড়া তাঁর সামনে তেমন কোনো পথ ছিল না।
নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে জন্ম নেওয়া হালিমার বয়স যখন ১৭ বছর, তখন ২০১৭ সালে তাঁর বাবা পুরো পরিবারকে নিয়ে সিরিয়ায় যান। হালিমার ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি ভেবেছিলেন, তাঁরা তুরস্কে আত্মীয়দের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছেন। কিন্তু তাঁদের বহনকারী ভ্যানটি সিরিয়ায় ঢুকে পড়লে মুখোশধারী কয়েকজন বন্দুকধারী তাঁদের ঘিরে ধরে।
আদালতে হালিমা বলেন, সে সময় তিনি ভীত ছিলেন এবং কী ঘটছে, তা বুঝতে পারছিলেন না। তাঁর বাবা তাঁদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন, সে সম্পর্কেও তাঁর ধারণা ছিল না। সিরিয়ায় পৌঁছানোর পর পরিবারের সঙ্গে পুনরায় মিলিত হওয়ার আগে প্রায় তিন মাস আইএস পরিচালিত একটি আবাসনকেন্দ্রে ছিলেন বলে জানান তিনি। বিমান হামলায় বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তাঁদের দুবার বাসা পরিবর্তন করতে হয়।
হালিমার বক্তব্য অনুযায়ী, তাঁর বাবা তাঁকে আইএসের এক যোদ্ধার সঙ্গে বিয়ে দেন। ১৮ বছর বয়সে জোর করে বিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত তিনি মেনে নেননি। বিয়ের পরও একাধিকবার বিবাহবিচ্ছেদের চেষ্টা করেছিলেন বলে আদালতে জানান তিনি।
বিয়ের প্রথম দিনের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে হালিমা বলেন, তাঁর স্বামী তাঁকে ঘুম থেকে তুলে স্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের কথা বলেছিলেন। দাম্পত্য জীবনের বেশির ভাগ সময় তাঁকে স্বামী ও শাশুড়ির জন্য ঘরের কাজ করতে হতো বলে জানান তিনি।
২০১৮ সালে বিমান হামলায় আহত হওয়ার পর তাঁর বাবা মারা যান। হালিমার ভাষ্য অনুযায়ী, দাম্পত্য জীবনের শেষ বছরটি ছিল বিশেষভাবে ভয়াবহ। প্রায়ই বোমা হামলা হতো এবং কখনো কখনো তাঁদের রাস্তায় রাত কাটাতে হতো। সেই সময়ের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, চারদিকে শুধু মৃতদেহ দেখতে পেতেন।
মামলায় প্রসিকিউশন দাবি করে, হালিমার স্বামী তাঁর হাতে একটি স্বয়ংক্রিয় রাইফেল থাকার ভিডিও ধারণ করেছিলেন এবং তাঁকে অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। তবে হালিমা সাক্ষ্য দিতে গিয়ে বলেন, স্বামীর অনুরোধেই তিনি রাইফেলটি হাতে নিয়েছিলেন।
জেরার সময় তাঁর কাছে স্বামীকে ওসামা বিন লাদেনকে নিয়ে একটি ধর্মীয় গান পাঠানোর বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়। এ ছাড়া স্বামীর কাছে পাঠানো দুটি স্নেহপূর্ণ খুদে বার্তা দেখিয়ে তাঁর দাম্পত্য জীবন সম্পর্কে দেওয়া বক্তব্য নিয়েও প্রশ্ন তোলেন আইনজীবীরা।
অন্যদিকে, হালিমার আইনজীবীরা দাবি করেন, স্বামীর নিয়ন্ত্রণে থাকার কারণে তিনি স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন না। তাঁদের মতে, সিরিয়ায় তাঁর ভূমিকা সম্পর্কে হালিমার বক্তব্যের পাশাপাশি সে সময়ের পরিস্থিতি ও তাঁর ব্যক্তিগত স্বাধীনতার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
২০১৯ সালে সিরিয়ার বাঘুজ এলাকায় আইএসবিরোধী বাহিনীর হাতে আটক হন হালিমা। ২০২৪ সালে নিউইয়র্কে ফিরে এলে যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষ তাঁকে গ্রেপ্তার করে।
রায় ঘোষণার পর হালিমা, তাঁর মা ও আইনজীবীরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। পরে আদালতের ভেতরে রেলিংয়ের দুই পাশ থেকে হালিমা ও তাঁর মা একে অপরকে জড়িয়ে ধরেন।
হালিমার আইনজীবীরা রায় বাতিল করে তাঁকে খালাস দেওয়ার আবেদন করছেন। যুক্তরাষ্ট্রের আইনে, উপস্থাপিত প্রমাণের ভিত্তিতে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা সম্ভব না হলে বিচারক রায় বাতিল করে খালাস দিতে পারেন। তবে এ ধরনের আবেদন খুব কম ক্ষেত্রেই মঞ্জুর হয়।
এই অপরাধে হালিমার সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। আগামী ২ ফেব্রুয়ারি তাঁর সাজা ঘোষণার দিন নির্ধারণ করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র সরকার আইএসকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ২০১৪ সালে গোষ্ঠীটি ইরাক ও সিরিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে নিজেদের খিলাফত ঘোষণা করেছিল। পরে ইরাক ও সিরিয়ায় তাদের নিয়ন্ত্রিত ভূখণ্ডের পতন ঘটলেও গোষ্ঠীটির সদস্যরা এখনো বিভিন্ন এলাকায় গোপনে সক্রিয় রয়েছে।










Disqus comments are not configured yet.