স্বপ্নের ঘরে ওঠা হলো না জাহাঙ্গীর আলমের, সুদানে শহীদ বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী
সুদানের আবেই এলাকায় সন্ত্রাসীদের হামলায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ছয়জন শান্তিরক্ষী নিহত হয়েছেন। শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে শহীদের তালিকায় যুক্ত হয়েছেন কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলার জাঙ্গালিয়া ইউনিয়নের তারাকান্দি গ্রামের সন্তান জাহাঙ্গীর আলম (৩০)। গত ৭ নভেম্বর পরিবারের চোখের জল আর বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে তিনি সুদানে পাড়ি জমিয়েছিলেন।
শনিবার (১৩ ডিসেম্বর) আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) এক খুদে বার্তায় জানায়, সুদানের আবেই এলাকায় জাতিসংঘের একটি ঘাঁটিতে সন্ত্রাসীরা অতর্কিত হামলা চালায়। এতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ছয়জন শান্তিরক্ষী নিহত এবং অন্তত আটজন আহত হন। হামলার পরও সন্ত্রাসীদের সঙ্গে সংঘর্ষ চলমান রয়েছে এবং পুরো এলাকা এখনো অস্থিতিশীল।
শহীদ জাহাঙ্গীর আলম তারাকান্দি গ্রামের আকন্দ বাড়ির হযরত আলীর ছেলে। তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে মেসওয়েটার পদে কর্মরত ছিলেন (ব্যক্তিগত নম্বর: সিএস-২২০১০৯)। প্রায় ১১ বছরের বেশি সময় ধরে তিনি সেনাবাহিনীতে সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, তিন ভাইয়ের মধ্যে জাহাঙ্গীর আলম ছিলেন মেজো। তার বড় ভাই মো. মোস্তফা প্রবাসে কর্মরত এবং ছোট ভাই মো. শাহিন মিয়া কৃষিকাজ করেন। স্ত্রী রুবাইয়া আক্তার ও তিন বছরের একমাত্র ছেলে ইরফানকে রেখে শান্তিরক্ষা মিশনে গিয়েছিলেন তিনি।
অল্প অল্প টাকা জমিয়ে একটি পাকা বাড়ি নির্মাণের স্বপ্ন ছিল জাহাঙ্গীর আলমের। বাড়ির নির্মাণকাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে ছিল। মিশন শেষে দেশে ফিরে অসমাপ্ত কাজ শেষ করে পরিবার নিয়ে নতুন ঘরে ওঠার স্বপ্ন দেখছিলেন তিনি। কিন্তু সন্ত্রাসী হামলায় প্রাণ হারানোর মধ্য দিয়ে সেই স্বপ্ন আজ অপূর্ণই থেকে গেল। স্বপ্নের পাকা বাড়িটি এখন দাঁড়িয়ে আছে শোক আর কান্নার নীরব সাক্ষী হয়ে।
নিহতের বৃদ্ধ বাবা-মা বারবার পাকা ঘরে ঢুকে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলছেন, “আমার বাবা আর এই ঘরে আসবে না।” স্ত্রী রুবাইয়া আক্তার কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, “এই ঘর সাজানোর কত স্বপ্ন ছিল। যদি জানতাম এই পোশাক আমার স্বামীকে কেড়ে নেবে, তাহলে কোনো দিনই মিশনে যেতে দিতাম না।” কথা বলতে বলতে তিনি বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন।
খবর পেয়ে নিহতের বাড়িতে যান পাকুন্দিয়া উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) রিফাত জাহান ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুপম দাস। তারা শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন এবং সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দেন। স্বজনদের আহাজারি দেখে সহকারী কমিশনার (ভূমি) নিজেও আবেগ ধরে রাখতে পারেননি।
শহীদ জাহাঙ্গীর আলমের মৃত্যুতে তারাকান্দি গ্রামসহ পুরো পাকুন্দিয়া উপজেলায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। প্রতিবেশীরা জানান, শান্ত স্বভাবের এই মানুষটি দেশের জন্য জীবন দিয়ে গেলেন। সবাই এক কণ্ঠে শহীদ জাহাঙ্গীর আলমের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছেন এবং তার পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন।




