হোসেনপুরে অবাধে নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার, হুমকিতে দেশীয় মাছের অস্তিত্ব
প্রতীকী ছবি
কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর উপজেলায় নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারি ও কারেন্ট জালের অবাধ ব্যবহারে দেশীয় প্রজাতির মাছ এবং জলজ জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। আইন অনুযায়ী এসব জাল উৎপাদন, বিক্রি, পরিবহন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ হলেও প্রশাসনের কার্যকর নজরদারির অভাবে উপজেলার বিভিন্ন খাল-বিল ও জলাশয়ে প্রকাশ্যেই এসব জালের ব্যবহার বেড়ে চলেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলার ছয়টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার অধিকাংশ খাল-বিল দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ দখলের শিকার। বর্ষা মৌসুমে এসব জলাশয় পানিতে পরিপূর্ণ হলে একসময় দেশীয় নানা প্রজাতির মাছের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত ছিল। তখন মৎস্যজীবীরা ছাই, পলো, ঠেলা জাল, বড়শিসহ দেশীয় বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহার করে পর্যাপ্ত মাছ শিকার করতেন।
স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্য, প্রায় এক দশক আগেও বর্ষা মৌসুমে এসব খাল-বিলে পর্যাপ্ত দেশীয় মাছ পাওয়া যেত। কিন্তু বর্তমানে নিষিদ্ধ চায়না দুয়ারি ও কারেন্ট জালের নির্বিচার ব্যবহারের কারণে মাছের পাশাপাশি বিভিন্ন জলজ প্রাণীরও ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। এতে দেশীয় মাছের প্রজনন চক্র মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, অসাধু মাছ শিকারিরা নিজেদের ভোগ ও বাজারজাত করার উদ্দেশ্যে অবাধে চায়না দুয়ারি ও কারেন্ট জাল ব্যবহার করছেন। এসব জালে ছোট-বড় সব ধরনের মাছ নির্বিচারে ধরা পড়ছে। ফলে ডিমওয়ালা মাছ ও পোনা মাছও রক্ষা পাচ্ছে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মাছ শিকারি জানান, বর্ষার নতুন পানি এলেই তারা চায়না দুয়ারি জাল ব্যবহার করেন। এ জালে শুধু মাছ নয়, সাপ, ব্যাঙসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণীও আটকা পড়ে। ফলে জলজ পরিবেশের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।
উপজেলা মৎস্য দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, কয়েক দশক আগেও হোসেনপুর অঞ্চলের নদী-নালা, খাল-বিল ও জলাশয়ে প্রায় আড়াই শতাধিক প্রজাতির দেশীয় মিঠাপানির মাছ পাওয়া যেত। কিন্তু পরিবেশগত পরিবর্তন, জলাশয় দখল, অবৈধ জালের ব্যবহার এবং নির্বিচারে ডিমওয়ালা মাছ শিকারের কারণে এসব মাছের অনেক প্রজাতিই এখন প্রায় বিলুপ্ত।
কিশোরগঞ্জ মৎস্য ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী মাহমুদুল হাসান বলেন, দেশীয় মাছ বিলুপ্ত হওয়ার পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি মানুষের অসচেতনতা বড় কারণ। নিষিদ্ধ জালের অবাধ ব্যবহার মাছের প্রজনন ধ্বংস করছে। হারিয়ে যাওয়া দেশীয় মাছ সংরক্ষণে এখন ব্যাপক গবেষণা চলছে। তবে গবেষণার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে কঠোর আইন প্রয়োগও জরুরি।
হোসেনপুর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সাবিকুন নাহার বলেন, “চায়না দুয়ারি ও কারেন্ট জালের ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। খুব শিগগিরই অভিযান পরিচালনা করে এসব জাল জব্দ এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কাজী নাহিদ ইভা বলেন, “নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার বন্ধে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তাকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তাঁর সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত অভিযান পরিচালনা করা হবে।”
এদিকে স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের দাবি, শুধু অভিযান চালালেই হবে না; নিষিদ্ধ জাল উৎপাদন, বিক্রি ও বাজারজাতের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে খাল-বিল দখলমুক্ত করে দেশীয় মাছের প্রাকৃতিক আবাসস্থল পুনরুদ্ধারে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণেরও আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
তাদের মতে, এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে হোসেনপুরের ঐতিহ্যবাহী দেশীয় মাছের অনেক প্রজাতিই অচিরেই ইতিহাসের অংশ হয়ে যাবে।










