‘সরকারি গাছ কাটছি, এখন কী হয়েছে?’- যশোদলে গাছ কাটা ঘিরে নানা প্রশ্ন
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর পরিকল্পনা নিয়েছে। পরিবেশ সংরক্ষণ ও বৃক্ষরোপণে এমন উদ্যোগের মধ্যে কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার যশোদল ইউনিয়নের মধ্যপাড়া এলাকায় সড়কের পাশের একটি সরকারি গাছ কেটে ফেলার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রথমে স-মিলের গাড়ির ধাক্কায় গাছটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে জমির মালিকদের সহায়তায় সেটি কেটে ফেলা হয়। জমির মালিকদের একজন গাছ কাটার কথা স্বীকার করলেও গাছটি কাটার বিষয়ে সরকারি কোন অনুমতি ছিল না।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, যশোদল ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের কোনাপাড়া গাছবাজার এলাকায় সাইদুর রহমানের স-মিলের সামনে সড়কের পাশে গাছটি ছিল। প্রায় ৭-৮ মাস আগে মামুন ও মিজান নামের দুই ভাইয়ের জমি ভরাট করে স-মিলের জন্য ভাড়া দেওয়া হয়। স্থানীয়দের দাবি, জমি ভরাটের সময়ও সেখানে কয়েকটি গাছ কেটে ফেলা হয়েছিল। তাঁদের ভাষ্য, সড়কের পাশের গাছগুলো সরকারি উদ্যোগে লাগানো হয়েছিল। জমির মালিকেরা অন্য গাছগুলো নিজেদের উদ্যোগে লাগানো বলে দাবি করলেও একটি গাছকে সরকারি গাছ হিসেবে চিহ্নিত করে রেখে দেওয়া হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, সম্প্রতি স-মিলের কাঠ বা গাছ পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত গাড়ি আনা-নেওয়ার সময় সাইদুর রহমানের গাড়ির ধাক্কায় গাছটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে জমির মালিকদের সহায়তায় গাছটি কেটে ফেলা হয় বলে দাবি স্থানীয়দের।
গাছ কাটার বিষয়ে এক সচেতন বাসিন্দা প্রশ্ন তুললে স-মিলের মালিক ও জমির মালিকেরা ঔদ্ধত্যপূর্ণ মন্তব্য করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, তাঁদের কেউ কেউ বলেন, ‘গাছ কাটছি তো কী হয়েছে। এসব সরকার আমরা পকেটে নিয়ে ঘুরি।’
নিজস্ব সূত্রে খবর পেয়ে সরেজমিনে গিয়ে প্রতিবেদক জানতে পারেন, কয়েক দিন আগেই গাছটি কাটা হয়েছে। সে সময় জমির মালিকদের পাওয়া যায়নি। স-মিলের ব্যানারে দেওয়া দুটি মুঠোফোন নম্বরে যোগাযোগ করা হলে জানা যায়, নম্বর দুটি স-মিলের মালিকের নয়। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ব্যানারে যোগাযোগের নম্বর নিয়ে এ ধরনের অসংগতিও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
পরে স-মিল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক শরীফের কাছ থেকে সাইদুর রহমানের মুঠোফোন নম্বর সংগ্রহ করে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। সাইদুর রহমান গাছ কাটার অভিযোগ অস্বীকার করেন। তাঁর দাবি, গাছটি জমির মালিকেরা কেটেছেন। গাড়ির ধাক্কায় গাছটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগও তিনি অস্বীকার করে বলেন, রাতের বেলায় কেউ এ কাজ করেছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, গাছটি কাটার ঘটনায় সাইদুর রহমানও জড়িত।
জমির মালিক মিজানের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা হলে তিনি গাছ কাটার বিষয়টি স্বীকার করেন। তাঁর ভাষ্য, গাড়ির ধাক্কায় গাছটি ভেঙে যাওয়ার পর তিনি দিনের বেলায় সবাইকে নিয়ে সেটি কেটেছেন। গাছটি সরকারি কি না, জানতে চাইলে তিনি সেটি সরকারি গাছ বলে স্বীকার করেন। প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে তিনি প্রশ্ন করেন, ‘সরকারি গাছ কাটছি, এখন কী হয়েছে?’ এরপর স্থানীয়দের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সরকারকে হেয় করে মন্তব্য করার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি কোনো উত্তর দেননি। কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর কল কেটে দেন। পরে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি আর কল রিসিভ করেননি।
স্থানীয় অভিযোগকারীদের মতে, সড়কের পাশের সরকারি গাছ কেটে ফেলায় সরকারি সম্পদের ক্ষতির পাশাপাশি পরিবেশের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। ভবিষ্যতে সড়ক সম্প্রসারণ বা উন্নয়নকাজের পরিকল্পনা থাকলে এ ধরনের ঘটনা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে বলেও তাঁদের আশঙ্কা। তাঁরা ঘটনার তদন্ত করে গাছটির মালিকানা ও কাটার অনুমতির বিষয়টি যাচাই এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও স্থানীয় পর্যায়ে নানা আলোচনা রয়েছে। তবে তাঁদের কারও নিষিদ্ধ কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ততার বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। জমির মালিকদের একজন মামুন যশোদল উচ্চবিদ্যালয়ে দপ্তরি হিসেবে কর্মরত বলে জানা গেছে। স্থানীয়দের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এক নেতার সুপারিশে তিনি চাকরি পেয়েছিলেন।













Disqus comments are not configured yet.