‘মোরা এক বৃন্তে দুটি কুসুম’- নজরুলের সম্প্রীতির বার্তায় কটিয়াদীতে বিশেষ আয়োজন
‘বল বীর—চির উন্নত মম শির’- এই অমর উচ্চারণকে ধারণ করে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মবার্ষিকী যথাযোগ্য মর্যাদা, উৎসাহ-উদ্দীপনা ও বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয়েছে। দিবসটি উপলক্ষে কটিয়াদী নজরুল একাডেমির উদ্যোগে আলোচনা সভা, স্মৃতিচারণ, কবিতা আবৃত্তি, নজরুলসংগীত, নৃত্য ও নাটিকাসহ মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
রোববার (৩১ মে) সন্ধ্যা ৭টায় উপজেলা পরিষদ হলরুমে অনুষ্ঠিত এ আয়োজনে উপজেলার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, সাহিত্যপ্রেমী, সংস্কৃতিকর্মী, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এবং সুধীজনদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতিতে মিলনমেলায় পরিণত হয় পুরো অনুষ্ঠানস্থল।
অনুষ্ঠানের শুরুতেই জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবন, সাহিত্যকর্ম, সাংবাদিকতা, সংগীতচর্চা, অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং স্বাধীনতা ও মানবমুক্তির সংগ্রামে তাঁর অবদানের ওপর বিস্তারিত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। বক্তারা বলেন, বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলাম এক অনন্য উচ্চতায় অধিষ্ঠিত। তাঁর সাহিত্য, সংগীত ও দর্শন আজও অন্যায়, অবিচার, বৈষম্য ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে মানুষকে সাহস ও প্রেরণা জোগায়।
কটিয়াদী নজরুল একাডেমির সভাপতি এবং জাতীয়তাবাদী ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশের সভাপতি শাহজাহানের সভাপতিত্বে ও একাডেমির সহ-সভাপতি সাজেদুর রহমান সেলিমের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন কিশোরগঞ্জ-২ (কটিয়াদী-পাকুন্দিয়া) আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন কটিয়াদী নজরুল একাডেমির সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রউফ খোকন।
বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন কটিয়াদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) লাবনী আক্তার তারানা, উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আরিফুর রহমান কাঞ্চন, পৌর বিএনপির সভাপতি আশরাফুল হক দাদন, সাধারণ সম্পাদক সাজেদুর রহমান সজল সরকার, উপজেলা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি ডা. জহর লাল সাহা, সহ-সভাপতি মো. শফিকুল ইসলাম শফিক, মো. শফিকুর রহমান বাদলসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন বলেন, “জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম কেবল বিদ্রোহের কবি নন; তিনি মানবতার কবি, সাম্যের কবি এবং প্রেমের কবি। তাঁর সাহিত্য ও সংগীতে শোষিত-বঞ্চিত মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা, ন্যায়বিচারের আহ্বান এবং মানবিক মূল্যবোধের শক্তিশালী প্রকাশ ঘটেছে।”
তিনি আরও বলেন, “বাংলার মানুষের অধিকার, মর্যাদা ও স্বাধীনতার প্রশ্নে নজরুল কখনো আপস করেননি। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে তাঁর প্রতিবাদ, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান এবং সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম আজও আমাদের পথ দেখায়। ‘বিদ্রোহী’, ‘কারার ঐ লৌহ কপাট’ কিংবা ‘বল বীর—চির উন্নত মম শির’ শুধু সাহিত্যকর্ম নয়, বরং বাঙালির মুক্তি, জাগরণ ও আত্মমর্যাদার চিরন্তন প্রেরণা।”
বক্তারা তাঁদের বক্তব্যে বলেন, ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি, ভ্রাতৃত্ববোধ ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা ছিল নজরুলের জীবনের অন্যতম লক্ষ্য। ‘মোরা এক বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু-মুসলমান’সহ তাঁর অসংখ্য রচনা আজও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও মানবতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে। বর্তমান সময়ে জাতীয় কবির আদর্শ আরও বেশি প্রাসঙ্গিক বলে মন্তব্য করেন তাঁরা।
আলোচনা সভায় বক্তারা আরও বলেন, বাংলা সাহিত্য, সংগীত, নাটক, সাংবাদিকতা ও সংস্কৃতির প্রতিটি ক্ষেত্রে কাজী নজরুল ইসলামের অবদান অনন্য ও অবিস্মরণীয়। তিনি ছিলেন শোষণ, বৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীক। তাঁর সাহিত্য ও সৃষ্টিকর্ম নতুন প্রজন্মকে দেশপ্রেম, মানবতা, সাম্য ও ন্যায়ের শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছে।
আলোচনা পর্ব শেষে অনুষ্ঠিত হয় বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত শিল্পীরা নজরুলসংগীত, কবিতা আবৃত্তি, নৃত্য ও নাটিকা পরিবেশন করেন। শিল্পীদের পরিবেশনায় জাতীয় কবির সৃষ্টিকর্মের নানা দিক প্রাণবন্তভাবে ফুটে ওঠে। বিশেষ করে নজরুলসংগীত ও আবৃত্তি পর্ব দর্শকদের ব্যাপকভাবে মুগ্ধ করে। উপস্থিত শ্রোতারা করতালির মাধ্যমে শিল্পীদের উৎসাহিত করেন।
অনুষ্ঠানে কটিয়াদী নজরুল একাডেমির উপদেষ্টা ও সদস্যবৃন্দ, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সাংবাদিক এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিসহ বিপুলসংখ্যক দর্শক-শ্রোতা উপস্থিত ছিলেন।
সার্বিকভাবে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানটি কটিয়াদীর সাংস্কৃতিক অঙ্গনে একটি প্রাণবন্ত, তাৎপর্যপূর্ণ ও স্মরণীয় আয়োজন হিসেবে বিবেচিত হয়। অনুষ্ঠানে বক্তারা জাতীয় কবির সাহিত্য, সংগীত, দর্শন ও মানবিক আদর্শ নতুন প্রজন্মের কাছে আরও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দিতে এ ধরনের আয়োজন নিয়মিত করার আহ্বান জানান।










