দুই দশক ধরে ফুটবলকে নতুন ভাষা শেখানো এক জাদুকর মেসি
ফুটবলার আসে, ফুটবলার যায়। চেনা-অচেনা কত শত নক্ষত্র ক্ষণিকের আলোয় আলোকিত করে সবুজ গালিচা, তারপর সময়ের নির্মম নিয়মে হারিয়ে যায় বিস্মৃতির অতল গহ্বরে। কিন্তু খুব কম মানুষই আছেন, যাঁরা সময়কে হারিয়ে নিজেরাই ইতিহাস হয়ে ওঠেন। গত দুই দশক ধরে ফুটবল নামের ব্যাকরণটিকে যিনি বারবার নতুন করে লিখেছেন, তাঁর নাম লিওনেল আন্দ্রেস মেসি।
তিনি শুধু ফুটবল খেলেন না; সবুজ ক্যানভাসে বুটের প্রতিটি স্পর্শে লিখে চলেন এক একটি মহাকাব্য।
২০০৭ সালে যখন ব্রাজিলিয়ান জাদুকর কাকা ব্যালন ডি’অর উঁচিয়ে ধরলেন, কিংবা ২০০৮ সালে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো প্রথমবারের মতো ফুটবলের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত সম্মানে ভূষিত হলেন, তখন মেসির ঝুলিতে ছিল না একটি ব্যালন ডি’অরও। কে জানত, সেই শূন্যতাই একদিন হয়ে উঠবে ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল সূচনা!
অতঃপর শুরু হলো এক অভূতপূর্ব সাম্রাজ্যের উত্থান।
২০০৯ থেকে ২০১২—টানা চার বছর ব্যালন ডি’অর জিতে মেসি শুধু সমসাময়িকদের ছাড়িয়ে যাননি, ফুটবলকে নিয়ে গেছেন এক নতুন উচ্চতায়। পরে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন করে পাঁচটি ব্যালন ডি’অর জিতে সমতায় ফিরলে অনেকেই ভেবেছিলেন, মেসির রাজত্ব বুঝি শেষ।
কিন্তু কিংবদন্তিরা শেষ হন না, তাঁরা নতুন করে নিজেদের সংজ্ঞায়িত করেন।
সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মেসি নিজের শ্রেষ্ঠত্ব আরও উঁচুতে নিয়ে গেছেন। আজ তাঁর ট্রফি কেবিনেটে শোভা পাচ্ছে রেকর্ড আটটি ব্যালন ডি’অর। শুধু তাই নয়, ইউরোপিয়ান গোল্ডেন বুটের লড়াইয়েও রোনালদোর চারটির বিপরীতে ছয়বার এই সম্মান জিতে তিনি প্রমাণ করেছেন—গোল করার শিল্পেও তিনিই সর্বোচ্চ মানদণ্ড।
মেসির ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বিস্ময়কর অধ্যায় তাঁর দীর্ঘস্থায়ী আধিপত্য।
তাঁর চোখের সামনেই উত্থান হয়েছে অসংখ্য কিংবদন্তির, আবার সময়ের স্রোতে তাঁদের অনেকেই হারিয়েও গেছেন। কিন্তু মেসি যেন সময়ের বাইরের এক চরিত্র।
প্রথম প্রজন্ম—কাকা, রবিনহো, ওয়েসলি স্নেইডার, ফ্রাঙ্ক রিবেরি। তাঁদের সোনালি সময়েই নিজের সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন মেসি।
দ্বিতীয় প্রজন্ম—নেইমার, লুইস সুয়ারেজ, সার্জিও আগুয়েরো, জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচ, আনহেল দি মারিয়া। বার্সেলোনা, পিএসজি এবং আর্জেন্টিনার জার্সিতে এই প্রজন্মের সঙ্গে পথচলায়ও তিনিই ছিলেন কেন্দ্রীয় চরিত্র।
বর্তমান প্রজন্ম—কিলিয়ান এমবাপ্পে, আর্লিং হালান্ড, জুড বেলিংহাম। বিশ্ব ফুটবলের নতুন মুখগুলো যখন নিজেদের সেরা সময় পার করছে, তখনও ৩৯ বছর বয়সী মেসি তাঁদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
২০২২ বিশ্বকাপের ফাইনালে এমবাপ্পের ফ্রান্সকে হারিয়ে তিনি পূরণ করেন ক্যারিয়ারের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত স্বপ্ন। আর ২০২৬ বিশ্বকাপের হাইভোল্টেজ সেমিফাইনালে জুড বেলিংহামের ইংল্যান্ডকে বিদায় করে আবারও মনে করিয়ে দেন—মেসির জাদু সময়ের সঙ্গে ম্লান হয় না, বরং আরও পরিণত হয়।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলেছে মেসির খেলার ধরনও।
তরুণ বয়সের সেই বিস্ফোরক গতি, অবিশ্বাস্য ড্রিবলিং কিংবা টানা ৫০ গজ দৌড়ে গোল করার দৃশ্য আজ তুলনামূলক কম দেখা যায়। কারণ এখন তিনি গতির নয়, বুদ্ধিমত্তার ফুটবল খেলেন।
মাঠ এখন তাঁর কাছে যেন এক বিশাল দাবার বোর্ড।
প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে কয়েক চাল আগেই পড়ে ফেলেন তিনি। কখন গতি বাড়াতে হবে, কখন খেলা ধীর করতে হবে, কখন একটি নিখুঁত থ্রু-পাসে পুরো ডিফেন্স চিরে দিতে হবে—এসব যেন তাঁর সহজাত প্রবৃত্তি।
সবুজ গালিচায় তাঁকে দেখে অনেক সময় মনে হয়, একজন গ্র্যান্ডমাস্টার দাবার গুটি সাজাচ্ছেন, আর বাকিরা কেবল তাঁর চালের অপেক্ষায়।
আজ ৩৯ বছরের এক অভিজ্ঞ ফুটবল-মস্তিষ্কের সামনে বিশ্বের সেরা ২৫-২৮ বছর বয়সী তারকারাও অনেক সময় অসহায় হয়ে পড়েন। কারণ, গতি কমতে পারে, শক্তি ক্ষয় হতে পারে; কিন্তু ফুটবলীয় মেধা, দৃষ্টিভঙ্গি আর সৃজনশীলতা যদি সময়ের সঙ্গে আরও শাণিত হয়, তবে বয়স কেবল জন্মসনদের একটি সংখ্যা হয়ে থাকে।
মেসি সেই বিরল ব্যতিক্রম।
তিনি আর শুধু একজন ফুটবলার নন; তিনি একটি যুগ, একটি দর্শন, একটি চলমান ইতিহাস।
প্রজন্ম বদলাবে, নক্ষত্র বদলাবে, রেকর্ড ভাঙবে—কিন্তু লিওনেল মেসির গল্প ফুটবলের ইতিহাসে চিরকাল এক অনন্ত মহাকাব্য হয়েই বেঁচে থাকবে।





Warning: Array to string conversion in /home/dkishoreganj/public_html/wp-content/plugins/gs-facebook-comments/public/class-wpfc-public.php on line 311
Array