তাড়াইলে সারের জন্য কৃষকের ছোটাছুটি, কোথাও সংকট- কোথাও বেশি দাম
কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলায় আমন ধানের আবাদ শুরু হওয়ায় মাঠে ব্যস্ততা বেড়েছে কৃষকদের। তবে আমন চাষের গুরুত্বপূর্ণ এ সময়ে প্রয়োজনীয় সার সংগ্রহ করতে গিয়ে অনেক কৃষককে এক বাজার থেকে অন্য বাজারে ছুটতে হচ্ছে। কোথাও সার না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে, আবার কোথাও অল্প পরিমাণ সার মিললেও সরকারি নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দাম নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
কৃষকদের অভিযোগ, তাড়াইলের বিভিন্ন এলাকায় ইউরিয়া, ডিএপি, টিএসপি ও এমওপি সারের সরবরাহ নিয়ে ভোগান্তি তৈরি হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী সার না পাওয়ায় একদিকে যেমন উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা, অন্যদিকে সময়মতো জমিতে সার প্রয়োগ করতে না পারলে আমনের ফলনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
তবে উপজেলা কৃষি বিভাগ বলছে, উপজেলায় পর্যাপ্ত সার মজুত রয়েছে এবং সারের কোনো সংকট নেই। কৃষি বিভাগের এমন দাবির সঙ্গে মাঠপর্যায়ের কৃষকদের অভিজ্ঞতার পার্থক্যই এখন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে—মজুত পর্যাপ্ত থাকলে প্রয়োজনের সময় কৃষকের হাতে সার পৌঁছাচ্ছে না কেন?
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তাড়াইল উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের জন্য ইউরিয়া সারের চাহিদা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ হাজার ৪৩০ মেট্রিক টন। একই সময়ে টিএসপি ৯০১ মেট্রিক টন, ডিএপি ১ হাজার ৮৬৮ মেট্রিক টন এবং এমওপি ১ হাজার ২৯৪ মেট্রিক টন সারের চাহিদা রয়েছে।
চলতি মৌসুমে উপজেলায় আমন ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ হাজার ৮২৩ হেক্টর। এর মধ্যে হাইব্রিড ৫৪০ হেক্টর, উফশী ৭ হাজার ২৮০ হেক্টর এবং স্থানীয় জাতের ধান ৩ হেক্টর।
কৃষি বিভাগের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত হাইব্রিড ধানের আবাদ হয়েছে ৫০০ হেক্টর, উফশী ৪ হাজার ৯৫০ হেক্টর এবং স্থানীয় জাতের ধান ৩ হেক্টর। সব মিলিয়ে আবাদ হয়েছে ৫ হাজার ৪৫৩ হেক্টর জমিতে।
সারের সংকট ও সরবরাহ নিয়ে অভিযোগ করেছেন কৃষক ছিদ্দিকুর রহমান ভূঁইয়া, আইনুল ইসলাম, রুকন মিয়া, শামীম মিয়া, ফজলুর রহমান, দেলোয়ার হোসেনসহ অনেকে।
কৃষকদের প্রশ্ন, কৃষি বিভাগ যদি উপজেলায় পর্যাপ্ত সার মজুত থাকার কথা বলে, তাহলে মাঠপর্যায়ের বিক্রেতাদের কাছে কেন চাহিদা অনুযায়ী সার পাওয়া যাচ্ছে না। বিষয়টি সরেজমিনে খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন তারা।
কৃষক হাবিবুর রহমান বলেন, তিনি এবার ৩০ শতাংশ জমিতে আমন ধান চাষ করেছেন। বর্তমানে সার সংগ্রহ করতে গিয়ে সমস্যায় পড়েছেন। ডিলারের কাছে গেলেও প্রয়োজন অনুযায়ী সার পাওয়া যাচ্ছে না। এখনো সার কিনতে পারেননি জানিয়ে তিনি বলেন, সার সংগ্রহের জন্য আবারও যেতে হবে।
তাড়াইল-সাচাইল ইউনিয়নের বিসিআইসি সার ডিলার মেসার্স শাহাব উদ্দিন ভূঁইয়া বলেন, তাড়াইলে সারের সংকট তৈরি হয়েছিল। পরে কৃষি বিভাগের সমন্বয়ে জেলা সদর ইউনিয়ন থেকে কিছু সার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এতে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে।
তিনি বলেন, সংকট একেবারে নেই- এমনটা বলা যাবে না। বরাদ্দ কম থাকায় চাহিদা অনুযায়ী কৃষকদের সার দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। গত বছরের তুলনায় এবার বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে কম হওয়ায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) তাড়াইল উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় মাঠপর্যায়ে খোঁজ নিয়ে সারের পরিস্থিতিতে ভিন্নতা দেখা গেছে। কোনো কোনো এলাকায় কৃষকেরা প্রয়োজনের সময় সার না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন। আবার কোথাও সরকারি নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগও পাওয়া গেছে।
এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে—উপজেলা কৃষি বিভাগের দাবি অনুযায়ী পর্যাপ্ত সার মজুত থাকলে সরবরাহ ব্যবস্থার কোন পর্যায়ে ঘাটতি তৈরি হচ্ছে? বরাদ্দের পরিমাণ স্থানীয় চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, ডিলার পর্যায়ে সরবরাহ ঠিকমতো হচ্ছে কি না এবং সরকারি মূল্যে সার কৃষকের হাতে পৌঁছাচ্ছে কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কারণ আমন মৌসুমে সময়মতো জমিতে প্রয়োজনীয় সার প্রয়োগ করতে না পারলে কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়ার পাশাপাশি ফসলের ফলনেও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কৃষকদের অভিযোগের বিষয়ে তাড়াইল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বিকাশ রায় বলেন, উপজেলায় পর্যাপ্ত সার রয়েছে। সারের কোনো সংকট নেই।
সরকারি নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগও অস্বীকার করেন তিনি। তার দাবি, কৃষি কর্মকর্তা ও উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে মাস্টাররোলে কৃষকদের নাম অন্তর্ভুক্ত করে সার বিতরণ করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, চাহিদার বিপরীতে উপজেলায় পর্যাপ্ত সার রয়েছে। এরপরও কোনো কৃষক প্রয়োজনের সময় সার না পাওয়ার অভিযোগ করলে বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখা হচ্ছে।
তবে কৃষকদের অভিযোগ ও কৃষি বিভাগের দাবির মধ্যে যে পার্থক্য তৈরি হয়েছে, তার প্রকৃত কারণ নির্ধারণে মাঠপর্যায়ে সরবরাহ, বরাদ্দ, ডিলার পর্যায়ের মজুত এবং বিক্রয়মূল্য—সবকিছুই নজরদারির আওতায় আনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন কৃষকেরা।








Warning: Array to string conversion in /home/dkishoreganj/public_html/wp-content/plugins/gs-facebook-comments/public/class-wpfc-public.php on line 311
Array