রাজনীতিতে অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগ নতুন কিছু নয়। এক পক্ষ অভিযোগ তোলে, অন্য পক্ষ তা প্রত্যাখ্যান করে। কিন্তু কোনো বক্তব্য যতই দৃঢ় হোক, বাস্তবতার সামনে তার ব্যাখ্যা দেওয়ার দায় এড়ানো যায় না। আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর সম্পর্ক নিয়ে বিএনপি ও জামায়াতের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যের মধ্যে কিশোরগঞ্জে ছাত্রলীগের কমিটিতে এক জামায়াত নেতার ছেলের পদ পাওয়ার ঘটনা নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
গত ১৮ অক্টোবর কার্যক্রম নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কিশোরগঞ্জ জেলা কমিটির পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশের পর বিষয়টি সামনে আসে। জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেন মোল্লার ফেসবুকে প্রকাশিত ওই কমিটিতে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদে নাম রয়েছে ইটনা উপজেলার বাদলা ইউনিয়ন জামায়াতের সভাপতি সিরাজ উদ্দিনের ছেলে আলী আকবর তানভীরের। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় আলোচনা-সমালোচনা।
সিরাজ উদ্দিনের দাবি, ছেলের ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সম্পৃক্ততার বিষয়ে তিনি কিছুই জানতেন না। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তানভীর কয়েক মাস ধরে মালয়েশিয়ায় রয়েছেন। কমিটি প্রকাশের পর ছেলের সঙ্গে কথা হলে তিনি পদত্যাগের কথা জানিয়েছেন বলেও দাবি করেন সিরাজ উদ্দিন। তবে পদত্যাগের কোনো প্রমাণ তাঁর কাছে নেই। এমনকি ছেলের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের নম্বরও তিনি দিতে পারেননি।
অন্যদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তানভীরের নামে প্রচারিত বক্তব্যে ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে নিজের পরিচয় দেওয়ার পাশাপাশি সংগঠন করার সাংবিধানিক অধিকারের কথা বলা হয়েছে। বাবার বক্তব্যের সঙ্গে ছেলের নামে প্রচারিত এই বক্তব্যের পার্থক্যই বিষয়টিকে আরও আলোচনায় এনেছে।
এখানে কয়েকটি প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে। তানভীরের নাম ছাত্রলীগের জেলা কমিটিতে এল কারণ তিনি অবশ্যই আগে থেকেই সংগঠনটির রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। কমিটিতে তাঁর পদ পাওয়ার পেছনে তার মত অবশ্যই ছিলো। আর পদত্যাগের যে কথা বলা হচ্ছে, তার বাস্তব কোন ভিত্তি নাই।
কিশোরগঞ্জের এই ঘটনা এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর সম্পর্ক নিয়ে জাতীয় রাজনীতিতে চলছে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য। ২২ অক্টোবর কিশোরগঞ্জ জেলা জামায়াতের রুকন সম্মেলনে দলটির কেন্দ্রীয় নেতা অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ বলেন, আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামী একাকার হয়ে গেছে- এমন অভিযোগ বাংলাদেশের কোনো পাগলও বিশ্বাস করবে না।
বক্তব্যটি ছিল অভিযোগের বিরুদ্ধে কঠোর রাজনৈতিক প্রত্যাখ্যান। কিন্তু কোনো অভিযোগকে অবিশ্বাস্য বলে উড়িয়ে দিলেই কি সংশ্লিষ্ট সব প্রশ্নের অবসান ঘটে? বিশেষ করে, যে কিশোরগঞ্জে জামায়াত নেতার ছেলের ছাত্রলীগের কমিটিতে পদ পাওয়ার ঘটনা আলোচনায় এসেছে, সেই জেলাতেই এমন বক্তব্য নতুন করে বিতর্কের অবকাশ তৈরি করেছে।
