ভৈরবে বাজারের নাম নিয়ে ফের দুই গ্রামের সংঘর্ষ, আহত ২০; পুড়েছে ঘরবাড়ি
কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলায় বাজারের নামকরণকে কেন্দ্র করে আকবরনগর ও মিরারচর গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে ফের সংঘর্ষ হয়েছে। রোববার (৩০ আগস্ট) বিকেল ৩টা থেকে প্রায় ৬টা পর্যন্ত চলা এ সংঘর্ষে উভয় পক্ষের অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন। এ সময় দুই পক্ষের লোকজন প্রতিপক্ষের কয়েকটি ঘরবাড়িতে আগুন দেওয়ার পাশাপাশি দোকানপাট ও ঘরবাড়ি ভাঙচুর করেছেন। এতে অন্তত ১২টি ঘর পুড়ে যাওয়ার কথা জানা গেছে। তবে স্থানীয় অন্য একটি সূত্রে ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনার সংখ্যা ১৫টি বলে দাবি করা হয়েছে।
সংঘর্ষের কারণে ভৈরব-ময়মনসিংহ রেলপথে প্রায় তিন ঘণ্টা ট্রেন চলাচল ব্যাহত হয়। চট্টগ্রাম থেকে জামালপুরগামী আন্তনগর বিজয় এক্সপ্রেস ভৈরব রেলস্টেশনে ১ ঘণ্টা ৪০ মিনিট আটকে থাকে। অন্যদিকে কিশোরগঞ্জ থেকে ঢাকাগামী আন্তনগর কিশোরগঞ্জ এক্সপ্রেস কুলিয়ারচর স্টেশনে আটকা পড়ে। এতে কয়েক হাজার যাত্রী দুর্ভোগে পড়েন।
ভৈরব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, বাজারের নামকরণ নিয়ে দুই গ্রামের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে। বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে।
সহকারী পুলিশ সুপার (ভৈরব সার্কেল) আবু মুছা শেখ জানান, পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আকবরনগর ও মিরারচর পাশাপাশি দুটি গ্রাম। ভৈরব-ময়মনসিংহ আঞ্চলিক মহাসড়ক দুটির পাশ দিয়ে চলে গেছে। সড়ক নির্মাণের পর সেখানে একটি বাসস্ট্যান্ড গড়ে ওঠে। ১৯৯১ সাল থেকে বাসস্ট্যান্ডের দুই পাশে বাজার বসতে শুরু করে। দীর্ঘদিন বাজারটি ‘আকবরনগর-মিরারচর বাজার’ নামে পরিচিত ছিল।
২০২৩ সালের জুলাইয়ে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের একটি সাইনবোর্ডে শুধু ‘আকবরনগর বাজার’ লেখা হলে এ নিয়ে মিরারচর গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়। পরে সাইনবোর্ড ভাঙচুর ও দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। স্থানীয়দের ভাষ্য, এরপর থেকে বাজারের নাম নিয়ে দুই গ্রামের মধ্যে বিরোধ আরও তীব্র হয়।
এরই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি দুই গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে সংঘর্ষে হতাহতের ঘটনাও ঘটে। তবে ওই ঘটনার তারিখ ও মামলা-সংক্রান্ত তথ্য নিয়ে স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রে ভিন্নতা রয়েছে। একাধিক সূত্রের দাবি, ওই সংঘর্ষে মিরারচর গ্রামের মাসুদ মিয়া ও হিরণ মিয়া নিহত হন। এ ঘটনায় ভৈরব থানায় হত্যা মামলা হয় এবং দুই গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়।
স্থানীয়দের ভাষ্য, রোববার সকালে ওই হত্যা মামলার আসামিদের একটি অংশ কিশোরগঞ্জ আদালতে হাজির হয়ে জামিনের আবেদন করেন। আদালত তাঁদের জামিন নামঞ্জুর করে ৩৯ জনকে কারাগারে পাঠান বলে একটি সূত্র জানিয়েছে। অন্য একটি সূত্রে ৪১ জন আসামির জামিন আবেদন এবং তাঁদের কারাগারে পাঠানোর কথা বলা হয়েছে।
আদালতের এই সিদ্ধান্তের খবর এলাকায় পৌঁছানোর পর দুই গ্রামের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে আকবরনগর গ্রামের কয়েকজন ব্যক্তি বাজারে মিরারচর গ্রামের দুই বাসিন্দাকে মারধর করেন। পরে মাইকে এ খবর প্রচার করা হলে দুই গ্রামের কয়েক শ মানুষ লাঠিসোঁটা নিয়ে জড়ো হতে থাকেন। একপর্যায়ে বিকেল ৩টার দিকে উভয় পক্ষ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে।
তবে মিরারচর গ্রামের বাসিন্দাদের দাবি, তাঁদের গ্রামের লোকজনকে আকবরনগরের লোকজন মারধর করার পরই উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। অন্যদিকে আকবরনগর গ্রামের বাসিন্দারা বলছেন, আগের সংঘর্ষে তাঁদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে এবং অনেকে এখনো গৃহহীন। আদালতে মামলার আসামিরা জামিন না পাওয়ার পর মিরারচরের লোকজনের প্রতিক্রিয়াকে কেন্দ্র করে তাঁদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়।
দুই পক্ষই সংঘর্ষের জন্য পরস্পরকে দায়ী করেছে।
