মেয়েকে তীরে তুললেন, আর ফিরলেন না বাবা
সন্তানের জন্য একজন বাবা কতটা নিঃস্বার্থ হতে পারেন—তার আরেকটি হৃদয়বিদারক দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন কিশোরগঞ্জের বাছির উদ্দিন মিলন (৪২)। হাওরের গভীর পানিতে ডুবে যাওয়া মেয়েকে বাঁচাতে এক মুহূর্তও দ্বিধা করেননি তিনি। প্রাণপণ চেষ্টায় মেয়েকে নিরাপদে তীরে তুলতে সক্ষম হলেও আর নিজে ফিরে আসতে পারেননি। হাওরের গভীর পানিতে নিভে যায় এক স্নেহময় বাবার জীবন।
শুক্রবার (২৪ জুলাই) বিকেলে কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার বালিখলা হাওরসংলগ্ন মিঠামইন উপজেলার হাসানপুর ব্রিজ এলাকায় এ হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে। কয়েক মুহূর্ত আগেও যেখানে পরিবার নিয়ে আনন্দঘন সময় কাটছিল, অল্প সময়ের ব্যবধানে সেখানে নেমে আসে শোকের ছায়া।
নিহত মো. বাছির উদ্দিন মিলন কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার গাইটাল পেট্রোল পাম্প এলাকার বাসিন্দা এবং মো. আবু বাক্কার মাস্টারের ছেলে। তিনি ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ফিজিওথেরাপিস্ট হিসেবে কর্মরত ছিলেন। কর্মজীবনে অসংখ্য মানুষের শারীরিক কষ্ট লাঘবে কাজ করা এই মানুষটি শেষ মুহূর্তে নিজের জীবন উৎসর্গ করে বাঁচিয়ে গেলেন নিজের মেয়েকে।
স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কয়েক দিনের ছুটিকে স্মরণীয় করে রাখতে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে হাওরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে যান মিলন। পরিবারের সদস্যরা নৌকায় করে হাওর ভ্রমণ করছিলেন। একপর্যায়ে করিমগঞ্জ উপজেলার শেষ সীমান্ত ও মিঠামইন উপজেলার হাসানপুর ব্রিজসংলগ্ন একটি ডুবুডুবু সড়কের পাশে নৌকা ভিড়িয়ে সবাই গোসল করতে পানিতে নামেন।
গোসলের সময় হঠাৎ অসাবধানতাবশত গভীর পানিতে তলিয়ে যেতে শুরু করে মিলনের মেজো মেয়ে শেমন্ত্রী আক্তার। মেয়েকে পানিতে হাবুডুবু খেতে দেখে এক মুহূর্তও অপেক্ষা করেননি তিনি। নিজের জীবনের ঝুঁকি উপেক্ষা করে দ্রুত পানিতে ঝাঁপ দেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, প্রাণপণ চেষ্টা করে মেয়েকে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দিতে সক্ষম হন মিলন। কিন্তু মেয়েকে বাঁচানোর সেই লড়াইয়ে নিজেই তীব্র স্রোত ও গভীর পানির সঙ্গে আর পেরে ওঠেননি। কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি পানির নিচে তলিয়ে যান।
পরিবারের সদস্যদের চিৎকারে আশপাশের লোকজন ছুটে আসেন। স্থানীয় নৌকার মাঝি ও এলাকাবাসী দীর্ঘ সময় উদ্ধার অভিযান চালিয়ে তাকে পানির নিচ থেকে উদ্ধার করেন। তবে ততক্ষণে তিনি মারা যান।
ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। পরিবারের সদস্যদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। কয়েক ঘণ্টা আগেও যিনি স্ত্রী-সন্তানদের সঙ্গে আনন্দে সময় কাটাচ্ছিলেন, কিছুক্ষণের মধ্যেই তার নিথর দেহ ঘিরে কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনরা।
শুক্রবার রাত ১০টার দিকে কিশোরগঞ্জ সার্কিট হাউসের সামনে তার জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় আত্মীয়-স্বজন, সহকর্মী, বন্ধু এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। পরে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
সহকর্মীরা জানান, মিলন ছিলেন অত্যন্ত শান্ত, দায়িত্বশীল ও মানবিক একজন ব্যক্তি। রোগীদের প্রতি তার আন্তরিকতা ও সেবার মান ছিল প্রশংসনীয়। পরিবারই ছিল তার জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি। সেই পরিবারের একজন সদস্যকে বাঁচাতেই তিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন।
করিমগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সোহেব খান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, “মেয়েকে উদ্ধার করতে গিয়ে বাছির উদ্দিন মিলন পানিতে তলিয়ে যান। পরে স্থানীয়দের সহায়তায় তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।”











Warning: Array to string conversion in /home/dkishoreganj/public_html/wp-content/plugins/gs-facebook-comments/public/class-wpfc-public.php on line 311
Array