কিশোরগঞ্জ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে ই-পাসপোর্টের আবেদন করে বিপাকে পড়েছেন মো. অপু মিয়া। একই দিনে দুই ঘণ্টার ব্যবধানে তাঁর মুঠোফোনে প্রথমে ‘সংশোধনের প্রয়োজন’ এবং পরে ‘আবেদন বাতিল’- সংক্রান্ত দুটি এসএমএস আসে। আবেদন বাতিলের কারণ হিসেবে আগের একটি পাসপোর্টের তথ্য গোপনের কথা জানানো হলেও, ওই পাসপোর্টের তথ্যের সঙ্গে আবেদনকারীর নাম, বাবা-মায়ের নাম ও ঠিকানার কোনো মিল নেই বলে দাবি করেছেন তিনি।
প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, গত ২৮ সেপ্টেম্বর মো. অপু মিয়া কিশোরগঞ্জ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে ই-পাসপোর্টের জন্য বায়োমেট্রিক তথ্য ও আঙুলের ছাপ দেন। কাজ শেষ করে বাড়ি ফেরার পর ওই দিন বিকেল ৩টা ৫ মিনিটে ‘ইপাসপোর্টবিডি’ থেকে তাঁর মুঠোফোনে একটি এসএমএস আসে।
এসএমএসে বলা হয়, ‘প্রিয় গ্রাহক, ওআইডি১০৩৮১৩৪৬২৬ নম্বরের পাসপোর্ট আবেদনটির ক্ষেত্রে কিশোরগঞ্জ পাসপোর্ট অফিসে পুনরায় কাজ বা সংশোধনের প্রয়োজন রয়েছে।’
সংশোধনের বিষয়টি জানার চেষ্টা করার আগেই প্রায় দুই ঘণ্টা পর, একই দিন বিকেল ৫টা ৪ মিনিটে তাঁর মুঠোফোনে আরেকটি এসএমএস আসে।
দ্বিতীয় এসএমএসে বলা হয়, ‘প্রিয় মো. অপু মিয়া, ওআইডি১০৩৮১৩৪৬২৬ নম্বরের পাসপোর্ট আবেদনটি কিশোরগঞ্জ পাসপোর্ট অফিস কর্তৃক বাতিল করা হয়েছে।’
একই দিনে অল্প সময়ের ব্যবধানে পরস্পরবিরোধী দুটি বার্তা পাওয়ায় বিভ্রান্তিতে পড়েন মো. অপু মিয়া। আবেদনটি প্রথমে সংশোধনের জন্য ফেরত পাঠানোর কথা জানিয়ে পরে কেন বাতিল করা হলো—তা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর সকাল ১০টার দিকে আবেদন বাতিলের কারণ জানতে কিশোরগঞ্জ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে যান মো. অপু মিয়া। তাঁর দাবি, সেখানে সহকারী পরিচালক অলিউল ইসলাম তাঁকে জানান, তাঁর নামে আগে এ০৯৫২৩৩২০ নম্বরের একটি পাসপোর্ট রয়েছে।
আগের পাসপোর্টের তথ্য গোপন করে নতুন আবেদন করায় বর্তমান আবেদনটি বাতিল করা হয়েছে বলে তাঁকে জানানো হয়। একই সঙ্গে আগের পাসপোর্টটি হারিয়ে থাকলে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে নতুন করে পাসপোর্টের আবেদন করতে বলা হয় বলেও জানান তিনি।
তবে এ০৯৫২৩৩২০ নম্বরের পাসপোর্টের তথ্য যাচাই করে ভিন্ন তথ্য পাওয়ার দাবি করেছেন মো. অপু মিয়া। তাঁর ভাষ্য, ওই পাসপোর্টে নাম রয়েছে ‘হৃদয়’। সেখানে জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর ৫১২৩১৯২৩৬০ এবং জন্মতারিখ ১ অক্টোবর ১৯৯৯ উল্লেখ রয়েছে।
ওই পাসপোর্টে পিতার নাম মো. কবির হোসেন এবং মাতার নাম মোছা. রুমা খাতুন উল্লেখ রয়েছে বলে জানান মো. অপু মিয়া। স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে দেওয়া রয়েছে ফুলবাড়ী, ঝিকরগাছা, কায়েমখোলা বাজার-৭৪২০, যশোর।
মো. অপু মিয়ার দাবি, ওই পাসপোর্টে থাকা নাম, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, জন্মতারিখ, বাবা-মায়ের নাম ও ঠিকানার সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত তথ্যের কোনো মিল নেই।
আবেদন বাতিলের প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে সহকারী পরিচালক অলিউল ইসলাম বলেন, ‘পুনরায় কাজ বা সংশোধনের প্রয়োজন’ সংক্রান্ত এসএমএস যাওয়ার পর আবেদনটি বাতিল করা হয়েছে। আবেদনকারীকে নতুন করে আবেদন করতে বলা হয়েছে।
বর্তমান আবেদন বাতিল হওয়ায় সংশ্লিষ্ট ব্যাংক চালানও বাতিল হবে বলে মো. অপু মিয়াকে জানানো হয়েছে। নতুন করে পাসপোর্টের আবেদন করলে নতুন চালান দিতে হবে বলেও তাঁকে জানানো হয়।