সংঘর্ষের একপর্যায়ে দুই পক্ষই প্রতিপক্ষের ঘরবাড়িতে আগুন দেয় বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। এতে অন্তত ১২টি ঘর পুড়ে যায়। অপর একটি স্থানীয় সূত্রের দাবি, আকবরনগর বাজার ও মিরারচর এলাকায় অন্তত ১৫টি দোকান ও ঘরবাড়ি ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে।
সংঘর্ষে আহতদের মধ্যে নজরুল (৩০), রানা মিয়া (১৯), তাহের মিয়া (৫০), স্বপন (২৮), জাবেদা বেগম (৬০), আক্কেল আলী (৪১), মধু মিয়া (৪৫) ও হেকিম মিয়া (১৬) ভৈরব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিয়েছেন। অন্য আহত ব্যক্তিরা স্থানীয় বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে চিকিৎসা নিয়েছেন বলে জানা গেছে।
ভৈরব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে আহতদের চিকিৎসার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
সংঘর্ষের কারণে ভৈরব-ময়মনসিংহ রেলপথে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বিকেল ৪টা ১০ মিনিটে ভৈরব রেলস্টেশনে প্রবেশ করে চট্টগ্রাম থেকে জামালপুরগামী আন্তনগর বিজয় এক্সপ্রেস। দুই মিনিট পর ট্রেনটির ছেড়ে যাওয়ার কথা থাকলেও রেললাইনের দুই পাশে সংঘর্ষ চলায় যাত্রীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে সেটি আটকে রাখা হয়।
ভৈরব রেলস্টেশনের স্টেশনমাস্টার ইউসুফ জানান, বিকেল ৫টা ৫০ মিনিটে বিজয় এক্সপ্রেস গন্তব্যের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। ফলে ট্রেনটি ১ ঘণ্টা ৪০ মিনিট অনির্ধারিত বিলম্বের মুখে পড়ে।
এদিকে কিশোরগঞ্জ থেকে ঢাকাগামী আন্তনগর কিশোরগঞ্জ এক্সপ্রেসও কুলিয়ারচর স্টেশনে আটকা পড়ে। এতে ভৈরব-ময়মনসিংহ রেলপথে প্রায় তিন ঘণ্টা ট্রেন চলাচল ব্যাহত হয় বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।
সন্ধ্যায় ভৈরব রেলস্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, বিজয় এক্সপ্রেস প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে আছে। ট্রেন ছাড়তে দেরি হবে জানতে পেরে অনেক যাত্রী ট্রেন থেকে নেমে প্ল্যাটফর্মে অপেক্ষা করছিলেন।
চট্টগ্রাম থেকে জামালপুর যাচ্ছিলেন ব্যাংকার তমিজ উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘সমস্যা পাড়া কিংবা গ্রামের। কিন্তু এর প্রভাব পড়ে জাতীয় পর্যায়ে। কয়েক দিন পরপর ট্রেন ও বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। প্রচণ্ড গরমে যাত্রীদের অনেক কষ্ট হচ্ছে। এভাবে চলতে পারে না।’
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাজারের নাম নিয়ে বিরোধকে কেন্দ্র করে এর আগেও দুই গ্রামের মধ্যে একাধিকবার সংঘর্ষ হয়েছে। আগের একটি সংঘর্ষে দুই ব্যক্তি নিহত ও উভয় পক্ষের শতাধিক মানুষ আহত হন বলে স্থানীয়রা জানান। এ সময় বহু ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে। সংঘর্ষের পর অনেক পরিবার এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে যায় এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা দেখা দেয়।
এ ঘটনায় হওয়া মামলাগুলোকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা অব্যাহত ছিল। রোববার আদালতে মামলার আসামিদের জামিন না হওয়ার পর সেই উত্তেজনাই নতুন করে সংঘর্ষে রূপ নেয় বলে স্থানীয়দের ভাষ্য।
কালিকাপ্রসাদ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান লিটন মিয়া বলেন, বাজারের নামকে কেন্দ্র করে দুই গ্রামের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছে। স্থানীয়ভাবে বিরোধ মেটানোর চেষ্টা করা হলেও তা পুরোপুরি সমাধান হয়নি।
ভৈরব উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আরিফুল ইসলাম সংঘর্ষের খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে দুই পক্ষকে শান্ত করার চেষ্টা করেন। তিনি বলেন, বাজারের নাম নিয়ে এমন সংঘর্ষের কারণে ভৈরবের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। সংঘর্ষের কারণে বারবার সড়ক ও রেলপথে যান চলাচল বন্ধ হচ্ছে। এ ধরনের ঘটনা আর হতে দেওয়া উচিত নয়।
ভৈরব থানার পুলিশ জানিয়েছে, নতুন করে সংঘর্ষ এড়াতে ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকায় পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।








Warning: Array to string conversion in /home/dkishoreganj/public_html/wp-content/plugins/gs-facebook-comments/public/class-wpfc-public.php on line 311
Array