অন্যদিকে, বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বও আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের মধ্যে যোগসাজশের অভিযোগ তুলেছে। গত ২০ অক্টোবর রাজশাহীর এক জনসভায় বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান তাঁর বক্তব্যে শ্রমিক অসন্তোষ তৈরির চেষ্টা, পলাতক স্বৈরাচারের অর্থায়ন এবং নির্বাচনের আগে টিকিট বিক্রির চেষ্টায় কয়েকটি দলের সম্পৃক্ততা নিয়ে গোয়েন্দা তথ্য থাকার কথা বলেন। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাঁর বক্তব্যে আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের দিকে ইঙ্গিত ছিল।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীও আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতের সম্পর্কের প্রমাণ থাকার দাবি করেছেন। তাঁর অভিযোগ, বিএনপির সঙ্গে আওয়ামী লীগের সম্পর্ক নিয়ে জামায়াত অপপ্রচার চালাচ্ছে। এর আগে নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের একই সঙ্গে আন্দোলন করার প্রসঙ্গও তিনি তুলে ধরেছিলেন।
অর্থাৎ, বিএনপি অতীতের রাজনৈতিক আন্দোলন ও সাম্প্রতিক ঘটনাবলির প্রসঙ্গ টেনে যোগসাজশের অভিযোগ করছে। জামায়াত সেই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করছে। কিন্তু রাজনৈতিক বক্তব্যের এই পাল্টাপাল্টির মধ্যে কিশোরগঞ্জের ঘটনাটি স্থানীয় রাজনীতির গণ্ডি ছাড়িয়ে বৃহত্তর রাজনৈতিক বিতর্কের অংশ হয়ে উঠেছে।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রাজনৈতিক বক্তব্যের সত্যতা যাচাইয়ের মানদণ্ড সবার জন্য এক হওয়া প্রয়োজন। প্রতিপক্ষের কর্মকাণ্ডের ব্যাখ্যা দাবি করা হলে নিজেদের ঘিরে ওঠা প্রশ্নেরও জবাব দিতে হবে। কোনো অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হতে পারে, আবার কোনো ঘটনার ব্যাখ্যা অস্পষ্ট থাকলে তা নিয়ে জনমনে সন্দেহও তৈরি হতে পারে। সন্দেহ আর প্রমাণ এক বিষয় নয়- এই পার্থক্য মাথায় রেখেই বিতর্কের বিচার করা জরুরি।
কিশোরগঞ্জের ঘটনায় জামায়াতের স্থানীয় নেতৃত্বের অবস্থান যেমন স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন, তেমনি কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছ থেকেও ব্যাখ্যা প্রত্যাশিত। আলী আকবর তানভীর কীভাবে ছাত্রলীগের কমিটিতে স্থান পেলেন, তাঁর রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা কতটুকু এবং পদত্যাগের দাবি বাস্তবে কার্যকর হয়েছে কি না- এসব প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য উত্তরই পারে বিতর্কের অবসান ঘটাতে।
শেষ পর্যন্ত বিষয়টি শুধু একজনের রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা একটি কমিটিতে পদ পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্য, অবস্থান ও বাস্তব কর্মকাণ্ডের মধ্যে সামঞ্জস্য কতটা রয়েছে, সেই প্রশ্নও সামনে আনে। ‘পাগলেও বিশ্বাস করবে না’- এমন দৃঢ় বক্তব্য দিয়ে বিতর্ক থামানোর চেষ্টা করা যেতে পারে, কিন্তু জনমনে ওঠা প্রশ্নের জবাব দিতে প্রয়োজন তথ্য, প্রমাণ ও স্বচ্ছতা।
কিশোরগঞ্জের মানুষও নিশ্চয়ই জানতে চাইবে, আলোচিত এই ঘটনার প্রকৃত সত্য কী। অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা যেমন অনুচিত, তেমনি প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে সবকিছুকে অবিশ্বাস্য বলে উড়িয়ে দেওয়াও দায়িত্বশীল রাজনৈতিক আচরণ হতে পারে না।
Disqus comments are not configured yet.