আগের চালানের টাকা ফেরতের বিষয়ে জানতে চাইলে সহকারী পরিচালক অলিউল ইসলাম বলেন, মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়ে টাকা ফেরতের ব্যবস্থা করা হবে।
এদিকে পাসপোর্ট আবেদন প্রক্রিয়া নিয়ে আরও কিছু অভিযোগের কথাও জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ও আবেদনকারীরা। তাঁদের অভিযোগ, কোনো আবেদনকারীর বাবা-মায়ের জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর আবেদনে ঐচ্ছিক থাকলেও তা দিতে বলা হচ্ছে। পেশা ‘প্রাইভেট সার্ভিস’ উল্লেখ থাকলে পেশাগত পরিচয়পত্র চাওয়া হচ্ছে। আবার বাড়ির বিদ্যুৎ বিলের সঙ্গে আবেদনকারীর নামের অমিল থাকলে কিংবা স্বামী বা স্ত্রীর নামের বানানে পার্থক্য থাকলেও আবেদন ফেরত দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
আবেদনকারীদের আরও অভিযোগ, একটি আবেদন প্রক্রিয়াধীন থাকা অবস্থায় একই ব্যক্তির নামে আরেকটি আবেদন করার সুযোগ না থাকায় তাঁরা সমস্যায় পড়ছেন। পরবর্তীতে হয়রানির কারণে কেউ আবেদন বাতিল করতে চাইলে সেখানেও বিভিন্ন জটিলতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে আবেদন বাতিল করে পরদিন নতুন করে আবেদন নিয়ে আসতে বলা হয় বলেও অভিযোগ করেছেন তাঁরা।
আরও অভিযোগ রয়েছে, কোনো আবেদন গ্রহণের পর নির্ধারিত দিনে বায়োমেট্রিক তথ্য ও ছবি দিতে না পারলে আবেদনটি পরবর্তী সময়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায় বলে আবেদনকারীদের জানানো হচ্ছে। তখন আলাদাভাবে আবেদন বাতিলের জন্য আবেদন না করলেও আগের আবেদন আর কার্যকর থাকে না এবং পরদিন নতুন করে আবেদন করতে হয় বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
এতে একদিকে আবেদনকারীদের অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয় হচ্ছে, অন্যদিকে চাকরিজীবী, শিক্ষার্থী ও দূরবর্তী এলাকার মানুষকে বারবার পাসপোর্ট অফিসে এসে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে বলে অভিযোগ তাঁদের।
সরকারি ই-পাসপোর্ট আবেদন ফরমে পেশা, বৈবাহিক অবস্থা ও আবেদনকারীর বিভিন্ন ব্যক্তিগত তথ্য সঠিকভাবে দেওয়ার বিষয়টি নির্ধারিত রয়েছে। তবে এসব তথ্য যাচাইয়ের ক্ষেত্রে কোন কোন কাগজপত্র বাধ্যতামূলক এবং কোন পরিস্থিতিতে আবেদন ফেরত বা বাতিল করা হবে—এ বিষয়ে আবেদনকারীদের মধ্যে স্পষ্ট ধারণার অভাব রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন, প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের তালিকা ও আবেদন যাচাইয়ের নিয়ম যদি আগে থেকেই স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে একই আবেদন বারবার ফেরত দেওয়া হচ্ছে কেন? কোনো ত্রুটি থাকলে তা একবারে জানিয়ে সংশোধনের সুযোগ না দিয়ে কেন আবেদনকারীদের পুনরায় আবেদন করতে হচ্ছে—এ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা।
পাশাপাশি প্রতিদিন ফেরত যাওয়া আবেদনের প্রকৃত সংখ্যা, কী কারণে আবেদনগুলো ফেরত দেওয়া হচ্ছে এবং নির্ধারিত দিনে বায়োমেট্রিক তথ্য না দিলে আবেদন বাতিলের বিষয়ে প্রচলিত নিয়ম কী—এসব বিষয় যাচাই করে দেখার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
মো. অপু মিয়ার দাবি, তাঁর ওআইডি১০৩৮১৩৪৬২৬ নম্বরের আবেদনটি কেন বাতিল করা হলো, অন্য একটি পাসপোর্টের তথ্য কীভাবে তাঁর আবেদনের সঙ্গে যুক্ত হলো এবং প্রথমে সংশোধনের বার্তা পাঠানোর মাত্র দুই ঘণ্টার মধ্যে আবেদন বাতিলের সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হলো—এসব বিষয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
Warning: Array to string conversion in /home/dkishoreganj/public_html/wp-content/plugins/gs-facebook-comments/public/class-wpfc-public.php on line 311
Array