আদমপুরে ২০ বছর ধরে পরিত্যক্ত স্বাস্থ্যকেন্দ্র দখলে, চিকিৎসা বঞ্চিত হাজারো মানুষ
চারপাশে সারি সারি টিনের দোকান। জমজমাট বেচাকেনা। দোকানগুলোর মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে একটি জরাজীর্ণ দোতলা ভবন—জানালা-দরজাহীন, দেয়ালের প্লাস্টার খসে পড়েছে, বেরিয়ে এসেছে মরিচাধরা রড। ভেতরে জমে আছে ময়লা-আবর্জনা। অথচ একসময় এই ভবনটিই ছিল লক্ষাধিক মানুষের চিকিৎসার একমাত্র ভরসা। বর্তমানে অবহেলা, তদারকির অভাব ও দীর্ঘদিনের আইনি জটিলতায় বেহাল অবস্থায় পড়ে আছে কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম উপজেলার আদমপুর মা ও শিশু স্বাস্থ্য কেন্দ্র।
১৯৬৫ সালে অষ্টগ্রাম উপজেলার আদমপুর ইউনিয়নে প্রায় ৪২ শতাংশ জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় স্বাস্থ্য কেন্দ্রটি। তবে প্রায় দুই দশক ধরে চিকিৎসা কার্যক্রম বন্ধ থাকায় ধীরে ধীরে এটি দখল করে নেয় স্থানীয় প্রভাবশালী একটি মহল। অভিযোগ রয়েছে, চিকিৎসা কর্মকর্তা মো. শিবির আহমেদ অবসরে যাওয়ার পর আর কোনো কর্মকর্তা নিয়োগ না হওয়ায় কেন্দ্রটি অরক্ষিত হয়ে পড়ে। সেই সুযোগে প্রথমে অস্থায়ীভাবে দোকান বসানো হলেও পরে স্থায়ীভাবে দখল নিয়ে ব্যবসা শুরু করা হয়।
স্থানীয়দের ভাষ্য, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে আদমপুর ইউনিয়নের দূরত্ব প্রায় ২০ কিলোমিটার, যা হাওরাঞ্চলের দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে যেতে হয়। এ কারণে এই স্বাস্থ্য কেন্দ্রটিই ছিল এলাকাবাসীর একমাত্র চিকিৎসা ভরসা। পাশের আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়নেও কোনো স্বাস্থ্য কেন্দ্র না থাকায় সেখানকার মানুষও এখানে চিকিৎসা নিতে আসতেন। বর্তমানে কেন্দ্রটি দখল হয়ে যাওয়ায় ভেতরে আবর্জনা জমে রয়েছে, এমনকি মানুষের মলত্যাগের কারণে দুর্গন্ধে ভেতরে প্রবেশ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কামরুল হাসান, মহসিন, রাসেল মিয়া, মজিবর মিয়া, কেবল মিয়া, বুলবুল মিয়া, সোহেল মিয়া, মোহাম্মদ মিয়া, মিজান মিয়া ও শওকত আলী জানান, তারা কেউ কেউ সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ফজলুল করিম বাদলকে মাসিক এক হাজার টাকা ভাড়া দিয়ে ব্যবসা করছেন। আবার অনেকেই নিজ উদ্যোগে দোকান নির্মাণ করে ভাড়া ছাড়াই ব্যবসা চালাচ্ছেন।
এ বিষয়ে সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ফজলুল করিম বাদল বলেন, “৪২ শতাংশ জমি সরকারের নামে জরিপে রয়েছে। এর মধ্যে ৩ শতাংশ জমি নিয়ে আমাদের ক্রয়সূত্রে মালিকানার দাবি রয়েছে, যা আদালতে বিচারাধীন। সরকার চাইলে আমরা জমি ছেড়ে দিতে প্রস্তুত।” তিনি আরও জানান, একটি পক্ষ আদালতের রায়ে প্রায় ১৭ শতাংশ জমি ভোগদখল করছে।
বীর মুক্তিযোদ্ধা রইস উদ্দিন (৭৫) বলেন, “আগে আমরা এই কেন্দ্র থেকেই চিকিৎসা পেতাম। এখন চিকিৎসার জন্য অষ্টগ্রাম, হবিগঞ্জ বা কিশোরগঞ্জ যেতে হয়। বর্ষায় নৌকায় এবং শুষ্ক মৌসুমে হেঁটে বা ছোট যানবাহনে যেতে গিয়ে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়।”
আদমপুর ইউনিয়ন যুবদলের সাধারণ সম্পাদক হারিস মিয়া বলেন, “স্বাস্থ্য কেন্দ্রটি বন্ধ থাকায় সাধারণ মানুষ প্রাথমিক চিকিৎসার জন্যও ৫০ কিলোমিটার দূরে হবিগঞ্জ যেতে বাধ্য হচ্ছে। এতে তাদের ২ থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হচ্ছে।”
ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল মোন্নাফ বলেন, “স্বাস্থ্য কেন্দ্রটি দীর্ঘদিন ধরে অচল থাকলেও কর্তৃপক্ষের কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই। বিষয়টি সংসদ সদস্যকেও জানানো হয়েছিল, তবে প্রভাবশালী মহলের কারণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয়নি।”
উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা রবীন বিশ্বাস জানান, কেন্দ্রটির জমি দখলকে কেন্দ্র করে মামলা চলমান রয়েছে। তবে আদমপুরে পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা (এফডব্লিউবি) নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
অষ্টগ্রাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সিলভিয়া স্নিগ্ধা বলেন, বিষয়টি তার জানা ছিল না। তিনি দ্রুত পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন বলে জানান।
এদিকে, কিশোরগঞ্জ জেলা পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের উপপরিচালক মাহবুবুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্টরা জানান, কেন্দ্রটি এখনো পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়নি। মামলা নিষ্পত্তি হলে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, পাশের আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়নে ১০ শয্যা বিশিষ্ট একটি মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের ভবন নির্মিত হলেও এখনো সেখানে চিকিৎসা কার্যক্রম চালু হয়নি।




