কিশোরগঞ্জের হোসেনপুরে কৃষিজমিতে আগাছা দমনে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক (আগাছানাশক) ব্যবহারের ফলে জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন পরিবেশবিদ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাদের মতে, কৃষকদের সচেতনতার ঘাটতি, শ্রমিক সংকট এবং কৃষি বিভাগের পরামর্শ যথাযথভাবে অনুসরণ না করার কারণে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি রাসায়নিক ব্যবহার করা হচ্ছে। এর প্রভাবে মিঠাপানির মাছ, ব্যাঙ, শামুকসহ বিভিন্ন উপকারী প্রাণী ও পোকামাকড়ের অস্তিত্ব সংকটাপন্ন হয়ে পড়ছে।
সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে, বোরো ধান কাটার পর প্রায় তিন মাস জমি পতিত থাকায় সেখানে কোমরসমান আগাছা জন্মেছে। এসব আগাছা ছোট ট্রাক্টর দিয়ে পরিষ্কার করা কঠিন হওয়ায় অনেক কৃষক সহজ সমাধান হিসেবে আগাছানাশক প্রয়োগ করছেন।
পরিবেশবিদদের মতে, আগাছা দ্রুত দমন হলেও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ভয়াবহ। অতিরিক্ত রাসায়নিকের কারণে কৃষিজমির মাটির স্বাভাবিক গুণাগুণ নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি বৃষ্টির পানির সঙ্গে বিষাক্ত উপাদান পুকুর, খাল, বিল ও নদীতে ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে জলজ প্রাণী এবং কৃষির জন্য উপকারী পোকামাকড়ও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
উপজেলার আড়াইবাড়িয়া ইউনিয়নের ভরুয়া গ্রামের কৃষক মো. সাইদুর রহমান, জামাইল গ্রামের কৃষক আব্দুল হামিদ দুলাল, পুমদী ইউনিয়নের নারায়ণ ডহর গ্রামের আব্দুর রাশিদ, নজরুল ইসলাম (৫৫) ও মো. নজরুল ইসলাম (৪০) জানান, কৃষি শ্রমিকের সংকট এবং উচ্চ মজুরির কারণে আগাছা পরিষ্কার করতে প্রতি একরে যেখানে প্রায় ১০ হাজার টাকা ব্যয় হতো, সেখানে আগাছানাশক ব্যবহার করে মাত্র দুই হাজার টাকার মধ্যেই কাজ সম্পন্ন করা যায়। এ কারণে অধিকাংশ কৃষক রাসায়নিক ব্যবহারের দিকে ঝুঁকছেন।
তারা আরও বলেন, একসময় এসব জমিতে বছরে তিনটি ফসল আবাদ করা হলেও বর্তমানে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় কৃষকরা লাভের মুখ দেখছেন না। ফলে খরচ কমাতে সহজ পদ্ধতিকেই বেছে নিচ্ছেন।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোজাহিদুল কবির বলেন, আগাছা দমনে ব্যবহৃত রাসায়নিক বৃষ্টির পানির সঙ্গে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। এসব বিষাক্ত ঘাস খেয়ে গরু-ছাগলের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে, যা উদ্বেগজনক।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘এভাবে আগাছানাশক ব্যবহার চলতে থাকলে খাল-বিলের মাছের মতো নদীর মাছও ভবিষ্যতে মারাত্মক সংকটে পড়বে।’
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ শেখ মোহাম্মদ মহসিন বলেন, নির্দিষ্ট কিছু আগাছা দমনে অনুমোদিত মাত্রায় ২,৪-ডি অ্যামাইন (2,4-D Amine) ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে যে কোনো আগাছানাশক বা কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহার মানুষের স্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। তিনি কৃষকদের জৈব বালাইনাশক ব্যবহারের পরামর্শ দেন। যদিও এর কার্যকারিতা তুলনামূলক ধীর হওয়ায় অনেক কৃষক এতে আগ্রহী নন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মো. সাদিকুর রহমান বলেন, অতীতে কৃষকরা আগাছা চাষের মাধ্যমে মাটিতে মিশিয়ে জৈব সার হিসেবে ব্যবহার করতেন। বর্তমানে শ্রম বাঁচাতে অতিরিক্ত রাসায়নিকের ওপর নির্ভরশীলতা বেড়েছে। কৃষি বিভাগ সবসময় রাসায়নিকের অপব্যবহার নিরুৎসাহিত করলেও এ প্রবণতা কমছে না। এ সমস্যা সমাধানে কৃষক, কৃষি বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট সবার সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
পরিবেশবিদদের মতে, কৃষি উৎপাদন বজায় রাখার পাশাপাশি জীববৈচিত্র্য রক্ষায় আগাছা দমনে সমন্বিত ও পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
Warning: Array to string conversion in /home/dkishoreganj/public_html/wp-content/plugins/gs-facebook-comments/public/class-wpfc-public.php on line 311
Array