চলতি বছরের শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাবে বিশ্বজুড়ে রেকর্ড দাবদাহ, তীব্র খরা, দাবানল ও পানির সংকটের ঝুঁকি বাড়ছে। এর প্রভাবে চলতি বছরের জুন থেকে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত স্বাভাবিক বছরের তুলনায় অতিরিক্ত প্রায় ৪ লাখ ৫১ হাজার মানুষের তাপজনিত মৃত্যু হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাব। বুধবার প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে এ প্রক্ষেপণ তুলে ধরা হয়েছে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, এ বছরের জুন থেকে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এল নিনোর পুরো সময়কালে স্বাভাবিক বছরের তুলনায় অতিরিক্ত ৪ লাখ ৫১ হাজার মানুষের তাপজনিত মৃত্যু হতে পারে। তবে এল নিনোর প্রভাব ফেব্রুয়ারির পরও অব্যাহত থাকতে পারে এবং এর ফলে তাপজনিত মৃত্যুর ঝুঁকিও আরও বাড়তে পারে।
গবেষণার সহলেখক ও ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাবের সহপ্রতিষ্ঠাতা মাইকেল গ্রিনস্টোন বলেন, ফেব্রুয়ারি নাগাদ এল নিনোর প্রভাব শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তাপের ঝুঁকি তার পরেও থাকতে পারে। আবহাওয়ার এই চরম পরিবর্তনের প্রভাব আগামী বছরের গ্রীষ্মকাল পর্যন্ত অনুভূত হতে পারে বলেও তিনি জানান।
গ্রিনস্টোন বলেন, অতিরিক্ত তাপমাত্রা বিশেষ করে সেসব অঞ্চলে বেশি বিপজ্জনক, যেগুলো আগে থেকেই তুলনামূলক উষ্ণ এবং দরিদ্র। তাঁর ভাষায়, কোনো অঞ্চল আগে থেকেই তপ্ত হলে সেখানে তাপমাত্রা আরও কয়েক ডিগ্রি বেড়ে যাওয়ায় মানুষের জীবনের জন্য ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। ধনী দেশগুলোতে সাধারণত শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (এসি), নির্ভরযোগ্য পানি সরবরাহ এবং উন্নত স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ বেশি থাকায় এসব দেশের মানুষের তাপ মোকাবিলার সক্ষমতাও তুলনামূলক বেশি।
গবেষণায় বিশ্বের ২৪ হাজারের বেশি অঞ্চলের স্থানীয় তাপমাত্রা এবং তাপমাত্রার পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষের মৃত্যুহারের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষকেরা গত তিন দশকের তাপমাত্রাজনিত মৃত্যুহারের সঙ্গে ২০২৬ সালের জুন থেকে ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এল নিনো সময়কালে সম্ভাব্য মৃত্যুহারের তুলনা করে অতিরিক্ত প্রাণহানির এই হিসাব করেছেন।
গবেষকদের মতে, এল নিনোর কারণে অতিরিক্ত গরমের সবচেয়ে বড় ধাক্কা যেতে পারে গ্লোবাল সাউথের উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর। আফ্রিকার সাহারা মরুভূমির দক্ষিণ প্রান্তের শুষ্ক সাহেল অঞ্চলকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সেখানে এল নিনোর কারণে অতিরিক্ত প্রায় ৬৬ হাজার ৮০০ মানুষের তাপজনিত মৃত্যু হতে পারে।
এ ছাড়া দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলকেও উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ায় সম্মিলিতভাবে প্রায় ১৯ হাজার ৪০০ জন, ইন্দোনেশিয়ায় ১৯ হাজার ৩০০ জন, ভারতে ১৫ হাজার ৮০০ জন এবং ব্রাজিলে ১৩ হাজার ৩০০ জনের অতিরিক্ত তাপজনিত মৃত্যু হতে পারে বলে গবেষণায় প্রক্ষেপণ করা হয়েছে।
এ ধরনের প্রাণহানি কমাতে গবেষণায় বিভিন্ন দেশের সরকারের জন্য আগাম প্রস্তুতি নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দাবদাহের আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা চালু, শীতলীকরণ কেন্দ্র স্থাপন, বিনা মূল্যে খাবার পানির বুথ চালু, উন্মুক্ত স্থানে কর্মরত শ্রমিকদের সুরক্ষা, হাসপাতালের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বয়স্ক ও স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকা মানুষের ওপর বাড়তি নজরদারি।
গবেষকেরা আরও বলেছেন, তাপমাত্রা চরম পর্যায়ে পৌঁছানোর আগেই সরকারগুলো যাতে জরুরি অর্থ ছাড় ও প্রয়োজনীয় সম্পদ প্রস্তুত রাখতে পারে, সে জন্য ‘পূর্বাভাসভিত্তিক অর্থায়ন’ ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন।
ভারতভিত্তিক জলবায়ু বিশেষজ্ঞ অভিযন্ত তিওয়ারি বলেন, প্রতিবেদনটি আতঙ্ক ছড়ানোর জন্য নয়; বরং দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ হিসেবে দেখা উচিত। তাঁর মতে, ভারতের মতো দেশগুলোর সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকা এক বিষয়, আর সেসব পরিকল্পনা মাঠপর্যায়ে কার্যকর করা ও প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করা সম্পূর্ণ ভিন্ন চ্যালেঞ্জ।
এল নিনো মূলত একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু চক্র। তবে মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ইতিমধ্যে উত্তপ্ত হয়ে থাকা পৃথিবীতে চলতি বছরের অস্বাভাবিক শক্তিশালী এল নিনো চরম তাপমাত্রার ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাবের হিসাবে, চলতি এল নিনোর সময়ে বিশ্বের স্থলভাগের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ১ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি হতে পারে। এর ফলে স্বাভাবিক বছরের তুলনায় চরম গরমের দিন প্রায় ৪৪ শতাংশ বেড়ে যেতে পারে।
গবেষকদের মতে, চলতি এল নিনোর সময় যে মাত্রার তাপমাত্রা দেখা যাচ্ছে, তা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে প্রায় ২০ বছর পর পৃথিবীর স্বাভাবিক তাপমাত্রার চিত্র হয়ে উঠতে পারে। এ কারণে বর্তমান পরিস্থিতিকে তাঁরা ভবিষ্যতের জলবায়ুর একটি ‘আগাম বার্তা’ হিসেবেও দেখছেন।
গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই পরিস্থিতি নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত। কোন কোন অঞ্চলে এখনই জরুরি পদক্ষেপ নিলে বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবন রক্ষা করা সম্ভব, তা চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। গবেষকদের মতে, এল নিনোর প্রভাবে সৃষ্ট এই অতিরিক্ত তাপ আগামী দিনের জলবায়ু সংকটের সম্ভাব্য চিত্রও সামনে তুলে ধরছে।
Warning: Array to string conversion in /home/dkishoreganj/public_html/wp-content/plugins/gs-facebook-comments/public/class-wpfc-public.php on line 311
Array